কাজ শুরুর আগেই ক্ষেত্রবিশেষ ব্যয় বাড়ছে পাঁচগুণ

মেসবাহুল হক
মেসবাহুল হক মেসবাহুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৫৫ পিএম, ১২ নভেম্বর ২০১৯

>> বিদেশে প্রশিক্ষণে ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি ৫০ লাখ, এখন হচ্ছে ৫ কোটি
>> যানবাহন ভাড়ায় ব্যয় ধরা হয় ৪৮ লাখ, এখন হচ্ছে ১ কোটি ২০ লাখ
>> সুবিধাভোগীদের সচেতনতায় ব্যয় ধরা হয় ১০ লাখ, এখন ৫০ লাখ টাকা

রফতানি পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার্য উপকরণ আমদানিতে উদ্যোক্তারা বরাবরই শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করছেন। বন্ডেড ওয়্যারহাউস হিসেবে পরিচিত এ ব্যবস্থায় প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার শুল্ক রেয়াত পাচ্ছেন তারা। তবে এ সুযোগের অপব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এসব পণ্য বাজারে বিক্রি করছেন। ফলে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্প অসম প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি অবসানে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে বন্ড ব্যবস্থার আধুনিকায়ন তথা বন্ড ব্যবস্থাপনাকে স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেশন করার প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। এটি শেষ করার কথা ছিল চলতি বছরের জুনে। কিন্তু জুন শেষ হয়ে নভেম্বর এলেও কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হলেও বন্ড অটোমেশন প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে এর মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সংশোধিত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রস্তুত করেছে সংস্থাটি। এ প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। সংশোধিত ডিপিপিতে ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৯৫ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের কিছুকিছু অংশে ব্যয় দ্বিগুণ থেকে পাঁচগুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার জন্য কার্যপত্র প্রস্তুত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এ কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সংশোধিত ডিপিপিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন সময়কাল ধরা হয়েছে ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালে জুন পর্যন্ত।

bond

এ প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে যানবাহন ভাড়া বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৪৮ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধিতে এটি বাড়িয়ে করা হয় এক কোটি ২০ লাখ টাকা। মূল ডিপিপিতে পিআইইউ অফিস ভাড়া বাবদ বরাদ্দ রাখা হয় ৬০ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধিতে এটি বাড়িয়ে বরাদ্দ ধরা হয় এক কোটি ২০ লাখ টাকা।

মূল ডিপিপিতে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বাবদ বরাদ্দ রাখা হয় দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধিতে এটি বাড়িয়ে বরাদ্দ ধরা হয় পাঁচ কোটি টাকা। মূল ডিপিপিতে সুবিধাভোগীদের সচেতনতা খাতে বরাদ্দ রাখা হয় ১০ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধিতে এটি বাড়িয়ে বরাদ্দ ধরা হয় ৫০ লাখ টাকা।

মূল ডিপিপিতে কনসালটেন্সি (প্রকিউরমেন্ট) বাবদ বরাদ্দ রাখা হয় ৩৬ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধিতে এটি বাড়িয়ে বরাদ্দ ধরা হয় ৬৫ লাখ টাকা। মূল ডিপিপিতে অ্যাসাইকুডা ওয়াল্র্ড, আইবাস প্লাস প্লাস, ব্যাংক ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সিস্টেমের সঙ্গে ইন্টিগ্রেশন বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল এক কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধিতে এটি বাড়িয়ে বরাদ্দ ধরা হয় তিন কোটি টাকা।

bond

প্রকল্পটির বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের মতামত হচ্ছে, প্রকল্পে নতুনভাবে একজনকে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালকের সংস্থানসহ জনবল খাতে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ১৪ লাখ ৯১ হাজার টাকা। অথচ পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালকের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জনবল নির্ধারণ কমিটির সুপারিশ নেই।

পরিকল্পনা কমিশন আরও বলছে, প্রকল্পের আওতায় কিছু পদ যেমন- হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, অফিস সহকারী-কাম কম্পিউটার অপারেটর, সিস্টেম এনালিস্ট, প্রোগ্রামার, নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে সরাসরি নিয়োগের সংস্থান রাখা হয়েছে। কিন্তু অর্থ বিভাগের জনবল নির্ধারণ কমিটির সুপারিশ প্রস্তাবিত আরডিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়নি।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেশন না হওয়ায় দেশীয় শিল্প হুমকির মুখে পড়ছে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারী বন্ডের বর্তমান অব্যবস্থাপনা ও অস্বচ্ছতার সুযোগ নিচ্ছে। এতে বন্ডের কার্যক্রম শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, বরং রাজস্ব ফাঁকি ও দেশীয় শিল্প হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি করা ওই গোপন প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশীয় রফতানিমুখী শিল্পকে সুবিধা দেয়া এবং ব্যবসার প্রসার ঘটাতে বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সুবিধা দেয় সরকার। কিন্তু বন্ডের সামগ্রিক ম্যানুয়াল ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। অনুমোদন ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ নথি চালাচালির কারণে দলিলাদি হারিয়ে যাচ্ছে ও চুরি হচ্ছে। কাস্টমস কর্মচারীদের মাধ্যমে সহজেই তথ্য আড়ালসহ অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

bond

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি- বিজিএমইএ’র জারি করা ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন বা ইউডি যথাযথভাবে তদারকি না থাকায় বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বাড়ছে। নিয়মতান্ত্রিক হিসাব রাখা হয় না, বরং স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়। প্রতিদিনের নথি ব্যবস্থাপনায়ও আছে জটিলতা।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, জনবলের ঘাটতি রয়েছে। যে কারণে প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে হয়তো কিছুটা সময় বেশি লাগছে। তবে, আমরা দ্রুতই বন্ড অটোমেশনে চলে যাব।

‘চোরাচালান রোধ ও স্বচ্ছতা আনতে হলে অটোমেশনের বিকল্প কিছু নেই। একই সঙ্গে অটোমেশন হলে কাস্টমস কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সুসম্পর্ক আরও বেশি বিদ্যমান থাকবে। কেননা অনেক সময় কাস্টমস ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়। তবে অটোমেশন হয়ে গেলে সেটা আর হবে না। কাজেই অটোমেশন খুব দ্রুতই হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই’- যোগ করেন তিনি।

এমইউএইচ/এমএআর/এমএস