আশা-নিরাশার দোলাচলে পুঁজিবাজার

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:০৫ এএম, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

এই উত্থান, এই পতন। এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। লেনদেনের গতি বৃদ্ধি আর সূচকের উত্থানে বিনিয়োগকারীর নতুন স্বপ্ন বোনার আগেই তা ভেঙে যাচ্ছে হুট করে। দুর্দিন কাটিয়ে পুঁজিবাজারে সুদিন ফেরার আভাস দিলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। ফলে বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা বাড়ছে। অবশ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। শিগগিরই সুদিন ফিরবে।

তাদের অভিমত, গত কয়েক মাসে সরকারের পক্ষ থেকে পুঁজিবাজারের জন্য বেশকিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত রয়েছে। শিগগিরই এসব সিদ্ধান্তের ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়বে। এছাড়া টানা পতনে অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ার অবমূল্যায়িত অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে- এটাই স্বাভাবিক। ইতোমধ্যে বাজারে লেনদেনের গতিও কিছুটা বেড়েছে।

এদিকে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বাজার অবজারভেশনে থাকা কিছু বড় বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারে কিছুটা সক্রিয় হয়েছেন। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে বাজারে তাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণ কিছুটা নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। ধারাবাহিকভাবে বিদেশিরা শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়াচ্ছে। এ কারণেই মূলত বাজার মন্দা অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত কয়েক মাস ধরে বাজারে মন্দা অবস্থা বিরাজের মূল কারণ, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল কোম্পানির আধিক্য। একের পর এক দুর্বল কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদন পাওয়ায় বাজারের ওপর থেকে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দুর্বল কোম্পানির আইপিও বন্ধ করতে হবে। তবে কোনো পরিস্থিতিতেই আইপিও বন্ধ করা যাবে না, ভালো ভালো কোম্পানি আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

তারা বলছেন, অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম এখন বেশ কম। এসব শেয়ার কেনার অবস্থায় রয়েছে। বিচক্ষণ বিনিয়োগকারীরা এটার সুযোগ নেবেন, এটাই স্বাভাবিক। কয়েকদিনের লেনদেনের চিত্র বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে যে, বাজারে টাকা আসছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি সক্রিয় হয়েছেন, তা বলা যাবে না। ডিসেম্বরের পর হয়তো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাড়বে। কারণ বছরের শেষ মাসে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি নেবে না, এটাই স্বাভাবিক।

বিশ্লেষকরা আশার বাণী শোনালেও হতাশা থেকে বেরোতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। ফরিদ হোসেন নামের এক বিনিয়োগকারী বলেন, পুঁজিবাজার ভালো করতে কত পদক্ষেপই তো নেয়া হলো। এরপরও বাজার ভালো হচ্ছে না। বাজার দু’দিন উঠলে আবার দু’দিন পড়ছে। লেনদেন কিছুটা বাড়লেও শেয়ারের দাম সেভাবে বাড়ছে না। অবশ্য গুটিকয়েক শেয়ার ব্যতিক্রম, এসব শেয়ার নিয়ে যে খেলা হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে। বাজারে এ অবস্থা চলতে থাকলে আমার মতো সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিয়মিত ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, তারল্য আর বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে চলতি বছরের বেশির ভাগ সময় পতনের মধ্য় দিয়ে যায় পুঁজিবাজার। সূচকের ধারাবাহিক পতনের সঙ্গে কমতে থাকে লেনদেন। ভয়াবহ তারল্য সংকটে পড়ে প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে আসে।

share-bazar-01

বাজারের দুরবস্থা কটিয়ে তুলতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বোনাস শেয়ার নিরুৎসাহিতের জন্য নগদ লভ্যাংশ থেকে অতিমাত্রায় বোনাস শেয়ার ইস্যু করা হলে তার ওপর করারোপের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই সঙ্গে করমুক্ত লভ্যাংশের সীমা ২৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়।

এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে শেয়ারের লক ইন পিরিয়ড বাড়িয়ে লেনদেন শুরুর দিন থেকে নির্ধারণ করা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে এ সীমা বাড়িয়ে নয় মাস করা হয়। প্লেসমেন্ট শেয়ারের ক্ষেত্রে করা হয় দু’বছর। পাশাপাশি পূর্বে ঘোষণা ছাড়া স্পন্সর শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রির প্রবণতা বন্ধ করা হয় এবং নতুন একটি ব্লক মডিউল দেয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দাবি মেনে ব্যাংকের তালিকা বহির্ভূত কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা অর্থ এক্সপোজারের হিসাব থেকে বাদ দেয়া হয়। এতে শুধু তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে ব্যাংকের বিনিয়োগ এক্সপোজারে থাকবে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। এছাড়া বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকলে ব্যাংক ৬ শতাংশ মুনাফায় ছয় মাস মেয়াদের রেপোর (পুনঃক্রয় চুক্তি) মাধ্যমে অর্থ পাবে- এমন সুযোগও দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

সরকারের ওপর-মহলের হস্তক্ষেপেই মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি থেকে পুঁজিবাজারের জন্য এসব ভালো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এসব সিদ্ধান্তের ফল তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া না গেলেও ধীরে ধীরে তা মিলতে শুরু করেছে। যে কারণে ২০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে যাওয়া ডিএসইর লেনদেন আবারও ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার ঘরে চলে এসেছে। শেষ সাত কার্যদিবসের (২৫ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর) মধ্যে তিনদিন ৫০০ এবং চারদিন ৪০০ কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়েছে ডিএসইতে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. বখতিয়ার হাসান এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও তারল্য সংকট। আস্থা ও তারল্য সংকট কাটানো গেলে বাজার স্বাভাবিকভাবেই ঘুরে দাঁড়াবে। বাজার বর্তমানে একটি টার্নিং পয়েন্টে আছে। এ পরিস্থিতিতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পারফরমেন্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বাজারে ভালো ভালো কোম্পানি আনার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে প্রণোদনা দিয়ে হলেও দেশি-বিদেশি ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি বেশকিছু ভালো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাজারে এসব সিদ্ধান্তের ইতিবাচক প্রভাব পড়া উচিত। গত কয়েকদিনের লেনদেন চিত্র বিশ্লেষণ করে ধারাণা করা যায়, বিনিয়োগ কিছুটা বেড়েছে। আমার ধারণা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো সেভাবে বিনিয়োগ করছে না। কারণ ডিসেম্বর মাসে তাদের হিসাব ক্লোজ করতে হবে। ফলে স্বাভাবিকভাবে এখন তারা ঝুঁকি নেবে না। তবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকের যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে, তাতে হয়তো আগামী বছর বিনিয়োগ বাড়তে পারে।

বখতিয়ার হাসান আরও বলেন, সম্প্রতি বাজারে যে অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে, তার পেছনে কিছু বিতর্কিত কোম্পানির তালিকাভুক্তি ভূমিকা রেখেছে। তাই সামনের দিনগুলোতে বিএসইসি ও ডিএসইকে কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে আরও সজাগ থাকতে হবে। বিতর্কিত ও তথ্য গোপন করা কোম্পানি যেন কোনোভাবে তালিকাভুক্ত হতে না পারে সেজন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ডিএসইর এক সদস্য বলেন, ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিতে চাইবে না। কারণ এখন কোনোভাবে লোকসান হলে তার প্রভিশন বেড়ে যাবে। এতে লভ্যাংশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে, জানুয়ারি থেকে পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাড়বে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের জন্য ফান্ড চাচ্ছে। বাজারে অবশ্যই এসবের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। কেউ যেন হতাশ না হয়। আমরা সবাই যদি নিজের জায়গা থেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে থেকে কাজ করি, তাহলে অবশ্যই বাজার ভালো হবে। আমার কাছে মনে হচ্ছে- কীভাবে বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ পজিটিভ। যে কারণে রেপোর (পুনঃক্রয় চুক্তি) মাধ্যমে টাকা নেয়ার সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তিনি বলেন, লেনদেনের গতি যখন বাড়ে তখন এটা অবশ্যই একটা মেসেজ দেয়, বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে বিনিয়োগটা কোনদিক দিয়ে বাড়ছে সেটা হলো গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে হবে না এবং বাজার ট্রেডারদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ততক্ষণ বাজার স্থিতিশীল হবে না।

তিনি আরও বলেন, আমাদের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেশ কম। ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) বিনিয়োগ সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার কেনার চেয়ে বিক্রির পরিমাণ বেশি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ার ধরে রাখতে পারছে না। আমাদের এ জায়গাগুলোতে দ্রুত অ্যাড্রেস করতে হবে। বাজার শক্তিশালী করতে হলে গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। বন্ড মার্কেট লেনদেনের আওতায় আনতে হবে। সেই সঙ্গে শক্তিশালী মিউচ্যুয়াল ফান্ড আনতে হবে।

ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি শাকিল রিজভী জাগো নিউজকে বলেন, পুঁজিবাজারে উত্থান-পতন হবে, এটাই স্বাভাবিক। আমার মতে, বর্তমান বাজার কেনার জন্য বেশ ভালো। অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম রিজনেবল প্রাইসে রয়েছে। তবে কোম্পানির পারফরমেন্স বাজারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কোম্পানির প্রথম প্রান্তিক বা বার্ষিক পারফরমেন্স বিবেচনা করলে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার কেনার উপযোগী। আমার ধারণা, ডিসেম্বর মাসে হয়তো বাজার কিছুটা চাপের মধ্যে থাকবে। তবে জানুয়ারি থেকে ভালো হবে।

বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির চাপ

সদ্য সমাপ্ত নভেম্বর মাসজুড়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার থেকে ২২২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার শেয়ার কিনেছেন। বিপরীতে বিক্রি করেছেন ৩২১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিদেশিদের ক্রয় থেকে বিক্রি বেশি হয়েছে ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মাধ্যমে টানা নয় মাস বিদেশিরা শেয়ার ক্রয় থেকে বিক্রি বেশি করলো। দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এর আগে কখনও বিদেশিরা এভাবে টানা শেয়ার বিক্রির চাপ অব্যাহত রাখেননি।

বিদেশিরা টানা শেয়ার বিক্রির চাপ অব্যাহত রাখলেও তাদের পোর্টফোলিও নিয়ে কাজ করে এমন একটি ব্রোকারেজ হাউজের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে জানান, কয়েকদিন ধরে বিদেশিরা শেয়ার ক্রয়ে মনোযোগী হয়েছে। এ ধারা চলতে থাকলে ডিসেম্বর শেষে তাদের শেয়ার বিক্রির চেয়ে কেনার পরিমাণ বেশি হবে।

এমএএস/এমএআর/পিআর