পণ্যের মজুত পর্যাপ্ত, বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:১০ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২১

বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই। এছাড়া মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে শিগগিরই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯ সদস্য বিশিষ্ট ‘বাজার মূল্য পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ক স্থায়ী কমিটি কাজ শুরু করবে।

রোববার (১১ এপ্রিল) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘পবিত্র রমজান মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এসব কথা বলেন সংশ্লিষ্টরা।

এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করবেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রোজা আসলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয় এবং অনেক সময় পণ্যের সাপ্লাই ও চাহিদার সমন্বয় থাকে না।’

তিনি বলেন, ‘পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট সচেতনভাবে কাজ করছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন সুযোগ নিতে না পারে সে ব্যাপারে বিএসটিআইসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যবসায়ী সমাজকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার আমন্ত্রণ এবং ব্যবসায়ীদের সজাগ থাকার আহ্বান জানান।

মন্ত্রী বলেন, ‘করোনা মহামারির কারণে দেশবাসীকে বাঁচাতে সরকার আগামী ১ সপ্তাহের জন্য লকডাউনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং সকলকে তা মানতে হবে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘এটি একটি ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে জনগণকে আসন্ন রমজান মাসে সুফল দেয়া যাবে।’

তিনি জানান, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে ৯ সদস্য বিশিষ্ট ‘বাজার মূল্য পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ক স্থায়ী কমিটি গঠন করেছে। যারা শিগগিরই তাদের কাজ শুরু করবে।

লকডাউন সময়ে সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান মেয়র। এ ব্যাপারে মাঠ পর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে বলে জানান তিনি।

মেয়র বলেন, ‘ব্যবসায়ী সমাজের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং সকলকে সঙ্গে নিয়ে রমজান মাসে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা মহানগরী হাসপাতালের মাধ্যমে নগরের জনগণকে সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হচ্ছে এবং সামনের দিনগুলোতে এ সেবা আরও বৃদ্ধি করা হবে।’

ওয়েবিনারের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবের পাশাপাশি অতিরিক্ত মজুতকরণের মাধ্যমে বাজারে পণ্যদ্রব্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অপর্যাপ্ত ও সমন্বয়হীন বাজার মনিটরিং, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এবং অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় প্রভৃতি কারণে প্রতিবছর পবিত্র রমজান মাসের পূর্বে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি জনসাধারণের মাঝে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।’

তিনি উল্লেখ করেন, ‘মহামারির ফলে গত বছরের শেষ ৯ মাসে আয় কমে যাওয়া ও কর্মচ্যুতির ফলে অধিকাংশ মানুষ ঋণ করে এবং সঞ্চয় ভেঙ্গে জীবন নির্বাহ করেছেন। এ পরিস্থিতিতে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে দরিদ্ররা নিদারুণ কষ্টে পড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।’

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আসন্ন রমজানে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার লক্ষ্যে রমজানে আমদানি নির্ভর ভোগ্যপণ্য বন্দর থেকে কাস্টমস হাউজ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় দ্রুত খালাসকরণ, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও যানজট নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, দেশের সকল বাজারে দক্ষ ও পর্যাপ্ত বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিয়মিত ন্যায্যমূল্য তালিকা হালনাগাদ করা এবং মূল্য তালিকা কার্যকর করা, অতি দরিদ্রদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নগদ অর্থ প্রদান প্রভৃতির প্রস্তাব করেন।

মুক্ত আলোচনায় ডিএনসিসি কাঁচা ও সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি দীন মোহাম্মদ, কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি এস এম নাজির হোসেন, বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী ইনাম আহমেদ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদফতরের উপ-পরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার, র‌্যাব-৩ অধিনায়ক রাকিবুল হাসান, বিএসটিআইয়ের পরিচালক (প্রশা.) তাহের জামিল এবং ডিএমপির এডিসি মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী মো. গোলাম মওলা এবং মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনায়েতুল্লাহ প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।

jagonews24

ডিএনসিসি কাঁচা ও সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, ‘করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যমান নিয়ন্ত্রণে সরকারের নির্দেশ যথাযথ পালন করা হবে।’

ক্যাবের সহ-সভাপতি নাজের হোসেন বলেন, ‘রমজানে ভোগ্যপণ্যের বাজার অসহনীয় হয়ে পড়ে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সকল সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে বাজার তদারকি বাড়ানোর প্রয়োজন।’

বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী মো. গোলাম মওলা বলেন, ‘পাইকারি পর্যায়ে করোনা পরিস্থিতিতে ভোগ্যপণ্যের মজুদের কোনো ঘাটতি নেই, শুধুমাত্র ভোজ্যতেলের দাম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাড়ায় সেটা স্থানীয় বাজারে বেড়েছে।’

পাইকারি পর্যায় থেকে খুচরা পর্যায়ে মুনাফা কত হবে তা নির্ধারণে একটি নির্দেশনা প্রদানের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানান এবং এক্ষেত্রে ক্যাশ মেমো ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন তিনি।

এছাড়া লকডাউন সময়ে পাইকারি বাজারগুলোতে বিশেষ করে রাতের বেলায় নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রস্তাব করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনাতুল্লাহ জানান, গরম মসলার মজুতের কোনো স্বল্পতা নেই, তাই এ ধরনের পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়া উচিত নয়। তিনি নিত্যপণ্যের পাইকারি বাজার সীমিত পর্যায়ে খোলা রাখার আহ্বান জানান।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদফতরের উপ-পরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, ‘ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য কাজ করছে ভোক্তা অধিকার অধিদফতর।

তিনি অবহিত করেন, সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে কোনো পণ্যের মজুদের স্বল্পতা নেই এবং রমজানে তাদের সবগুলো টিম সপ্তাহে সাতদিন কাজ করবে। এছাড়াও মাংসের দাম নির্ধারণের একটি নির্দেশনা দেয়ার জন্য সিটি করপোরেশনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বিএসটিআইয়ের পরিচালক (প্রশাসন) তাহের জামিল বলেন, ‘বর্তমানে ২২৭টি পণ্যে বিএসটিআইয়ের মান নিয়ন্ত্রণ সনদ প্রদান করেছে এবং মানুষের মানসম্মত পণ্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকল্পে বিএসটিআইয়ের পক্ষ হতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালু করেছে। পণ্য পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিগুলো সীমিত আকারে খোলা রয়েছে। সার্ভিলেন্স কার্যক্রম বৃদ্ধি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা প্রভৃতি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।’

র‌্যাব-৩ অধিনায়ক রাকিবুল হাসান বলেন, ‘বাজার, ব্যাংকসহ অন্যান্য জায়গায় নিরাপত্তার জন্য র‌্যাব কাজ করছে এবং বিপণী বিতানগুলো খোলা রাখার সময়সীমা নির্ধারিত থাকলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’

ডিএমপির এডিসি মিজানুর রহমান বলেন, ‘ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হবে এবং প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার  কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

তিনি জানান, বর্তমানে ডিএমপির ১৫৪ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং ইতোমধ্যে ২৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

তিনি দ্রব্যমূল্যের বিষয়ক সকল তথ্য পুলিশকে প্রদানের জন্য আহ্বান জানান এবং ডিএমপির পক্ষ হতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সকল জনগণকে নগদ টাকা পরিবহনে নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী ইনাম আহমেদ বলেন, ‘ঢাকা শহরের ভেতরে সুপার শপের ২০০টি কেন্দ্র রয়েছে। যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে না। সুপার শপে সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা হচ্ছে।’

এমএএস/জেডএইচ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]