এসএমএস ‘দ্বন্দ্বে’ বীমা গ্রাহকরা

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:০৮ এএম, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বীমা খাত আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের অংশ হিসেবে বীমাগ্রাহকদের প্রিমিয়ামের টাকা পরিশোধ সংক্রান্ত তথ্য এসএমএস’র (মুঠোফোনে খুদে বার্তা) মাধ্যমে দেয়ার লক্ষ্যে ইউনিফাইড মেসেজিং প্লাটফর্ম বা ইউএমপি’র উদ্যোগ নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বীমা কোম্পানিগুলোকে নির্দেশও দিয়েছে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

তবে ইউএমপি বাস্তবায়ন বা এসএমএস দেয়ার দায়িত্ব এক বেসরকরি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়া এবং এসএমএসের ব্যয় নির্ধারণ নিয়ে বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে আইডিআরএ’র উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা দেখা দিয়েছে। এমনকি হাইকোর্টের একজন আইনজীবী গ্রাহক হিসেবে আইডিআরএ’র নির্দেশনা স্থগিতেরও আবেদন করেছেন।

ইউএমপি বাস্তবায়নের বিষয়ে কোম্পানিগুলোতে পাঠানো আইডিআরএ’র নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ইউএমপি’র মাধ্যমে প্রত্যেক বীমাগ্রাহককে এসএমএস’র মাধ্যমে লেনদেনের নোটিফিকেশন পাঠানো হবে। ফলে স্বচ্ছতা ও আস্থা অনেকাংশেই প্রতিষ্ঠিত হবে, যার মাধ্যমে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি উপকৃত হবে। ইউএমপি বাস্তবায়নের কারণে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে কোম্পানিগুলোকে পৃথকভাবে কোনো যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হবে না। ফলে খরচ কমে আসবে এবং তামাদি পলিসিও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।

ইউনিফাইড মেসেজিং প্লাটফর্ম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানিগুলোকে তাদের পলিসি ও পলিসিহোল্ডার সংক্রান্ত সব ধরনের তথ্য নির্ধারিত ফরমেটে ইউএমপি পোর্টালে আপলোড করতে বলা হয়েছে। এ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি বীমা কোম্পানির দুজন কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেবে আইডিআরএ। একই সঙ্গে ইউএমপি’র সেবা সম্পর্কে বীমাগ্রাহকদের সচেতন করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে বীমাকারীদের।

ইউএমপি বাস্তবায়নে বীমা কোম্পানিগুলোকে তাদের প্রতিটি পলিসির বিপরীতে ত্রৈমাসিক ভিত্তিক তথা প্রতি তিন মাসে আট টাকা হারে খরচ করতে হবে। পে-অর্ডার অথবা পে-চেকের মাধ্যমে প্রথম মাসের এক তারিখের মধ্যে আইডিআরএ-কে জানিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ডিওইআর সার্ভিস লিমিটেড বরাবর এ টাকা পরিশোধ করতে হবে।

বীমা কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, ইতোমধ্যে বেস কয়েকটি কোম্পানি বীমা পলিসির প্রিমিয়ারের বিপরীতে গ্রাহকদের এসএমএস সেবা দেয়া শুরু করেছে। এক্ষেত্রে এসএমএস’র জন্য কোম্পানির যে অর্থ খরচ হচ্ছে, আইডিআরএ তার থেকে কয়েকগুণ বেশি খরচ নির্ধারণ করেছে।

আইডিআরএ’র নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে এসএমএস’র জন্য প্রতি বছর বীমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিতভাবে অর্ধশত কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। পাশাপাশি বীমাগ্রাহকের তথ্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যা অনিরাপদ এবং কোনোভাবেই আইনসঙ্গত নয়।

তাদের অভিযোগ, আইডিআরএ বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করেই এমন নির্দেশনা দিয়েছে। এমনকি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে ইউএমপি বাস্তবায়নের কাজ তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে আইনও মানেনি বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেয়ার ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান করতে হয়। কিন্তু আইডিআরএ কোনো দরপত্র আহ্বান না করেই ‘ডিওইআর সার্ভিস লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ইউএমপি’র দায়িত্ব দিয়েছে।

বিভিন্ন বীমা কোম্পানিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিটি পলিসিগ্রাহককে বছরে দুটি থেকে ২৪টি এসএমএস পাঠানো হয়। যেসব গ্রাহক বার্ষিক ভিত্তিতে প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন তাদের দুটি, ষান্মাসিক প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে বছরে চারটি, ত্রৈমাসিক প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে ১২টি এবং মাসিক প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে ২৪টি এসএমএস পান বীমাগ্রাহকরা।

প্রিমিয়াম পরিশোধে তাগাদা দেয়ার জন্য একবার এবং প্রিমিয়াম গ্রহণের পর আরও একবার গ্রাহককে তা নিশ্চিত করতে নোটিফিকেশন পাঠানো হয়। প্রতিটি এসএমএস পাঠাতে বীমা কোম্পানির খরচ হয় ভ্যাট-ট্যাক্সসহ ৫৭ পয়সা। অর্থাৎ কোনো পলিসিগ্রাহককে সর্বোচ্চ সংখ্যক এসএমএস পাঠানো হলেও কোম্পানির খরচ হয় বছরে ১৩ টাকা ৬৮ পয়সা। আর বার্ষিক প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে এ খরচ এক টাকা ১৪ পয়সা।

ইউনিফাইড মেসেজিং প্লাটফর্ম বাস্তবায়নের জন্য আইডিআরএ থেকে বীমা কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা পাঠানোর পর বীমা মালিক ও নির্বাহীদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) পক্ষ থেকে কোম্পানিগুলোর কাছে মতামত চাওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েকটি কোম্পানি ইতোমধ্যে বিআইএ’র কাছে অভিমত দিয়েছে। প্রতিটি কোম্পানিই আইডিআরএ’র নির্দেশনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

এরই মধ্যে একটি জীবন বীমা কোম্পানি বিআইএ-কে বলেছে যে, আইডিআরএ’র নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে তাদের বছরে অতিরিক্ত খরচ হবে ছয় কোটি ৫৩ লাখ টাকা। কারণ বর্তমানে গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় তথ্য এসএমএস’র মাধ্যমে সরবরাহ করতে বছরে একটি পলিসির জন্য গড়ে খরচ হয় দুই টাকা ২০ পয়সা। কিন্তু আইডিআরএ’র নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে একটি পলিসির জন্য বছরে খরচ হবে ৩২ টাকা, এর সঙ্গে ভ্যাটও দিতে হবে। অতিরিক্ত অর্থব্যয়ের কারণে স্বাভাবিকভাবে বীমার গ্রাহকদের বোনাস ও লভ্যাংশ বহুলাংশে হ্রাস পাবে।

এদিকে নির্দেশনা প্রত্যাহারের জন্য বীমাগ্রাহক হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তনয় কুমার সাহা আইডিআরএ-তে একটি আবেদন করেছেন। ওই আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি নীতি অনুসারে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদানের সময় দরপত্র আহ্বানের যে বিষয়টি রয়েছে এখানে সেটি লঙ্ঘন হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আইডিআরএ’র সদস্য ড. এম মোশাররফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, যারা বলছেন এসএমএস খরচ ১৪ টাকা, এটা ঠিক আছে। কিন্তু এর নিয়মিত ব্যবস্থাপনা এবং ৭৮টি কোম্পানির জন্য ৭৮টি মডিউল তৈরি করা; প্রতিটি বিষয়ে আলাদা আলাদা খরচ আছে। এ খরচ কিন্তু ৩২ টাকার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে ব্যক্তিগত তথ্য তুলে দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ তথ্যও ঠিক নয়। তথ্য অন্য কোথাও যাবে না, তথ্য আইডিআরএ’র কাছেই থাকবে। ওই প্রতিষ্ঠান শুধু সিস্টেম চালু করে দেবে। তথ্য আইডিআরএ’র বাইরে যাবে না।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক এসএমএস’র জন্য প্রতি বছর ১৫০ টাকা নেয়। বীমার প্রতি পলিসিতে নেয়া হবে ৩২ টাকা। এটাই আমরা মেনে নিতে পারছি না। যে কারণে আমাদের বীমার এ দশা। এছাড়া সাধারণ বীমায় কত টাকা চুরি হয়, আপনি বিশ্বাসই করতে পারবেন না। ওই চুরিটা যাদের বন্ধ হবে তারাই এটা মেনে নিতে পারছেন না। বিষয়টি তাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘একজন এতদিন শান্তভাবে চুরি করত, এখন বাধা দিলে তার তো সমস্যা হবেই।’

দরপত্র ছাড়াই বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি নিয়মকানুন মেনেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়েছে। দরপত্র ছাড়াও কাজ দেয়ার সুযোগ আছে।’

এমএএস/এমএআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :