বেশির ভাগ সূচক নিম্নমুখীর পরও কিভাবে বাড়ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি!

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৫৭ পিএম, ০৩ নভেম্বর ২০১৯

ব্যাংক খাতের দুরবস্থা, পুঁজিবাজারে দরপতন, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ আশানুরূপ নয়, রফতানি প্রবৃদ্ধিও সন্তোষজনক হারে বাড়ছে না। এরপরও দিন দিন বেড়েই চলেছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি। এটি কিভাবে বাড়ছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণেই ‘বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পরিমিতিকে সুতাকাটা ঘুড়ি বলে আখ্যায়িত করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।

রোববার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট রিভিউ অব বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট’ শীর্ষক বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বাধীন পর্যালোচনায় এ কথা বলেন সিপিডি সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণের মতো সমস্যায় জর্জরিত। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ছে না। পুঁজিবাজারের অস্থিরতা বিরাজ করছে। অর্থ পাচার খুব স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে। আইন থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ নেই। যার কারণে দিন দিন অপরাধ ডালপালা গজিয়ে বড় হচ্ছে।

তথ্যের স্বল্পতা নিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য উপাত্তগুলোর লভ্যতা কমে যাচ্ছে। যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তার সময়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এছাড়া প্রাপ্ত তথ্যগুলো অনেকটাই সন্দেহপ্রবণ। নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে যারা এ তথ্য উপাত্ত পরিবেশন করেন বা তৈরি করেন তাদেরকে জনগণের সামনে সেই তথ্য প্রকাশ এবং যৌক্তিকতা বিশ্লেষণের আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির বিশেষ ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান ও খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন ও গবেষণায় সাহায্যকারী দল।

পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে সিপিডি জানায়, বর্তমান পুঁজিবাজারে দুষ্টচক্রের আনাগোনা বেড়ে গেছে। এর ফলে সূচক ক্রমাগতভাবে পতন হচ্ছে। দুর্বল আইপিও, অস্বচ্ছ বার্ষিক প্রতিবেদন, বিও অ্যাকাউন্টের অপর্যাপ্ত স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রশ্নবিদ্ধ কার্যক্রম পুঁজিবাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এসব সমস্যা সমাধানে কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার কোনো বিকল্প নেই। এছাড়াও নীতিনির্ধারণী সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করছে কিনা এ বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলেও জানায় সিপিডির গবেষকরা।

একটি তথ্য উপস্থাপন করে বলা হয়, আমাদের সামনে সবসময় ২৭ লাখ অ্যাকাউন্টের তথ্য উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু প্রকৃত চিত্র আসলে ভিন্ন। বর্তমানে পুঁজিবাজারের মোট বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৬৬ লাখের অধিক। প্রতিবছর যে হারে বিও অ্যাকাউন্ট বাড়ছে সে হারে বিনিয়োগ বাড়ছে না। সুতরাং নতুন নতুন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে তুলে নেয়া হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। এ সমস্যা সমাধানে বিও অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য টিআইএন নাম্বার, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দেয় সিপিডি।

খেলাপি ঋণ দেশের মোট জিডিপি সাড়ে ৪ শতাংশ খেয়ে ফেলেছে উল্লেখ করে গবেষণা সংস্থাটি বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ১২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। যা ব্যাংক থেকে বিতরণকৃত ঋণের ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। শক্ত হাতে খেলাপি ঋণ দমন করা গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি হতে পারত।

গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, খেলাপি ঋণ আদায় হলে তার মাধ্যমে আলাদা আলাদাভাবে দেশের চলমান অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল। যেমন তিনটি পদ্মা সেতু অথবা তিনটি পদ্মা রেলওয়ে ব্রিজ, তিনটি মাতারবাড়ি পাওয়ার প্ল্যান্ট, পাঁচটি মেট্রোরেল অথবা সাতটি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র।

গবেষণায় আরও তুলে ধরা হয় ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান ব্যাংকগুলোতেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের শেষে মোট খেলাপি ৪২ শতাংশ ছিল বেসরকারি ব্যাংকের। কিন্তু ২০১৮-১৯ সালে বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৬ শতাংশ।

ব্যাংকিং খাতের মূলধন সম্পর্কে বলা হয়, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে মূলধনের অপর্যাপ্ততা একটি বড় সমস্যা। ঋণ বিতরণের তুলনায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। এ কারণে দিন দিন বেড়ে চলেছে কলমানি থেকে দৈনিক ভিত্তিতে টাকা ধারের প্রবণতা। এছাড়া সম্প্রতি দেখা গেছে কিছু বিশেষ ব্যাংকে সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে আমানত বৃদ্ধি করা হচ্ছে। যা আর্থিক খাতের জন্য মোটেও সুখকর নয়। ২০০৯-১৭ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যাংকে ১৫ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা তারল্য সরবরাহ করেছে সরকার। এ কারণে খারাপ ব্যাংকগুলো আরও উৎসাহিত হবে বলে ধারণা সিপিডির।

ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন তথ্য পূর্বের তুলনায় অনেকটাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় সুশাসন ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। তাই ব্যাংক খাতকে শৃঙ্খলায় আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বিচার ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ এবং সক্রিয় করার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।

চলমান ক্যাসিনো অভিযান সম্পর্কে দেবপ্রিয় বলেন, অভিযানে প্রাপ্ত টাকা এবং আর্থিক খাতের চুরি যাওয়া টাকাকে আমি ভিন্নভাবে দেখতে চাই না। এগুলো পুঁজিবাজার লোপাট করা টাকা, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়া টাকা, এবং বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে লুকিয়ে রাখা টাকা, ট্যাক্স ফাঁকির টাকা। আর্থিক খাতের এ সব সমস্যা সমাধান করতে বিদ্যমান ফৌজদারি আইনের মাধ্যমে নয় বরং অর্থনৈতিক সংস্কারের পথ বেছে নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

এসআই/এএইচ/এমএস