শেয়ারবাজারে সুদিন

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:০৬ এএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

>> বিশেষ তহবিলের টাকায় কেনা যাবে ১৮৭ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার
>> বিনিয়োগের বিকল্প না থাকায় শেয়ারবাজারে আসছেন সঞ্চয়কারীরা
>> সূচক সাড়ে ৬ হাজার পয়েন্টে যাওয়ার সুযোগ আছে- মির্জ্জা আজিজুল
>> বিনিয়োগকারীদের স্রোতে গা ভাসানো যাবে না- বিএমবিএ সভাপতি

সরকারের ওপর মহলের হস্তক্ষেপে দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে সুদিন ফিরতে শুরু করেছে দেশের শেয়ারবাজারে। নিষ্ক্রিয় থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বাজারে সক্রিয় হয়েছেন। ফলে প্রতিদিনই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণ। বাজারের এই অবস্থাকে স্বাভাবিক বলছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। ফলে বাজারে টানা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্য সূচক সাড়ে ৬ হাজার পয়েন্টে যাওয়া স্বাভাবিক।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকগুলো ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারবে। এই তহবিলের যে টাকা বিনিয়োগ হবে তা ব্যাংকের নরমাল বিনিয়োগের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

‘কাজেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে এসেছে। এখন তারা শেয়ার কিনছেন। সে কারণে সূচক বাড়ছে। এটা কতদিন স্থায়ী হয় সেটাই দেখার বিষয়। আমি মনে করি, ছয় হাজার বা সাড়ে ছয় হাজার পয়েন্ট পর্যন্ত সূচকের যাওয়ার সুযোগ আছে। সুতরাং সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তবে বিনিয়োগকারীদের দেখে-শুনে বিনিয়োগ করতে হবে। জাঙ্ক (স্বল্প মূলধনী কোম্পানির শেয়ার) শেয়ারে বিনিয়োগ করা ঠিক হবে না।’

শেয়ারবাজারের এই বিশ্লেষক বলেন, সঞ্চয়কারীদের এখন বিনিয়োগের খুব একটা জায়গা নেই। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমিয়ে দেয়া হয়েছে। ব্যাংকে আমানত রাখলে ৬ শতাংশ মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং তাদের বিনিয়োগের বিকল্প জায়গা না থাকায় শেয়ারবাজারে আসছে।

বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে সবসময় ঝুঁকি থাকে। সেভিংস ইন্সট্রুমেন্টে বা ব্যাংকে আমানত রাখলে ঝুঁকি নেই। কিন্তু ওইসব জায়গায় (সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানত) এখন মুনাফা কমে গেছে। যে কারণে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে ফিরে আসছেন।

শেয়ারবাজারের অব্যাহত পতনের মধ্যে গত ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কিছু শর্তসাপেক্ষ ব্যাংকগুলোকে ২০০ কোটি টাকা করে বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয়া হয়। নিজস্ব উৎস অথবা ট্রেজারি বিল বন্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো এ তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ শতাংশ সুদে এ তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে ব্যাংকগুলো, যা পরিশোধের সময় হচ্ছে পাঁচ বছর। আর ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে এই তহবিল থেকে ঋণ দিতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই সুবিধা দেয়ার পর সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া পাঁচ কার্যদিবসেই মূল্য সূচক বেড়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিদিনই আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন বেড়েছে। এতে ডিএসইর লেনদেন প্রায় হাজার কোটি টাকার কাছে চলে এসেছে। আর পাঁচ কার্যদিবসের টানা উত্থানে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ৩৮৩ পয়েন্ট বেড়ে ৪ হাজার ৭৬৮ পয়েন্টে উঠে এসেছে। এমন উত্থানের কারণে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ২১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

বাজারের এ চিত্র সম্পর্কে ডিএসই’র পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন জাগো নিউজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকগুলোকে ২০০ কোটি টাকা করে বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এটা বাজারের জন্য বড় ধরনের সুখবর। এতে বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। যার প্রতিফলন এখন বাজারে দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন পক্ষের হস্তক্ষেপে শেয়ারবাজারে দুর্বল কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বন্ধে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে বাজারে দুর্বল কোম্পানির আইপিও আসার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। যা শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারের বড় উত্থানকে স্বাভাবিকভাবে দেখছেন কি— এমন প্রশ্ন করা হলে মিনহাজ মান্নান বলেন, টানা পতনে অনেক ভালো শেয়ার ন্যায্যমূলের নিচে নেমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বাজারের উত্থান হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা শেয়ারবাজারে যেমন অস্বাভাবিক পতন চাই না, তেমনি অস্বাভাবিক উত্থানও কাম্য নয়। আমি মনে করি, শেয়ারবাজার স্বাভাবিক উত্থান-পতনের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি মো. ছায়েদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসিকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। কারণ তারা যুগোপযোগী একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ব্যাংকগুলোকে ২০০ কোটি টাকার যে বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয়া হয়েছে, তাতে বাজারে পর্যায়ক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাজারে যে তারল্য সংকট ছিল তা কেটে যাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, স্রোতে গা ভাসানো যাবে না। তাদের জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করতে হবে। কারও দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে তথ্য ভালো করে যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগ করতে হবে। সেক্ষেত্রে পুরো বাজার পর্যালোচনা না করে তার বিনিয়োগের জায়গাটা কেমন সেটি পর্যালোচনা করতে হবে।

বিশেষ তহবিলের টাকায় কেনা যাবে ১৮৭ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার

নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব কোম্পানি শেষ তিন বছরে কমপক্ষে ১০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছে বিশেষ তহবিলের টাকা দিয়ে শুধু ওই কোম্পানির শেয়ার কেনা যাবে। তিন বছরের মধ্যে এক বছরও যদি কোনো কোম্পানি ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেয়, তাহলে ওই কোম্পানির শেয়ার কেনা যাবে না। এছাড়া বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার ৭০ শতাংশের বেশি ফ্রি ফ্লোট হবে না। অর্থাৎ কোনো কোম্পানির ফ্রি ফ্লোট (লেনদেনযোগ্য) শেয়ারের সংখ্যা মোট শেয়ারের ৭০ শতাংশের বেশি হলে বিশেষ তহবিলের অর্থ দিয়ে ওই শেয়ার কেনা যাবে না।

ফলে বিশেষ তহবিলের টাকা দিয়ে তালিকাভুক্ত ১৮৭টি কোম্পানির শেয়ার কেনার সুযোগ থাকছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাতের ২৭টি, আর্থিক খাতের ১৩টি, প্রকৌশলের ২৩টি, খাদ্যের ৭টি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ১৪টি, বস্ত্রের ২৩টি, ওষুধের ১৯টি, সেবা ও আবাসনের ৪টি, সিমেন্টের ৬টি, আইটির ৩টি, চামড়ার ৪টি, সিরামিকের ৩টি, বিমার ৩৪টি, বিবিধ ৪টি এবং টেলিযোগাযোগ, ভ্রমণ ও পাটের একটি করে প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

হাসি ফিরছে বিনিয়োগকারীদের মুখে

কিছুদিন আগে পুঁজি হারিয়ে যে বিনিয়োগকারীরা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিলেন, শেয়ারবাজারের টানা ঊর্ধ্বমুখিতায় এখন তাদের মুখে হাসি ফুটতে শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীরা আবারও হারানো পুঁজি ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। ব্রোকারেজ হাউস-বিমুখ হয় পড়া অনেক বিনিয়োগকারী আবার মতিঝিলের হাউসগুলোতে যাওয়া শুরু করেছেন।

বাংলাদেশ বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক জাগো নিউজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে ২০০ কোটি টাকা করে বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এটা শেয়ারবাজারের জন্য একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। এতে বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে এসেছে। বাজার সামনে আরও গতিশীল হবে। আমরা আশা করি, শিগগিরই শেয়ারবাজারে সুদিন ফিরে আসবে। আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল তা পূরণ হবে।

সক্রিয় হচ্ছে বড় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা

বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সুবিধা দেয়ার পর গত কয়েকদিন বেশকিছু বড় বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারমুখী হয়েছেন। বড় পোর্টফোলিও বহন করেন এমন বেশকিছু বিনিয়োগকারী যারা দীর্ঘদিন ব্রোকারেজ হাউজে আসেননি, তাদের কেউ কেউ সম্প্রতি নিজের বিও হিসাব থাকা ব্রোকারেজ হাউসে যাতায়াত করছেন। দেশীয় বড় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার কেনায় মনোযোগ দিয়েছেন।

বিদেশিদের পোর্টফোলিও আছে এমন একটি ব্রোকারেজ হাউজের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, ২০১৯ সালজুড়েই বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির এক ধরনের চাপ ছিল। যে কারণে বিএসইসি থেকে আমাদের ডেকে শেয়ার বিক্রি কমানোর জন্য চাপ দেয়া হচ্ছিল। তবে আশার কথা হলো, সম্প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বিভিন্ন কোম্পানির বিষয়ে তারা খোঁজখবর নিচ্ছেন। আমরা আশা করছি, বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ এখন বাড়বে।

আতঙ্ক কাটছে ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তাদের

অব্যাহত দরপতন আর লেনদেনে খরার কারণে চাকরি হারানোর শঙ্কা জেঁকে বসেছিল বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তাদের মনে। তবে লেনদনের গতি বাড়ায় এবং বিনিয়োগকারীরা ব্রোকারেজ হাউসমুখী হওয়ায় তাদের চাকরি হারানোর আতঙ্ক কাটতে শুরু করেছে।

একটি ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তা তোফাজ্জেল জাগো নিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারের সঙ্গে জড়িত। ২০১০ সালের বাজারের উত্থান-পতন সবই দেখেছি। ২০১০ সালের ধসের পর বেশ কয়েকবার বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিয়েছে, কিন্তু তা স্থায়ী হয়নি। তবে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকার যে শেয়ারবাজার ভালো করতে চায়— এটা এখন সবার কাছে পরিষ্কার।

তিনি বলেন, লেনদেন খরা আর টানা পতনের কারণে কিছুদিন আগেও অনেকের মধ্যে চাকরি হারানোর শঙ্কা ছিল। সেই শঙ্কা এখন কেটে যাচ্ছে। ছোট বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বড় বিনিয়োগকারীরা হাউসে যাতায়াত শুরু করেছেন। লেনদেনের গতি বেড়েছে। এই পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চললে শিগগিরই বাজার থেকে ২০১০ সালের হাওয়া চলে যাবে বলে আমরা আশা করছি।

এমএএস/এইচএ/এমএআর/জেআইএম