পুঁজিবাজার স্থায়ী স্থিতিশীল করতে বিনিয়োগকারীদের ১৬ দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:১১ পিএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০

পুঁজিবাজারের স্থায়ী স্থিতিশীল করতে জরুরি ১৬ দফা দাবি জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ‘বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের’ নামে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) এ সংক্রান্ত একটি চিঠি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের কাছে দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুর রাজ্জাক জাগো নিউজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘পুঁজিবাজারের ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীর স্বার্থে আমরা এ দাবি জানিয়েছি।’

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি এ কে এম মিজান-উর রশিদ চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুর রাজ্জাক স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘২০১০ সালে শুরু হওয়া মহাধস ২০২০ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ছিল। এই ধসের কারণে বহু বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে এবং অনেকে আত্মহত্যা করেছে।’

‘এ কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে আপনার যোগ্য নেতৃত্বের কারণে পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতা ও পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের হারানো পুঁজি ফিরে পেতে শুরু করেছে। পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছে’ বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব তথ্য উল্লেখ করে পুঁজিবাজারে স্থায়ী স্থিতিশীলতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিনিয়োগকরীদের পক্ষ থেকে ১৬ দাবি তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে। এর মধ্যে রয়েছে-

>> অতিদ্রুত ‘বাইব্যাক আইন’ পাস করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদকে ইস্যু মূল্যে অথবা এনএভি’র ৫ শতাংশের কম, এই ২টির মধ্যে যেটি বেশি হবে সেই মূল্যে শেয়ার বাইব্যাক করতে হবে।

>> ‘ফ্লোর প্রাইজ’ পদ্ধতি বহাল রাখতে হবে এবং ১০ টাকার নিচে বা ফেস ভ্যালুর নিচের প্রত্যেকটি শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস ভ্যালু ন্যূনতম ১০ টাকায় নির্ধারণ করতে হবে।

>> হাইকোর্ট থেকে নির্দেশিত কোম্পানি আইনের ২সিসি ধারা মোতাবেক শেয়ারবাজারের লিস্টেড প্রতিটি কোম্পানির পরিচালককে সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে এবং এককভাবে ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। যদি কোনো কোম্পানি ও পরিচালকরা উক্ত পরিমাণ শেয়ার ধারণ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

>> স্বল্পমূলধনী ও দুর্বল কোম্পানিকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদন দেয়া যাবে না। যে সমস্ত কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে তাদের পরিশোধিত মূলধন কম পক্ষে ২০০ কোটি টাকা হতে হবে।

>> রাইট শেয়ার ইস্যু বন্ধ রাখতে হবে। তবে যে সকল কোম্পানি পরপর কমপক্ষে ৭ বছর ১০ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে বা দেবে তাদের ক্ষেত্রে রাইট শেয়ার ইস্যুর বিষয়টি বিবেচনা করা যাবে।

>> প্লেসমেন্ট শেয়ারের টাকা কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন হিসাবে দেখানো যাবে না।

>> বাজারের তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য বিদ্যমান মার্জিন লোন প্রদানের হার ১:০.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ন্যূনতম ১:১.৫ করতে হবে। অর্থাৎ এক টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে এক টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত লোন সুবিধা দিতে হবে। মার্জিন লোনের সুদ বার্ষিক শতকরা ১০ টাকা করতে হবে।

>> সরকার ঘোষিত ব্যাংকগুলোকে শেয়ার বাজারে ২০০ কোটি টাকা করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধি করে ন্যূনতম ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত উন্নীত করতে হবে।

>> ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, ইস্যু ম্যানেজারদেরকে শুধুমাত্র শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের শর্তে প্রচলিত এফডিআরের ন্যায় স্বল্প সুদে এফডিআর, এসটিআর, এলটিআর অথবা নিজস্ব মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অনুমতি দিতে হবে।

>> আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, শেয়ারবাজার এবং ব্যাংকের মানদণ্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশীয় সরকারি-বেসরকারি খাতকে আরও অধিকতর শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য বাস্তবতার আলোকে সময় উপযোগী ব্যাংক ঋণের বিকল্প হিসেবে একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট সৃষ্টি করতে হবে। যাতে ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে গিয়ে খেলাপি না হয়ে যায়, আবার ব্যাংকের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম সময়ে বিভিন্ন কোম্পানি ও উদ্যোক্তারা যাতে বন্ড মার্কেট থেকে টাকা তুলে দেশীয় উন্নতি, কর্মসংস্থান ও জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

>> যে সকল অডিটর, ইস্যু ম্যানেজার, আন্ডার রাইটার, অ্যাসেট ভ্যালুয়েশন কোম্পানি, স্পন্সর মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদেরকে বিভ্রান্ত করে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ লুটপাট করেছে তাদেরকে ৩ বছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে এবং আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

>> ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট অতি দ্রুত চালু করতে হবে। ওটিসি মার্কেট বন্ধ করে সেখানকার কোম্পানিগুলোকে প্রয়োজনে কিছু ছাড় দিয়ে হলেও মূল বাজারে ফিরিয়ে আনতে হবে বা তাদের স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি বিক্রি করে শেয়ারের সংখ্যা অনুযায়ী বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হবে। পাশাপাশি জেড ক্যাটাগরি পদ্ধতি বন্ধ করতে হবে।

>> বাজারে বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৩৭টি মিউচুয়াল ফান্ডের ভূমিকা ক্ষতিয়ে দেখতে হবে। কারণ প্রচার আছে যে, মিউচুয়াল ফান্ডগুলো বাজার থেকে টাকা উত্তোলন করে সেই টাকা শেয়ারবাজারে যথাযথ সময়ে, যথাযথভাবে বিনিয়োগ না করে তারা নিজেদের সুবিধামতো বিভিন্ন বেনামি ব্যবসা এমনকি ব্যাংকেও এফডিআর করে বলে প্রচুর অভিযোগ আছে। তাই তাদের ফান্ডগুলোকে কঠোর তদারকির আওতায় এনে সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে সমুদয় টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে বাধ্য করতে হবে।

>> সিডিবিএল, ডিএসই, সিএসইকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে হবে। শতভাগ ডিজিটাল, অনলাইন ও আধুনিক সেবার আওতায় তাদেরকে দ্রুত নিয়ে আসতে হবে। যাতে করে অদূর ভবিষ্যতে যেকোনো দুর্যোগ/দুর্ঘটনা/প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের পুঁজিবাজার শতভাগ আস্থা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে চলমান থাকতে পারে। কোনোভাবেই বৈশ্বিক পুঁজিবাজার থেকে আমাদের পুঁজিবাজারকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।

>> পুঁজিবাজারের প্রধানতম প্রাণশক্তি সেকেন্ডারি মার্কেটকে আরও গতিশীল, প্রাণবন্ত, লাভজনক, নিরাপদ করার জন্য শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। যাতে করে দুর্নীতিবাজ ও লুটপাটকারীরা ভবিষ্যতে পুঁজিবাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে।

>> আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন ও বাজারের পরিধি ব্যাপকহারে বৃদ্ধির জন্য শেয়ারবাজারে আরও অধিকহারে বন্ড ইস্যু, মিউচুয়াল ফান্ড ইস্যু, পেনশন ফান্ডে বিনিয়োগ উৎসাহিতকরণ, প্রফেশনাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের অনুমতি প্রদান করতে হবে।

এমএএস/এফআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]