কৃষিতে চরম শ্রমিক সঙ্কট : দরকার আধুনিক যন্ত্রপাতি

মামুন আব্দুল্লাহ মামুন আব্দুল্লাহ
প্রকাশিত: ০৮:৫১ এএম, ১৮ মে ২০১৮

প্রতি বছরই ধানের উৎপাদন বাড়ছে। এই উৎপাদনের হার আরও বাড়িয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের চিন্তাও অমূলক নয়। কিন্তু বিপত্তি অন্য জায়গায়। কৃষিতে আগ্রহ হারাচ্ছে শ্রমিক। বেশির ভাগ শ্রমিকই এখন শিল্পমুখী। এজন্য চরম শ্রমিক সঙ্কটে পড়েছে কৃষি খাত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন বাজারে ধানের দাম বর্তমানে ৬ থেকে ৭ শ টাকা। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি একেবারে চড়া। ১ মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিককে দৈনিক মজুরি দিতে হচ্ছে। তথ্য অনুসারে, কৃষিতে শ্রমিক সংখ্যা ক্রমেই কমছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যেও ফুটে উঠেছে এই চিত্র।

বিবিএসের তথ্য অনুসারে, মোট শ্রমশক্তিতে কৃষিজীবীর অংশ আগের তুলনায় কমেছে। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে কৃষি খাতে ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ শ্রমিক কমেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেকোনো দেশ কৃষি থেকে শিল্পের দিকে ধাবিত হলে কৃষিতে শ্রমিক সঙ্কট দেখা দেয়ার নজির আছে। এই সমস্যা সমাধানে শিল্প উন্নত দেশগুলো কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশকেও সে দিকে হাঁটতে হবে। প্রতি বছরের বাজেটে এজন্য আলাদা বরাদ্দ দেয়া উচিত। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে ৭ লাখ মানুষ কৃষি খাত থেকে বেরিয়ে এসেছে। ২ কোটি ৫৪ লাখ থেকে কমে গত অর্থবছর কৃষিতে শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪৭ লাখে। শ্রমশক্তি জরিপ-২০১০ -এ কৃষিতে নিয়োজিত ছিল ৪০ দশমিক ৬৭ শতাংশ মানুষ। এখন সেটা কমছে ধীরে ধীরে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমজীবীদের অনেকে এখন শহরমুখী। ফলে গ্রামে কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন কমছে। শ্রমিকের অভাবে কৃষক অনেক জমি পতিত ফেলে রাখছেন। অনেকে অন্য কাজে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষিতে শ্রমিক সঙ্কট দেশের জন্য অশনি সংকেত। কেননা এতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শাসসুল আলম বলেন, একটি দেশের অর্থনীতি কৃষি নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে শিল্পের দিকে গেলে শ্রমশক্তিও শিল্পের দিকে যায়। এটা দেশের উন্নয়নের জন্য ভালো। বাংলাদেশ এখন শিল্প বিপ্লবের দিকে যাচ্ছে। সেজন্য মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান কমলেও বাড়ছে শিল্পের অবদান। ফলে মানুষ কৃষি ছেড়ে শিল্পের দিকে যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, ১৯৯৯-২০০০ সালের তুলনায় ২০০৯-১০ সময়ে দেশে কৃষি, বন ও মৎস্য, পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ ও কৃষিকাজে পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা কমেছিল ২.৩ শতাংশ। আবার ২০০২-০৩ সময়ের তুলনায় বর্তমানে কৃষি, বন ও মৎস্য খাতে পুরুষ শ্রমিক কমেছে ১০.৪ শতাংশ। যদিও ওই সময়ের মধ্যে এ খাতে নারী শ্রমিকের হার বেড়েছে।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফরিদা খাতুন বলেন, শিল্পায়নের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এজন্য কৃষি থেকে শিল্পের দিকে যাচ্ছে শ্রমশক্তি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে আধুনিক যন্ত্রপাতির দিকে ঝুঁকতে হবে। কৃষককে প্রশিক্ষিত করতে হবে। এছাড়া বাজেটে কৃষি যন্ত্রপাতির উপর বরাদ্দও বাড়ানোর প্রয়োজন।

একই ধরনের কথা বলেছেন পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান। তিনি বলেন, কৃষি থেকে মানুষ শিল্পমুখী হয়ে উঠছে। এখন কৃষি খাতকেও শিল্পনির্ভর করতে হবে। তা না হলে সমস্যা কাটানো যাবে না। এজন্য কৃষি খাতে আরও বেশি বেশি প্রযুক্তির প্রয়োজন ঘটাতে হবে। পাশাপাশি তরুণ সমাজকে কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত করতে হবে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। বিভিন্ন যন্ত্রে ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। এতে কৃষকও উৎসাহিত হচ্ছে, শ্রমিকের উপর নির্ভরতা কিছুটা হলেও কমছে।

এমএ/ওআর/এমবিআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :