শেয়ারবাজারে আলাউদ্দিনের চেরাগ দেখালো বার্জার

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৩৬ পিএম, ২২ মে ২০১৮ | আপডেট: ০৫:৪২ পিএম, ২২ মে ২০১৮

আলাউদ্দিনের চেরাগের মতো শেয়ারবাজারের মাধ্যমেও রাতারাতি বড় লোক হওয়া যায়, সেই কল্পিত কথাই যেন সত্যি করে দিলো বার্জার পেইন্টস। কোম্পানিটির শেয়ার দাম একদিনেই বেড়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকার ওপরে। লভ্যাংশ ঘোষণার সংবাদে মঙ্গলবার কোম্পানিটির শেয়ারের দামে এমন উলম্ফন ঘটেছে।

১০ টাকা অভিহিত মূল্যের বার্জার পেইন্টসের শেয়ার দাম এদিন ২ হাজার ৪৯ টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৬৯০ টাকায় লেনদেন হয়েছে। শেয়ার দামের এমন উলম্ফন ঘটলেও এটাকে স্বাভাবিক বলছেন শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা।

সোমবার বার্জার পেইন্টসের পর্ষদ সভায় ২০১৮ সালের ৩১ মার্চ সমাপ্ত বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ২০০ শতাংশ নগদ এবং ১০০ শতাংশ বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ হিসেবে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অর্থাৎ কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডাররা প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ২০ টাকা এবং একটি শেয়ার পাবেন।

এদিকে মোটা অঙ্কের লভ্যাংশ দেয়ার পাশাপাশি কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত মূলধন বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোম্পানিটির ৪০ কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধন বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে ডিএসইর মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।

লভ্যাংশ ও অনুমোদিত মূলধন বাড়ানোর ঘোষণার সংবাদেই মঙ্গলবার বার্জার পেইন্টের শেয়ার দাম ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। অবশ্য দিনের লেনদেন শেষে শেয়ার দাম বৃদ্ধির হার থাকে ৪০ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

আগের দিন লেনদেন শেষে কোম্পানিটি শেয়ার দাম ছিল ২ হাজার ৪৯ টাকা। যা মঙ্গলবার লেনদেন শেষে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯১৫ টাকা। তবে এদিন লেনদেনের এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দাম ৩ হাজার ৬৯০ টাকায় উঠে যায়। আর লেনদেনের শুরুতেই কোম্পানিটির শেয়ার দাম ছিল ২ হাজার ৬০০ টাকা।

২০০৬ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটি লভ্যাংশের বিষয়ে ডিএসই ২০১৭ ও ২০১৫ সালের তথ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যায় ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারহোল্ডারদের ৬০০ শতাংশ নগদ এবং ২০১৫ সালে ৩৭০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়।

আর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দামের বিষয়ে ডিএসইর ওয়েবসাইটে দুই বছরের তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে গত দুই বছরের মধ্যে বার্জার পেইন্টেসের শেয়ার দাম কখনো এত বেশি দামে লেনদেন হয়নি।

হঠাৎ শেয়ারের এমন দাম বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে বার্জার পেইন্টেসের কোম্পানি সচিব আবু জাফর সাদিক জাগো নিউজকে বলেন, আমরা এবং আমাদের স্পন্সররা (উদ্যোক্তা) শেয়ার লেনদেন করেন না। এটা হয় তো বোনাস শেয়ারের ইম্পাক্ট। বোনাস শেয়ার তো আমাদের কোম্পানির জন্য এক্সসেপশনাল।

শেয়ারের দাম ৩ হাজার ৬শ’ টাকা পর্যন্ত উঠে যাওয়াকে আপনারা স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন কি-না? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আজকে তো শেয়ারের দামের লিমিট নাই। যেদিন, সেদিন যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে। কালকে থেকে হয় তো নরমালে চলে আসবে।

২৩ কোটি ১৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানিটির মোট শেয়ারের সংখ্যা ২ কোটি ৩১ লাখ ৮৮ হাজার ৯৪০টি। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশ শেয়ারই রয়েছে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে। বকি শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে আছে দশমিক ৩৬ শতাংশ শেয়ার। আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং বিদেশিদের কাছে ২ দশমিক ১০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

বার্জার পেইন্টেসের শেয়ার দামের উলম্ফনের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েল অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, আজ (মঙ্গলবার) কোম্পানিটির শেয়ার দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোনো সার্কিট ব্রেকার নেই। গতকাল তারা ২০০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে এবং একটা শেয়ারের বিপরীতে একটি বোনাস শেয়ার দিয়েছে। সুতরাং এমন দাম বাড়তেই পারে। কারণ তারা কখনো বোনাস শেয়ার দেয়নি।

তিনি বলেন, যারা ৩ হাজার ৬০০ টাকায় কিনেছে তারা হয় তো এমন চিন্তা করেছে একটি বোনাস শেয়ার পেলে প্রতিটি শেয়ারের দাম পড়বে ১ হাজার ৮০০ টাকা। এটা অস্বাভাবিক কিছু না। ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে লাভবান হওয়া যায় এটা তারই প্রমাণ। এটা হতেই পারে। অন্যদেশেও হয়।

স্বল্প মূলধনের কোম্পানি হওয়ার কারণে কোম্পানিটির শেয়ার দাম এমন বাড়ছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে ডিএসইর এক পরিচালক বলেন, বার্জার পেইন্টেস ভালো মৌলভিত্তির শেয়ার। এই কোম্পানি থেকে বিনিয়োগকারীরা ভালো বেনিফিট পান। তবে একদিনে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়া কিছুটা হলেও অস্বাভাবিক। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন কম হওয়ার কারণেই এমন দাম বেড়েছে।

তিনি বলেন, এর আগে আমরা গত বছর স্বল্প মূলধনের কোম্পানি জেমিনি সি ফুডের শেয়ার দাম একদিনে অস্বাভাবিক ভাবে বাড়তে দেখেছি। কোম্পানিটির ৬০০ টাকার শেয়ারের দাম একদিনে বেড়ে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। সে সময়ও জেমিনি সি ফুডের ১২৫ শতাংশ লভ্যাংশ ও অনুমোদিত মূলধন বৃদ্ধির ঘোষণা আসে।

গত বছরের ২৭ অক্টোবার লভ্যাংশ ঘোষণার সংবাদে জেমিনি সি ফুডের শেয়ার দাম ৬০৩ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার টাকায় পর্যন্ত লেনদেন হয়। সে সময় কোম্পানিটির শেয়ার ওই দাম বৃদ্ধিকে জাগো নিউজের কাছে অস্বাভবিক বলে উল্লেখ করেছিলেন জেমিনি সি ফুডের কোম্পানি সচিব এএফএম নজরুল ইসলাম।

তিনি বলেছিলেন, আমাদের একটা ভালো ক্রেতা আছে, যারা আমাদের এখানে ভালো বিনিয়োগ করার সম্ভাবনা আছে। চিংড়ি খাতে যতই বাঁধা থাকুক আমাদের প্রজেক্ট বেশ ভালো আছে। অনেক কোম্পানি সেটা করতে পারছে না। এর একটা প্রভা হয় তো শেয়ার দামে পড়েছে। তবে আমি মনেকরি ১০ টাকার শেয়ারের এমন দাম হতে পারে না।

এমএএস/এমআরএম/এমএস