বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সিএমএসএমই খাতের উন্নয়ন ঘটাতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২৭ পিএম, ১৮ জানুয়ারি ২০২১

বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমেই সিএমএসএমই খাতের সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন ঘটাতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান।

সোমবার (১৮ জানুয়ারি) ভার্চুয়াল মাধ্যমে ‘বাংলাদেশে সিএমএসএমইস জার্নি, চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ফিউচার ডিরেকশন’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এ মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনোভেশন, ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ (আইসিই) সেন্টার এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে গৃহীত ‘রিভাইভ’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

রিভাইভ প্রকল্পের অধীনে আটটি বিভাগীয় ওয়েবিনারের শেষ দিনে আইসিই সেন্টারের ভাইস-চেয়ারম্যান ড. খন্দকার বজলুল হকের সভাপতিত্বে এবং নির্বাহী পরিচালক মো. রাশেদুর রহমানের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান। মূল বক্তা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনরারি অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম, চ্যানেল আইয়ের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও সংবাদ প্রধান এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি শাইখ সিরাজ।

আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি মো. খুরশিদ আলম, খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. কাজী আমিনুল হক এবং খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী অফিসার পলাশ কান্তি বালা।

ড. মশিউর রহমান বলেন, বর্তমানে শিল্পের যে খাতগুলো প্রসারিত হচ্ছে সেগুলোর সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে ছোট শিল্পের সংযোগ ঘটাতে হবে। এই লিংকেজ স্থাপনটা অতীব জরুরি। নির্দিষ্টভাবে খুলনা অঞ্চলের সমস্যার সঙ্গে পোর্টের সংখ্যার একটা ব্যাপার আছে কেননা বর্তমান বাস্তবতায় দেশের অর্থনীতির জন্য একটা পোর্টের ওপর বেশি চাপ পড়ছে। অদূর ভবিষ্যতে এই সমস্যা কেটে যাবে বলে তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করেন।

খুলনা অঞ্চলের সম্ভাবনায় মাছ চাষের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোয়ালিটি কন্ট্রোল ইস্যুতে এখানে সমস্যার তৈরি হয়েছে। মান পরীক্ষায় সার্টিফাইড হওয়ার জন্য এই অঞ্চলের পণ্য ঢাকায় আনতে হয় তারপর আবার ফ্যাক্টরিতে নেয়া হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলেও সার্টিফাইড হওয়ার একই সমস্যা আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

খুলনা অঞ্চলে সম্ভাবনাময় পাট শিল্পের প্রতি নজর দেয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন। সুন্দরবনের মধু শিল্পের উল্লেখপূর্বক তিনি বলেন, আমাদের এখনো মধু প্রসেসিংয়ের জন্য কোনো শিল্পখাতের উন্নয়ন হয়নি, যা আছে তা এখনো কুটির পর্যায়ে রয়েছে। ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের জন্য সঠিক প্রশাসনিক কাঠামো এখনো সুগঠিত হয়নি বলে তিনি মত দেন।

উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীকরণের মানসিকতা একটি সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের মেগাসিটি থাকলেও এখন বিকেন্দ্রীকরণের দিকে নজর দিতে হবে। ব্যবসা করার জন্য উদ্যোক্তাদের আইনগত পদক্ষেপ নিতে যখন ঢাকায় আসতে হয় তখনই সমস্যার তৈরি হয়। এইসব সমস্যা সমাধানের জন্য ঢাকা কেন্দ্র থেকে বিচ্ছুরিত হয়ে সব অঞ্চলে পৌঁছাতে হবে। সুযোগ এবং সম্ভাবনা পরিপূর্ণরূপে ব্যবহার করতে উদ্যোক্তাদের জন্য কোনো সেন্টার তৈরি করতে হলে ঢাকার পাশাপাশি পিছিয়ে পরা ওই অঞ্চলগুলোতে পৌঁছাতে হবে অন্যথায় সংবিধানের সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন অর্জন সম্ভব হবে না।
অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনীতির অন্যতম একটি হাব হিসেবে খুলনা বিভাগ তার সম্ভাবনার দ্বারকে প্রসারিত করে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের জাতীয় পর্যায়ের একটি সমৃদ্ধ ডেটাবেজের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই খাতের উন্নয়নের মাধ্যমেই আর্থ-সামাজিক সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।

উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের উদ্যোক্তা উন্নয়নের পরিবেশের ভিন্নতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই খাতের জন্য আমাদের সেক্টরভিত্তিক নীতি প্রণয়নের দিকে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি এসএমই আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

মো. রাশেদুর রহমান তার বক্তব্যে রিভাইভ প্রকল্পের কার্যাবলী তুলে ধরে বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের সিএমএসএমই খাতের বিভাগভিত্তিক যে সমস্যাগুলো উঠে এসেছে সেগুলোকে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বিবেচনায় নিলে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পখাত দেশের অর্থনীতির চাকার গতিশীলতা বৃদ্ধিতে আরও কয়েকধাপ এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।

শাইখ সিরাজ বলেন, এসএমই উদ্যোক্তার সঙ্গাটা আমাদের পরিষ্কার করা উচিত। শহরের একজন তরুণের পাশাপাশি গ্রাম কিংবা মফস্বলের তরুণদের কিভাবে এই খাতে বিবেচনা করা হচ্ছে সেটি স্পষ্ট নয়। যে কৃষক মধু সংগ্রহ করে তিনি উদ্যোক্তা না হয়ে সেই মধু প্যাকেজিং করে বাজারজাতকারী যেন শুধু উদ্যোক্তার সঙ্গায় না আসে সেই বিষয়ে তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

খুলনা বিভাগের পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সুন্দরবনের মধু, সম্ভাবনাময় গোলপাতার গুড়, চিংড়ি, কেচো সারসহ অর্গানিক সার, কোকোকিটের বিশাল বাজার নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে তাহলেই বাঙালি ঐতিহ্যের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে প্রসারিত করা সম্ভব হবে। অর্থনীতিতে ভ্যালু অ্যাড করা পণ্যের উৎপাদকদের দিকে বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে অ্যাকাডেমিয়ার একটি শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন যেটির একটি নমুনা আইসিই সেন্টারের রিভাইভ প্রকল্প উদ্যোগের মধ্যে আরও স্পষ্ট হয়েছে। করোনা সংকট সিএমএসএমই খাতকে নিয়ে ভাবার একটি সুযোগ আমাদের তৈরি করে দিয়েছে। এই ভাবনার গভীরতার ধারাবাহিকতা রক্ষার কাজটা এখন আমাদের চালিয়ে যেতে হবে।

মো. খুরশিদ আলম বলেন, সংকট মাঝেমাঝে সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। ৩৫ শতাংশ মানুষ এই খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর উন্নয়নে আমাদের ভবিষ্যৎ বিজনেস লিডার যা লাগবে যার একটা নমুনা এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেখা গিয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে এম্প্যাথির জায়গাটাকে এক্সপ্লোর করতে সক্ষম হয়েছে।

জাপানের টয়োটা কোম্পানি ছোট ছোট ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত উল্লেখ করে বলেন, আমাদের দেশে বড় এবং ছোট ব্যবসার লিংকেজে এখনো একটা বিস্তর ফারাক রয়েছে যেই চ্যালেঞ্জটি অ্যাড্রেস করা এখন সময়ের দাবি বলে তিনি মত দেন।

সর্বশেষে প্রোগ্রামের সভাপতি ড. খন্দকার বজলুল হক বলেন, আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার জন্য প্রতিটি অঞ্চলের সম্ভাবনার সুযোগকে এখনই গ্রহণ করতে হবে। অঞ্চলভিত্তিক সুযোগ তৈরি হওয়ার পরে সেই সুযোগ নেয়ার মানসিকতা থেকে আমাদের সবাইকে বের হতে হবে।

এই প্রোগ্রামে অংশ নিয়ে খুলনা অঞ্চলের সিএমএসএমই খাতের উন্নয়নে বক্তাদের মূল্যবান মতামত প্রদানের জন্য ড. খন্দকার বজলুল হক সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। খুলনা বিভাগীয় ওয়েবিনারের মাধ্যমে রিভাইভ প্রকল্পের অধীনে আয়োজিত আটটি বিভাগীয় ওয়েবিনারের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

ইএআর/এমআরআর/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]