সাধারণ বীমার সম্পদের ৬০% পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:০৩ এএম, ১৯ নভেম্বর ২০১৯

>> লিজিং কোম্পানিতে রাখা যাবে আমানত
>> তফসিলি ব্যাংকে রাখা যাবে সম্পদের ৮০%
>> মিউচ্যুয়াল ফান্ডে সম্পদের ২০% বিনিয়োগ
>> স্থাবর সম্পদে বিনিয়োগ করা যাবে সম্পদের ২০%
>> এক ব্যাংকে রাখা যাবে সম্পদের ১৫%

বিনিয়োগযোগ্য সম্পদের ৬০ শতাংশই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ রেখে সাধারণ বীমা কোম্পানির সম্পদ বিনিয়োগ নীতিমালা করা হচ্ছে। কিছু শর্তসাপেক্ষে অগ্রাধিকার বা সাধারণ শেয়ার, মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও ডিবেঞ্চারের মাধ্যমে এ সম্পদ বিনিয়োগ করা যাবে। একই সঙ্গে অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখারও সুযোগ রাখা হয়েছে।

এজন্য ‘নন-লাইফ বীমাকারীর সম্পদ বিনিয়োগ ও সংরক্ষণ’ শিরোনামে প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করেছে সরকার। সরকারের অনুমোদন নিয়ে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সম্প্রতি এ প্রবিধানমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে।

সাধারণ বীমা কোম্পানির সম্পদের একটি অংশ দেশের ভেতরে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের শর্তারোপ করা হয়েছে প্রবিধানমালায়। এ বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সাধারণ বীমা কোম্পানির দায়ের অতিরিক্ত এক কোটি টাকা বা নিট প্রিমিয়াম আয়ের ১০ শতাংশ, এর মধ্যে যেটা বেশি হবে সেই পরিমাণ সম্পদ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে হবে।

বাধ্যতামূলকভাবে এ বিনিয়োগের পর অতিরিক্ত অর্থ দেশে বা বিদেশি বিনিয়োগ করা যাবে। তবে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশের যথাযথ কর্তৃপক্ষের এবং যে দেশে বিনিয়োগ করা হবে সেই দেশের সরকারের অনুমোদন নিতে হবে।

সাধারণ বীমা কোম্পানির সম্পদের সাড়ে ৭ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। বাকি অর্থ শর্তসাপেক্ষে শেয়ার, মিউচ্যুয়াল ফান্ড, বন্ড, স্থায়ী সম্পদ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত, সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হচ্ছে। এছাড়া আইডিআরএ’র অনুমোদন নিয়ে অন্যান্য সম্পদেও বিনিয়োগ করা যাবে।

একটি সাধারণ বীমা কোম্পানি সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের পর অবশিষ্ট থাকা সম্পদের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানির অগ্রাধিকার বা সাধারণ শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারবে। তবে ‘জেড’ গ্রুপে থাকা কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা যাবে না। একক কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ওই কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশ এবং সাধারণ বীমা কোম্পানিটির সম্পদের ৫ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ করা যাবে না।

মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও ডিবেঞ্চারে বিনিয়োগের বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) অনুমোদিত বা নিয়ন্ত্রিত মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও ইউনিট ফান্ডে সম্পদের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বিনিয়োগ করা যাবে। এছাড়া বিএসইসি অনুমোদিত যেকোনো ডিবেঞ্চারে সম্পদের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করা যাবে।

পুঁজিবাজারের বাইরে বাংলাদেশ সরকারের গ্যারান্টিযুক্ত ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে ইস্যু করা বন্ড এবং বাংলাদেশে অনুমোদিত রেটিং সংস্থা থেকে ‘এএ’ বা সমমানের রেটিং মান পাওয়া বন্ডে সাধারণ বীমা কোম্পানির সম্পদের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া সরকারের অনুমোদন নিয়ে সিটি করপোরেশন থেকে ইস্যু করা ডিবেঞ্চার বা অন্যান্য সিকিউরিটিজে সম্পদের ৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করা যাবে।

স্থাবর সম্পত্তিতে একটি সাধারণ বীমা কোম্পানি তার সম্পদের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারবে। এ বিনিয়োগের সম্পূর্ণ অংশই সিটি করপোরেশন এলাকায় অথবা কোনো পৌরসভায় অবস্থিত দায়হীন ও নিষ্কণ্টক স্থাবর সম্পত্তিতে করা হবে। কোম্পানি চাইলে আবাসিক, দাফতরিক বা দোকান হিসেবে ব্যবহৃত অথবা লিজ করা প্রথম বন্ধকী স্থাবর সম্পত্তিতেও বিনিয়োগ করতে পারবে।

তবে লিজ করা সম্পত্তির লিজের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৩০ বছর এবং সম্পত্তির মূল্য লিজ করা সম্পত্তির মূল্যের ৫০ শতাংশ হতে হবে। এক্ষেত্রে সম্পত্তি আবাসিক কাজে ব্যবহার করা হলে সাধারণ বীমা কোম্পানি সম্পদের সর্বোচ্চ ২ শতাংশ এবং দাফতরিক বা দোকান হিসেবে ব্যবহারের জন্য ভাড়া দেয়া হলে সম্পদের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বিনিয়োগ করা যাবে।

ব্যাংকে আমানতের বিষয়ে শর্ত রাখা হয়েছে, অনুমোদিত রেটিং সংস্থা থেকে ‘এ’ বা তার থেকে ভালো রেট পাওয়া তফসিলি ব্যাংকে সম্পদের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত গচ্ছিত রাখা যাবে। তবে স্থায়ী, চলতি, আংশিক স্থায়ী, আংশিক চলতি যেভাবেই আমানত রাখা হোক একটি ব্যাংকে সম্পদের ১৫ শতাংশের বেশি গচ্ছিত রাখা যাবে না।

এতদিন বীমা কোম্পানিগুলো লিজিং কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখতে পারত না। তবে এবার লিজিং কোম্পানিতে বীমা কোম্পানির আমানত রাখার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রবিধানে বলা হয়েছে, অনুমোদিত রেটিং সংস্থা থেকে ‘এ’ বা তার থেকে ভালো রেট পাওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সম্পদের ১০ শতাংশ পর্যন্ত গচ্ছিত রাখা যাবে। তবে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী আমানত হিসেবে সম্পদের ২ শতাংশের বেশি গচ্ছিত রাখা যাবে না।

এছাড়া আইডিআরএ পূর্বানুমোদন নিয়ে সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে সম্পদের ২০ শতাংশ এবং অন্য ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করা যাবে।

এতে বলা হয়েছে, প্রতিটি কোম্পানিকে বিনিয়োগ বিষয়ক নিরীক্ষা কাজ শেষ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে পূ্র্বের বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোম্পানির মোট সম্পদের পরিমাণ উল্লেখ করে বিনিয়োগের শ্রেণিভিত্তিক একটি বিবরণী আইডিআরএ’র কাছে পাঠাতে হবে। এতে কোম্পানির চেয়ারম্যান, দু’জন পরিচালক, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তার সই থাকতে হবে এবং নিরীক্ষকের প্রত্যায়িত হতে হবে।

আইডিআরএ যেকোনো বীমা কোম্পানির সম্পদ পরিদর্শন করতে পারবে। এজন্য কোম্পানির কাছে আইডিআরএ কোনো তথ্য চাইলে প্রতিষ্ঠানটি তা দিতে বাধ্য থাকবে। যদি কোম্পানি তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়, তবে বীমা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে আইডিআরএ।

যোগাযোগ করা হলে ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্সর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জামিরুল ইসলাম বলেন, লিজিং কোম্পানিতে আমানত রাখার সুযোগ দেয়া ভালো হয়েছে। দেশে অনেক ভালো ভালো লিজিং কোম্পানি আছে। আগে বীমা কোম্পানিগুলো লিজিং কোম্পানিতে আমানত রাখতে পারত না। এখন লিজিং কোম্পানিতে আমানত রাখা যাবে। এতে যেখানে বেশি সুবিধা পাওয়া যাবে বীমা কোম্পানি সেখানে আমানত রাখবে।

কোন কোন বিষয় বীমা কোম্পানির দায় হিসেবে বিবেচিত হবে তাও প্রবিধানে নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। বীমা কোম্পানির দায়ের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশে বীমা ব্যবসার ক্ষেত্রে বকেয়া নিট দাবি, অগ্নি ও নৌ (কার্গো) এবং বিবিধ বীমার নিট প্রিমিয়ামের ৪০ শতাংশ, নৌ (হাল) ও এভিয়েশন (হাল) বীমার নিট প্রিমিয়ারের ১০০ শতাংশ, প্রস্তাবিত লভ্যাংশ এবং অপরিশোধিত লভ্যাংশ দেয়ার জন্য আবশ্যকীয় অর্থ, বীমা ব্যবসা করা বীমা কোম্পানিগুলোর নিকট প্রদেয় অর্থ, সরকারি রাজস্ব বাবদ প্রদেয় অর্থ এবং পরিশোধিত মূলধন, সাধারণ সঞ্চিতি, বিনিয়োগ সঞ্চিতি, কুঋণ, সন্দেহপূর্ণ কুঋণ সঞ্চিতি ও অবচয় তহবিল বাদ দিয়ে অন্যান্য পাওনাদারের নিকট প্রদেয় অর্থ।

যেগুলো কোম্পানির সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে না-

>> প্রত্যেক বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বকেয়া কিস্তির সেই পরিমাণ অর্থ, যা পরবর্তী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত অথবা আইনের ৩২ ধারার অধীন নিরীক্ষক আর্থিক বিবরণী সই করা পর্যন্ত যা আদায় হয়নি।

>> আইনের ৩২ ধারার অধীনে নিরীক্ষক আর্থিক বিবরণীতে সই করা পর্যন্ত বকেয়া দায়-দেনা।

>> আসবাবপত্র ও সরাঞ্জামাদি, স্টেশনারি ও পরিত্যক্ত মালামালের মজুত।

>> আইডিআরএ থেকে নির্ধারণ করা বিলম্বিত ও পূর্ব পরিশোধিত ব্যয়।

>> যেকোনো অস্পর্শনীয় সম্পদ।

এমএএস/এমএআর/এমকেএইচ