‘স্বার্থের টানাটানি’তে অন্ধকারে ডিএসইর সার্ভিস রুল

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:২৪ পিএম, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) উদ্যোগ নেয়ার পর প্রায় এক বছর কেটে গেলেও আলোর মুখ দেখেনি দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্ভিস রুল। প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনৈতিক সুবিধা নেয়ার পাঁয়তারার কারণে সার্ভিস রুল আলোর মুখ দেখছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই ডিএসইর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পদোন্নতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ রয়েছে । এ বিষয়ে ২০১৭ সালে হিসাব বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক পদে থেকে প্রতিবাদ করে চাকরি ছাড়েন ওবায়দুল হাসান।

চাকরি ছাড়ার আগে তিনি বিএসইসিতে লিখিত অভিযোগও করেন। ওই অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পর্ষদ ‘ডিএসই বোর্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেজুলেশন ২০১৩’ এবং ডিএসই সার্ভিস রুলস’র ৯.১.১ ও ৯.১.২ ধারা লঙ্ঘন করেছে।

ওবায়দুল হাসান অভিযোগ করেন, ডিএসই সার্ভিস রুলস’র ৯.১.১ ও ৯.১.২ ধারা অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হবে বার্ষিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে। যা বিভাগীয় প্রধানের সুপারিশের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনুমোদন করবেন। কিন্তু সম্প্রতি ব্যবস্থাপনা পর্ষদের কিছু সদস্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ‘ভোট’ নিতে বাধ্য করেন। ব্যবস্থাপনা পর্ষদের কিছু সদস্যের এমন অবৈধ প্ররোচনায় প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে ‘ভোট’র পদ্ধতি সমর্থনযোগ্য ও প্রতিপালনযোগ্য নয়।

তিনি বিএসইসিকে জানান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ‘বোর্ড অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেজুলেশন ২০১৩’ এর ১০(৫) ধারা অনুযায়ী, স্বাধীন, সঠিক, স্বচ্ছ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালনা করা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব। সুতরাং এই ধারা অনুযায়ী কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে ‘ভোট’ সঠিক ও স্বচ্ছ পদ্ধতি নয়। তালিকাভূক্ত কোম্পানির নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এমন অনৈতিক কার্যকালাপের উদাহরণ ডিমিউচ্যুলাইজেশন পরবর্তী ডিএসইর সুনাম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

এরপর ডিএসইর পদোন্নতিসহ আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠে । এর পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটির সার্ভিস রুল করে দেয়ার উদ্যোগ নেয় বিএসইসি। ইতোমধ্যে ডিএসই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সার্ভিস রুল প্রণয়ন করে তা ডিএসই কর্তৃপক্ষের কাছে বাস্তবায়নের জন্য হস্তান্তর করেছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু প্রায় ছয় মাস চলে গেলেও ডিএসই কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাতে তা বাস্তবায়ন করেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত নভেম্বর মাসে বিএসইসি কমিশনার স্বপন কুমার বালা ডিএসইর সিএফও আব্দুল মতিন পাটওয়ারীসহ ডিএসই ম্যানেজমেন্টকে জরুরি তলব করে সার্ভিস রুলের বিষয়ে তাগাদা দেন। এ সময় ডিএসই ম্যানেজমেন্ট সাত দিনের সময় নেয়।

কিন্তু সাত দিন পার হয়ে যাওয়ার পরও ডিএসই কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় বিএসইসি কমিশনার স্বপন কুমার বালা দ্বিতীয় দফায় সিএফও আব্দুল মতিন পাটওয়ারীকে তাগাদা দেন। তখন তিনি আবারও এক মাস সময় বাড়িয়ে নেন।

সূত্রটি জানিয়েছে, সার্ভিস রুলের একটি ধারায় বলা হয়েছে- সি লেভেল (সিএফও, সিআরও, সিটিও) কর্মকর্তার চাকরি স্থায়ীকরণ করা যাবে না এবং যদি সি লেভেল কর্মকর্তার চাকরি স্থায়ীকরণ করা হয় সেক্ষেত্রে তাদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা স্থায়ীভিত্তিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো হবে। অর্থাৎ তারা সার্ভিস রুলে উল্লেখ করা পে-স্কেলের আওতায় চলে আসবেন। এই আইনটি নিয়ে সি লেভেল কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এ কারণেই মূলত ডিএসইর সার্ভিস রুল আলোর মুখ দেখছে না।

অভিযোগ উঠেছে, ডিএসইর শীর্ষ কর্মকর্তারা বিভিন্ন উর্ধ্বতন জায়গায় লবিং করছেন যাতে তাদের সুযোগ-সুবিধা কোনোভাবেই না কমে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ডিএসই ম্যানেজমেন্টের জিএম-ডিজিএমরাও জড়িত রয়েছেন। কারণ সার্ভিস রুলটি বাস্তবায়ন হলে কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়বে। গাড়ি-বাড়ির লোন’র পাশাপাশি বেতন বৃদ্ধিসহ অন্যান্য সুবিধা পাবে। যা এতদিন শুধু ডিজিএম ও তার উপরের পদের কর্মকর্তারা ভোগ করছেন।

ডিএসই’র এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, সিএফও আব্দুল মতিন পাটওয়ারীর চালু করা কি পারফরমেন্স ইনডিকেটর বা কেপিআইভিত্তিক মূল্যায়নের ফলে এক ধরনের অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে কর্মকর্তাদের সমস্যা দূর হওয়ার বদলে দিন যত যাচ্ছে বৈষম্য তত বাড়ছে। প্রতিবছর মূল্যায়নের সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরও তা দিতে বিলম্ব করা, জোরপূর্বক জুনিয়রদের পুওর মার্কিং (কম নম্বর দেয়া) করে ডিপার্টমেন্টাল হেডদের আউটস্ট্যান্ডিং মার্কিং (বেশি নম্বর) দেয়া হয়।

তিনি বলেন, সার্ভিস রুলে না থাকার পরও এমটিও পদে উচ্চ বেতনে নতুন নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে । এর মধ্যেই দ্বিতীয় দফায় নতুন ছয় জন এক্সিকিউটিভ পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যাদের এমটিও পদে ভাইভাতেই অযোগ্য বলে বাতিল করা হয়েছিল।

ডিএসইর আরেক কর্মকর্তা বলেন, একদিকে সিএফও চেষ্টা করছেন কোনোভাবেই যেন তার বেতন না কমে, অন্যদিকে জিএমরা নিজেদের পদে থেকেই সি লেভেলের সুবিধা ভোগ করার চেষ্টা করছেন। বিএসইসির একটি পক্ষ ও ডিএসইর বর্তমান বোর্ডের একটি অংশ তাদের পক্ষে রয়েছেন। এ কারণেই সার্ভিস রুল বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, সার্ভিস রুল কার্যকর করা না হলেও নতুন করে চার জন জিএম পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনের ইন্টারভিউ নেয়া হয়েছে। ডিএসইর কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করার জন্যই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে বিএসইসির কমিশনার স্বপন কুমার বালা জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডিএসইর সার্ভিস রুল এখন কী অবস্থায় আছে সেটি আমি বলতে পরবো না। তবে যতটুকু জানি সার্ভিস রুল এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা বিষয়টি দেখবো।’

ডিএসইর সিএফও ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মতিন পাটওয়ারীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে ব্যস্ততা দেখিয়ে তিনি কথা বলেননি। আর চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল হাশেম’র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।’

এমএএস/এইচএ/এমকেএইচ