দুরবস্থায় বস্ত্র খাতের বেশিরভাগ কোম্পানি, আছে চমকও

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৪৮ এএম, ২২ জুন ২০২১

দুরবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ টেক্সটাইল বা বস্ত্র খাতের কোম্পানি। তালিকাভুক্ত ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টিই চলমান হিসাব বছরের (২০২০-২১) প্রথম ৯ মাসের ব্যবসায় লোকসানে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি আগের হিসাব বছরেও লোকসানে ছিল। আবার মুনাফা করলেও তা আগের বছরের তুলনায় কমে গেছে, এমন কোম্পানি রয়েছে ১৬টি।

বেশিরভাগ বস্ত্র কোম্পানি দুরবস্থার মধ্যে পতিত হলেও কিছু প্রতিষ্ঠান এর মধ্যেই ভালো ব্যবসা করেছে। এমনকি আগের হিসাব বছরের তুলনায় মুনাফায় ২২০০ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর সঙ্গে আগের হিসাব বছরে লোকসানে পড়া চারটি প্রতিষ্ঠান মুনাফায় ফিরে এসেছে।

নিয়ম অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে প্রতি তিন মাস পর পর আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হয়। এরই আলোকে তালিকাভুক্ত ৫৮ বস্ত্র প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫১টি চলতি হিসাব বছরের ৯ মাসের (২০২০ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেসব আর্থিক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

আবার এখন পর্যন্ত আর্থিক অবস্থার চিত্র প্রকাশ করতে পারেনি সাতটি প্রতিষ্ঠান। সেগুলো হলো- তুং হাই নিটিং, তাল্লু স্পিনিং, রিং সাইন টেক্সটাইল, মিথুন নিটিং, এনভয় টেক্সটাইল, ঢাকা ডাইং এবং সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল।

আর্থিক অবস্থার তথ্য প্রকাশ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে সাফকো স্পিনিং। প্রতিষ্ঠানটি চলতি হিসাব বছরের ৯ মাসে শেয়ারপ্রতি লোকসান করেছে ৪ টাকা ৩১ পয়সা। আগের হিসাব বছরও কোম্পানিটি বড় লোকসান করে। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ মালের মার্চ পর্যন্ত ব্যবসায় শেয়ারপ্রতি লোকসান হয় ৩ টাকা ৮৫ পয়সা। অর্থাৎ কোম্পানিটির লোকসানের পাল্লা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আরও ভারী হয়েছে। ধারাবাহিক লোকসানে থাকলেও গত দেড় মাসে কোম্পানিটির শেয়ার দাম বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছে।

বড় লোকসানে নিমজ্জিত আরেক প্রতিষ্ঠান অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটি চলতি হিসাব বছরের ৯ মাসে শেয়ারপ্রতি লোকসান করেছে ৪ টাকা ১১ পয়সা। এ প্রতিষ্ঠানটিও আগের হিসাব বছর বড় লোকসান করে। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যবসায় শেয়ারপ্রতি লোকসান হয় ৪ টাকা ২৫ পয়সা। এমন লোকসানের পরও গত এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ার দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

বড় লোকসানের মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খাওয়ার তালিকায় রয়েছে আরও এক প্রতিষ্ঠান, জাহিন টেক্স। চলতি বছরের ৯ মাসের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারপ্রতি লোকসান করেছে ২ টাকা ৫২ পয়সা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান ২ টাকা ২২ পয়সা। এ কোম্পানিটিরও গত দুই মাসে শেয়ারের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার ঘটনা ঘটেছে।

লোকসানে নিমজ্জিত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্র:

কোম্পানির নাম

শেয়ারপ্রতি মুনাফা (টাকা)

২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের মার্চ

২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের মার্চ

দেশ গার্মেন্টস

(.২৬)

.২৪

দুলামিয়া কটন

(.৪৬)

(.৪৫)

ইভিন্স টেক্সটাইল

(.১৪)

.৩৪

ফ্যামেলি টেক্স

(.১৩)

.০০৪

জেনারেশন নেক্সট

(.০৩)

.২৩

হামিদ ফেব্রিক্স

(১.৩১)

.৭২

নূরানী ডাইং

(.৯৫)

(.৪২)

প্রাইম টেক্সটাইল

(২.১২)

.০৬

রিজেন্ট টেক্সটাইল

(.৯২)

.৩৪

আরএন স্পিনিং

(.১৬)

(.৮৩)

শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ

(.৭৯)

.৪১

সোনারগাঁও টেক্সটাইল

(১.২৯)

.৩৭

স্টাইল ক্রাফট

(.৫৬)

১.১৪

জাহিন স্পিনিং

(১.৩৭)

(.৭৬)

এদিকে চলমান হিসাব বছরের প্রথম ৯ মাসের ব্যবসায় সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে ম্যাকসন স্পিনিং। আগের হিসাব বছরের তুলনায় কোম্পানিটির মুনাফায় ২২০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি হিসাব বছরের প্রথম ৯ মাসের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ১ টাকা ১৫ পয়সা, যা আগের হিসাব বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৫ পয়সা। মুনাফার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে কোম্পানিটির শেয়ার দামেও। দুই মাসের মধ্যে ম্যাকসন স্পিনিংয়ের শেয়ার দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

মুনাফায় বড় প্রবৃদ্ধি হওয়া আরেক কোম্পানি মালিক স্পিনিং। চলতি হিসাব বছরের প্রথম ৯ মাসের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ৮০০ শতাংশ। চলতি হিসাব বছরের প্রথম ৯ মাসের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ১ টাকা ৯৮ পয়সা, যা আগের হিসাব বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ২২ পয়সা। মুনাফার কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব এই কোম্পানিটির শেয়ার দামেও পড়েছে। গত দুই মাসে ১৩ টাকা থেকে কোম্পানিটির শেয়ার দাম বেড়ে ২২ টাকায় উঠেছে।

মুনাফায় বড় প্রবৃদ্ধি হওয়ার তালিকায় আরও রয়েছে মতিন স্পিনিং। কোম্পানিটির মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩৮ শতাংশ। চলতি হিসাব বছরের ৯ মাসের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ৪ টাকা ৩ পয়সা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয় ১ টাকা ৬৯ পয়সা।

এদিকে লোকসান থেকে বেরিয়ে চারটি প্রতিষ্ঠান মুনাফার দেখা পেয়েছে। এরই মধ্যে মেট্রো স্পিনিং চলতি হিসাব বছরের ৯ মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ৬২ পয়সা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি ১৭ পয়সা লোকসান হয়। আগের হিসাব বছরের শেয়ারপ্রতি ৮৮ পয়সা লোকসান করা মোজাফ্ফর হোসেন স্পিনিং চলতি হিসাব বছরে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ১২ পয়সা।

চলতি হিসাব বছরের ৯ মাসে শেয়ারপ্রতি ৩৮ পয়সা মুনাফা করা আলহাজ টেক্সটাইল গত হিসাব বছরের প্রথম ৯ মাসের ব্যবসায় লোকসান করে ৭৬ পয়সা। আরেক প্রতিষ্ঠান তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ গত হিসাব বছরের প্রথম ৯ মাসের ব্যবসায় শেয়ারপ্রতি লোকসান করে ২ টাকা ৮০ পয়সা। এ প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছর শেয়ারপ্রতি ৩৬ পয়সা মুনাফা করেছে।

মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হওয়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্র

কোম্পানির নাম

শেয়ারপ্রতি মুনাফা (টাকা)

২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের মার্চ

২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের মার্চ

আনলিমা ইয়ার্ন

.২২

.১১

অ্যাপেক্স স্পিনিং

২.৫১

২.১৯

ড্রাগন সোয়েটার

.৯২

.৭১

এইচ আর টেক্সটাইল

১.৮৪

১.৩১

হা-ওয়েল টেক্সটাইল

১.৯১

১.৯০

নিউ লাইন ক্লোথিং

১.৩২

১.২৮

কুইন সাউথ টেক্সটাইল

.৮৯

.৭৮

রহিম টেক্সটাইল

১.৮৪

.৭৩

সায়হাম কটন

.৭২

.৫৬

স্কয়ার টেক্সটাইল

১.৮৪

১.১৯

তমিজউদ্দিন টেক্সটাইল

.৯৮

.৮১

মুনাফার দেখা পেলেও গত বছরের তুলনায় মুনাফা কমে যাওয়ার তালিকায় রয়েছে- আমান কটন, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং, আর্গন ডেনিম, ডেল্টা স্পিনিং, স্কয়ার নিটিং, ফারইস্ট নিটিং, কাট্টলী টেক্সটাইল, এমএল ডাইং, মুন্নু ফেব্রিক্স, প্যাসেফিক ডেনিমস, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, সায়হাম টেক্সটাইল, শাশা ডেনিমস, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ এবং ভিএসএফ থ্রেড ডাইং।

এর মধ্যে শাশা ডেনিমসের মুনাফা সবচেয়ে বেশি হারে কমেছে। কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ১ টাকা ১৫ পয়সা থেকে কমে ৬৩ পয়সায় নেমে এসেছে। কমার তালিকায় এর পরের স্থানে থাকা আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ৩৯ পয়সা, যা আগের হিসাব বছরে ছিল ৬৩ পয়সা। মুনাফা বড় হারে কমেছে সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজেরও। এই প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ১ টাকা ১৯ পয়সা থেকে কমে ৭৬ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া আমান কটনের শেয়ারপ্রতি মুনাফা ১ টাকা ২৩ পয়সা থেকে কমে ১ টাকা ১০ পয়সা, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের ২ টাকা ১৬ পয়সা থেকে ১ টাকা ৩৮ পয়সা, আর্গন ডেনিমের ১ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮ পয়সা, ডেল্টা স্পিনিংয়ের ১৬ পয়সা থেকে ১১ পয়সা, স্কয়ার নিটিংয়ের ২ টাকা ৪০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮৩ পয়সা, ফারইস্ট নিটিংয়ের ৩৪ পয়সা থেকে ৩৩ পয়সা, কাট্টলী টেক্সটাইলের ১ টাকা ৪০ পয়সা থেকে ৯০ পয়সা, এমএল ডাইংয়ের ১ টাকা ১৬ পয়সা থেকে ৭৯ পয়সা, মুন্নু ফেব্রিক্সের ৬ পয়সা থেকে ৪ পয়সা, প্যাসেফিক ডেনিমসের ৬৫ পয়সা থেকে ৪২ পয়সা, প্যারামউন্ট টেক্সটাইলের ৩ টাকা ৬৪ পয়সা থেকে ৩ টাকা ৪০ পয়সা, সায়হাম টেক্সটাইলের ৭০ পয়সা থেকে ৬৪ পয়সা এবং ভিএসএফ থ্রেড ডাইংয়ের ১ টাকা ৩৯ পয়সা থেকে কমে ১ টাকা ২৭ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ম্যাকসন স্পিনিংয়ের কোম্পানি সচিব নূর মোহাম্মদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ বছর আমাদের ভালো ব্যবসা হয়েছে। বাহির থেকে অনেক অর্ডার এসেছে। মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, ভারত থেকে কিছু অর্ডার এসেছে। যার ইতিবাচক প্রভাব মুনাফায় দেখা যাচ্ছে। শুধু আমাদের নয়, সব স্পিনিং প্রতিষ্ঠানেরই মুনাফা বেড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ বছর আমাদের ব্যবসার ধারাবাহিকতা রয়েছে। প্রথম ৯ মাসের মতো এখনো ভালো ব্যবসা হচ্ছে। বিক্রি কমে যাওয়া বা উৎপাদন কমে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। আশা করি বছরের বাকি সময় ব্যবসার এ ধারাবাহিকতা থাকবে।’

সাফকো স্পিনিংয়ের কোম্পানি সচিব ইফতেখার আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০১৯ ও ২০২০ সালে আমরা একটি খারাপ সময় পার করেছি। আমাদের উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। শেষ প্রান্তিকে আমরা কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছি। মুনাফার দেখা পেয়েছি। তারপরও ৯ মাসের ব্যবসায় আমরা এখনও বড় লোকসানে আছি।’

বড় লোকসান করার পরও সম্প্রতি শেয়ারের যে দাম বেড়েছে তাকে স্বাভাবিক মনে করেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শেষ প্রান্তিকে মুনাফা করলেও নয় মাসের হিসাবে আমরা কিন্তু বড় লোকসানে রয়েছি। সুতরাং সম্প্রতি শেয়ারের যে দাম বেড়েছে, তাকে আমরা স্বাভাবিক মনে করছি না। বিষয়টি আমরা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) জানিয়েছি। কেন শেয়ারের দাম এমন বাড়ছে বা কারা বাড়াচ্ছে, সে বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নেই।’

এমএএস/এমএইচআর/এসএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]