দিনে দেড় লক্ষাধিক লিটার দুধ বিক্রি করছে মিল্কভিটা

মুরাদ হুসাইন
মুরাদ হুসাইন মুরাদ হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২৪ পিএম, ৩১ মে ২০২১

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে ১৯৭৩ সালে গড়ে ওঠা সরকারি দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটা প্রতিদিন এক লাখ ৬০ হাজার লিটার তরল দুধ বিক্রি করছে। এছাড়া ২২টি দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করছে প্রতিষ্ঠানটি। মিল্কভিটার কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের মানুষের চাহিদা অনুযায়ী এখনো দুধ যোগান দিতে পারছে না মিল্কভিটা। এই চাহিদাপূরণকে মূল লক্ষ্য ধরে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ, দুগ্ধজাত পণ্য সরবরাহ এবং কর্মসংস্থান ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণে সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা হিসেবে মিল্কভিটা গড়ে তোলেন বন্ধবন্ধু। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ীতে প্রথম স্থাপিত হয় মিল্কভিটার দুধ পাস্তুরীকরণ কারখানা। সেখানে সমিতির মাধ্যমে দুধ সংগ্রহ করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা আন্দোলন ঘোষণা কার্যকর করতে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী নদীবন্দরে পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দেখেন অনেক মানুষ গরু নিয়ে যাচ্ছে। সেটি দেখে বঙ্গবন্ধু তিনটি লক্ষ্য বাস্তবায়নে মিল্কভিটা প্রতিষ্ঠার ভাবনা মাথায় আনেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের সরকার ১৯৭৩ সালে মাদারীপুরের টেকেরহাট, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও ঢাকায় পাঁচটি দুধ সংগ্রহ ও সরবরাহ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে।

বর্তমানে মিল্কভিটা দেশের সাতটি বিভাগের ৪২টি জেলার ১৮৫টি উপজেলা থেকে তরল দুধ সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত করে সারাদেশে বিপণন করছে। দুধ সংগ্রহের পাশাপাশি খামারিদের স্বল্প সুদে ঋণ, কৃত্রিম প্রজনন সেবার অংশ হিসেবে খামারিদের বিনামূল্যে সিমেন ও ভ্যাকসিন বিতরণসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং গোখাদ্য কারখানা স্থাপনসহ দুধ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নানামুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে মিল্কভিটা।

jagonews24বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড ভবন

এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, সারাদেশে মিল্কভিটার ৫২টি শিতলীকরণ কেন্দ্রে (ফ্রোজেন) ৬৯টি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে প্রতিদিন এক লাখ ৭০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা হচ্ছে। দিনে এক লাখ ৬০ হাজার লিটার তরল দুধ বিক্রি করা হচ্ছে। বাকি দুধ দিয়ে ২২ ধরনের দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। এজন্য দেশজুড়ে ৬০টির মতো বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে।

জানা গেছে, সারাদেশে মোট এক হাজার ৮৬৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। সনাতনী বাজার ব্যবস্থায় দুধের ন্যায্য দাম পেতেন না কৃষক। শহরের মানুষের কাছেও পণ্যটি সহজলভ্য ছিল না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও ছিল অনেক বেশি। ৫০ বছর পর এ চিত্রের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। দুধ হয়ে উঠেছে সহজলভ্য ও সাধারণ একটি নিত্যপণ্য। অন্যদিকে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের লাভজনক ব্যবসায় প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছেন উদ্যোক্তারাও। দুগ্ধশিল্পে ক্রমেই সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে বাংলাদেশ।

মিল্কভিটার কার্যক্রম আরও বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ঢাকার কারখানায় ‘মিল্কভিটা ইউএইচটি মিল্কপ্ল্যান্ট’, বাঘাবাড়ীঘাট কারখানায় ‘মিল্কভিটা কনডেন্সড প্ল্যান্ট, ‘মিল্কভিটা ইউএইচটি মিল্কপ্ল্যান্ট’, ‘কনডেন্সড মিল্ক ক্যান মেকিং প্ল্যান্ট’ ও প্রধান কার্যালয়ে ‘মিল্কভিটা ক্যান্ডি প্ল্যান্ট’ ইত্যাদি স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিস্তৃত করার লক্ষ্যে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে দুগ্ধ শীতলীকরণ কারখানা স্থাপনের কাজ চলছে।

বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেডের (মিল্কভিটা) চেয়ারম্যান শেখ নাদির হোসেন লিপু জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের মানুষের চাহিদা অনুযায়ী এখানো মিল্কভিটা জোগান দিতে পারছে না। দেশের প্রতিটি জেলা থেকে দুধ সংগ্রহ করে স্বল্পমূল্যে সেই জেলায় বিক্রি করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা রয়েছে। আমরা সেই মোতাবেক কাজ করে যাচ্ছি। একইসঙ্গে সমবায়ী দুগ্ধ খামারিদের ভাগ্যের উন্নয়নেও কাজ করা হচ্ছে। খামারিরা যেন তাদের উৎপাদিত দুগ্ধের ন্যায্যমূল্য পান, সেজন্য মিল্কভিটা সদা সচেষ্ট রয়েছে। করোনাকালেও আমাদের উৎপাদিত পণ্য যেন সবাই কিনতে পারে সেই সুযোগ রয়েছে।’

jagonews24মিল্কভিটার চেয়ারম্যান শেখ নাদির হোসেন লিপু

তিনি বলেন, ‘দেশে গবাদিপশুর দুধ বৃদ্ধি করতে ফরিদপুরে ৪০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। তার মধ্যে ১০০ কোটি টাকা দিয়ে উন্নতজাতের গাভী পালন করা হবে। এ ধরনের আরেকটি প্রকল্প দিনাজপুরে গড়ে তোলা হয়েছে। বাঘাবাড়ীতে পাউডার দুধের পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ মেট্রিক টন (৭-৮ হাজার কেজি) দুধ উৎপাদন হয়। নতুন করে ১৫০ কোটি টাকার আরেকটি পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করা হচ্ছে। সেখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০ মেট্রিক টন গুঁড়ো দুধ প্রস্তুত করা সম্ভব হবে।’

বছরে সাত হাজার কোটি টাকার গুঁড়ো দুধ আমদানি করা হয় উল্লেখ করে মিল্কভিটার চেয়ারম্যান বলেন, ‘এতে প্রচুর পরিমাণে দেশি মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য মানুষের কাছে সহজলভ্য করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মেধাবী ও স্বাস্থ্যবান প্রজন্ম করে গড়ে তুলতে মিল্কভিটা কাজ করে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘দেশের দুগ্ধশিল্পকে ধ্বংস করে বিদেশি গুঁড়ো দুধ বাজারজাত বাড়াতে একটি মহল নানাভাবে অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। সম্প্রতি দেশের গবাদিপশুর দুধে সীসা রায়েছে—এমন গুজব তুলে এ শিল্পের ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে। অনেকে দুধ কেনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় আমাদের ক্রয়-উৎপাদন কমে যায়। এতে করে প্রান্তিক কৃষকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। কঠোর প্রচেষ্টায় আমরা মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে সরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি।’

শেখ নাদির হোসেন লিপু আরও বলেন, ‘গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খামারিদের দুধ উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আবার করোনায় বিভিন্ন সময়ে দেয়া লকডাউনে পরিবহন সংকটের কারণে তারা ঠিকমতো দুধ বিক্রি ও পরিবহন করতে পারেননি। এতে খামারিরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ফলে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন খামারিরা। তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং দুগ্ধশিল্প যেন বিপর্যয়ের মুখে না পড়ে সেজন্য খামারিদের ব্যবসায়ীদের মতো অনুদান দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। খামারিদের বিপর্যয় ঠেকানো গেলে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটার অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে বলে আমি মনে করি।’

এমএইচএম/ইএ/এইচএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]