বরিশালে বিএনপির কমিটিতে ‘বিতর্কিতরা’, প্রতিবাদে পদত্যাগ-বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল
প্রকাশিত: ০৮:৪৭ এএম, ০৬ অক্টোবর ২০২২

বরিশাল মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে বিএনপির কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এ পর্যন্ত ১৪টি ওয়ার্ড কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে কমিটিতে নৌকা প্রার্থীর নির্বাচনী কাজে অংশ নেওয়া, আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়া, অযোগ্য, নিষ্ক্রিয় সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের পদায়নের অভিযোগ উঠেছে।

ফলে সদ্য ঘোষিত কমিটিগুলো বাতিল করে পুনর্গঠনের দাবিতে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে বিক্ষোভ করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। কেউ কেউ পদত্যাগের পথ বেছে নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন পোস্ট দিচ্ছেন। তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় নেতার হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের ৩ নভেম্বর মনিরুজ্জামান ফারুককে আহ্বায়ক ও মীর জাহিদুল কবিরকে সদস্য সচিব করে বরিশাল মহানগর বিএনপির তিন সদস্যের আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ৪২ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি হিসেবে অনুমোদন দেয় কেন্দ্র। এরপর ১১ মার্চ নগরীর ৩০টি ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন মহানগর বিএনপি। সম্প্রতি ৩০ ওয়ার্ডে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে প্রথম দফায় ছয়টি ওয়ার্ডে আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। ৩ অক্টোবর রাতে দ্বিতীয় দফায় আরও আটটি ওয়ার্ডের কমিটি অনুমোদন দেন মহানগর নেতৃবৃন্দ।

বরিশাল মহানগর বিএনপির সাবেক কয়েকজন নেতা জানান, ৩ অক্টোবর রাতে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক ও সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবিরের অনুমোদিত নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কমিটি ঘোষণা দেওয়া হয়। এর পরদিনই চারজন যুগ্ম আহ্বায়কসহ ১৬ জন পদত্যাগ করেন।

সর্বশেষ বুধবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে নগরীর সাগরদী এলাকায় মহানগরের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন পদত্যাগকারীরা। এত শতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেন।

নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সিটি কাউন্সিলর ফিরোজ আহমেদ বলেন, সদ্য ঘোষিত ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কমিটিতে নওশাদ আহমেদকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতিতে অনুপস্থিত ছিলেন। তার ছেলে রাফি সদর আসনের সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের অনুসারী হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয়। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর ছবিসহ রাফির শুভেচ্ছা পোস্টার এখনো বিভিন্ন স্থানে শোভা পাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অন্যদিকে সদস্য সচিব করা হয়েছে রিয়াজুর রহমানকে। ২৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে রিয়াজ কোনো দিনই যুক্ত ছিলেন না। এছাড়া ২৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে কখনো অংশ নেননি, এমন বেশ কয়েকজনকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

ফিরোজ আহমেদ বলেন, ত্যাগী যোগ্য ও দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন করা প্রকৃত বিএনপি নেতাকর্মীরা পদবঞ্চিত করা হয়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই বুধবার বিকেলে বিক্ষোভ করেছি। মহানগর আহ্বায়ক কমিটি ওয়ার্ড কমিটি নিয়ে বাণিজ্য করেছে।

নগরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, কমিটি গঠনে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। আমাদের না জানিয়েই ওয়ার্ডে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। বিলুপ্ত ৭১ সদস্যের কমিটির মধ্যে মাত্র তিনজনের জায়গা হয়েছে আহ্বায়ক কমিটিতে। ঘোষিত কমিটির সদস্য মাসুম খলিফা গত সিটি নির্বাচনে ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলরের পক্ষে নির্বাচন পরিচালনা করেছেন। অপর সদস্য শেখ আ. রহমান বিগত সংসদ নির্বাচনে নৌকার পক্ষে কাজ করেছেন।

নগরীর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মীর হাসান মোর্শেদ সুমন বলেন, আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘনিষ্ঠভাজন হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকজনকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। গত সিটি নির্বাচনে ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের নৌকা প্রতীকের কাউন্সিলরের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন, এমন বেশ কয়েকজনের নাম রয়েছে কমিটিতে। ঘোষিত কমিটির সদস্য মো. জসিম উদ্দিন তাসু, মো. মশিউল আলম স্বপন ও মো. আ. হালিম গত সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অফিসে অবাধে যাতায়াত করেছেন। এছাড়া অঙ্গ সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতাদের ওয়ার্ডে গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়ে এক নেতা এক পদ নীতিও উপেক্ষা করা হয়েছে।

মীর হাসান আরও বলেন, ২২ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। হামলা-মামলার শিকার হতে হয়েছে। আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে। দল করার কারণে ছোটভাইকে গ্রেফতার ও কারাভোগ করতে হয়েছে। বর্তমানে আমার বিরুদ্ধে দুটি মামলা চলমান রয়েছে। আমাদের মতো নেতাদের ঠাঁই হয়নি কমিটিতে। বিষয়টি সত্যি দুঃখজনক।

বরিশাল মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জিয়া উদ্দিন সিকদার জাগো নিউজকে বলেন, ওয়ার্ড কমিটি গঠনে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশ উপেক্ষা করার অভিযোগ উঠেছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা ছিল, যারা আন্দোলন সংগ্রামে ছিল, দলের জন্য ত্যাগ শিকার করেছেন এমন নেতাকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবিতে রাখতে। সিদ্ধান্ত ছিল অঙ্গ সংগঠনে দায়িত্বশীলরা ওয়ার্ড কমিটিতে পদ পাবেন না। তবে বাস্তবে তা হচ্ছে না। অযোগ্য ও নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিরা কমিটিতে প্রাধান্য পাচ্ছেন। এটা হতাশাজনক। যারা চেয়ারম্যানের নির্দেশ মানেন না, তাদের নেতৃত্বে রাজনীতি করা কঠিন।

কমিটি গঠন নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন পর নগরীর ৩০টি ওয়ার্ড কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত নগরীর ১৪টি ওয়ার্ড কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কমিটি ঘোষণার পর নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙাভাব দেখা দিয়েছে। গঠনতন্ত্র মেনে যাচাই-বাছাই করে কমিটি দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আগামীতে সরকার বিরোধী আন্দোলনে যারা কাজ করতে পারবেন, তাদের নিয়েই কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এজন্য তরুণরা প্রাধান্য পাচ্ছেন। ওয়ার্ড কমিটিতে তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়ায় সিনিয়র পর্যায়ের কিছু নেতা বাদ পড়েছেন। একই কারণে অঙ্গ সংগঠনের দায়িত্বশীলদের ওয়ার্ড কমিটিতেও গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘনিষ্ঠভাজন হিসেবে পরিচিত, অযোগ্য সহ নিষ্ক্রিয় সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের পদায়নের অভিযোগ প্রসঙ্গে মনিরুজ্জামান ফারুক বলেন, বিএনপি বৃহৎ একটি দল। এখানে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকের সংখ্যাও বেশি। সবাইকে তো পদ দেওয়া সম্ভব নয়। পদ প্রত্যাশী কেউ কেউ তাদের ইচ্ছেমতো পদ পাননি, তাই এসব অভিযোগ করছেন। তবে অভিযোগের প্রমাণ তারা দিতে পারবেন না।

তিনি আরও বলেন, এখন ওয়ার্ডে আহবায়ক কমিটি করা হচ্ছে। আগামীতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে বড় পরিসরে। তখন বঞ্চিতদের মধ্যে যোগ্যরা পদ পাবেন। তখন হয়তো এ নিয়ে কারো কোনো অভিযোগ বা অসন্তোষ থাকবে না।

সাইফ আমীন/এসজে/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।