ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সে ‘অবৈধ’ সিইও, তদন্তের নির্দেশ

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:২২ পিএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদে মিয়া ফজলে করিমকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে- এমন অভিযোগ উঠায় তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-কে নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপ-সচিব মো. সাঈদ কুতুবের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সম্প্রতি এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চিঠিতে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে অবহিত করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী পদে নিয়োগ পাওয়া মিয়া ফজলে করিম মুখ্য নির্বাহী নিয়োগ ও অপসারণ বিধিমালা-২০১২ এর শর্ত পূরণ না করেই নিয়োগ নিয়েছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ে এমন অভিযোগ জমা পড়েছে।

ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, নিয়োগের শর্ত অনুসারে মিয়া ফজলে করিম শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত যেমন পূরণ করেননি, তেমনি মুখ্য নির্বাহীর অব্যবহিত পরের পদে তিন বছরের কাজের অভিজ্ঞতার শর্তও পূরণ করেননি।

মুখ্য নির্বাহী নিয়োগ ও অপসারণ প্রবিধানমালা ২০১২-এর শর্তানুসারে, মুখ্য নির্বাহী নিয়োগের শিক্ষাগত যোগ্যতা কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে অন্যূন তিন বছর মেয়াদের স্নাতক এবং এক বছর মেয়াদের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অথবা চার বছরের স্নাতক ও সমমানের ডিগ্রি লাগবে।

মিয়া ফজলে করিম ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীভুক্ত জগন্নাথ কলেজ থেকে একাউন্টিংয়ে দ্বিতীয় বিভাগে স্নাতক (বিকম অনার্স) পাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) থেকে তিনি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ডিগ্রি লাভ করেন। সে হিসাবে তিনি প্রবিধানে নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত পূর্ণ করেননি।

শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি মুখ্য নির্বাহী নিয়োগ ও অপসারণ প্রবিধানমালা ২০১২-এর শর্তানুসারে, মুখ্য নির্বাহী নিয়োগ পেতে একই ধরনের কোনো কোম্পানির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে অন্যূন তিন বছরের কর্ম-অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।

ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেতে মিয়া ফজলে করিম ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদধারণের স্বপক্ষে তিনটি সনদ দাখিল করেন। ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ভাইস-চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা অরুণ কুমার সাহা এবং এএমডি অ্যান্ড সিএফও আবদুল হামিদ ওই তিনটি সনদে স্বাক্ষর করেছেন।

এসব সনদে তিনি উল্লেখ করেছেন, ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) অ্যান্ড চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তবে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের ওয়েবসাইট-এ ২০১১ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ রয়েছে এডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর বা এএমডি। এ পদের দায়িত্বে রয়েছেন অরুণ কুমার সাহা। ডিএমডি হিসেবে রয়েছেন চারজন। তাদের মধ্যে মিয়া ফজলে করিমের নাম নেই।

একইভাবে ২০১২ সালের আর্থিক প্রতিবেদন যাচাই করে দেখা যায়, কোম্পানিটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পরের পদ এডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর বা এএমডি। ওই পদের দায়িত্বে রয়েছেন অরুণ কুমার সাহা। ডিএমডি পদে কোম্পানিটির সিএফওসহ পাঁচজনের নাম রয়েছে। এখানেও মিয়া ফজলে করিমের নাম নেই। ২০১২ সালে কোম্পানিটির সিএফও হিসেবে আব্দুল হামিদের নাম রয়েছে।

তথ্যে এমন গড়মিল থাকার পরও মিয়া ফজলে করিমকে ২০১৫ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ করে ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। কোম্পানিটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ১৮ নভেম্বর তিন বছরের জন্য অর্থাৎ ২০১৫ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে ২০১৮ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত তার নিয়োগ অনুমোদন করে আইডিআরএ।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মিয়া ফজলে করিম জাগো নিউজক বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কি না- তা আমার জানা নেই। তবে আমি সকল যোগ্যতা অর্জন করেই মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হয়েছি।

আপনার মাস্টার্স ডিগ্রি আছে কি- জাগো নিউজের পক্ষ থেকে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি অনার্স করেছি। প্রবিধানে মাস্টার্স ছাড়া আরও চারটি অপশন আছে। তার একটি আমার আছে। মাস্টার্সের বিকল্প চারটি অপশন কী কী- এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে আমার তা মনে নেই।

সিইও'র অব্যবহিত পরের পদে তিন বছরের অভিজ্ঞতার বিষয়ে আইডিআরএ-তে যে সনদ দাখিল করা হয়েছ তার সঙ্গে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের ওয়েবসাইটে প্রকাশি আর্থিক প্রতিবেদনের মিল না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটি ওই কোম্পানিই (ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স) ভালো বলতে পারবে। কেন তারা আর্থিক প্রতিবেদনে আমাকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি হিসেবে দেখায়নি? তবে আমি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি ছিলাম। সে কারণেই আইডিআরএ আমার নিয়োগ অনুমোদন করেছে।

যোগাযোগ করা হলে আইডিআরএ সদস্য বোরহান উদ্দন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে আমাদের চেয়ারম্যান এবং বাকি সদস্যরা কেউ অফিসে নেই। কেউ ছুটিতে আছেন, কেউ বিদেশে। ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কী নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দেশনা পাঠানো হলে অবশ্যই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

এমএএস/এমএআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :