চলতি মাসে পুঁজিবাজার ছেড়েছেন সোয়া দুই লাখ বিনিয়োগকারী

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:১৯ পিএম, ২৪ জুলাই ২০২১

দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে বেশ ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে দেশের শেয়ারবাজার। এ পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ার কথা থাকলেও সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ (সিডিবিএল)-এর বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবের তথ্যে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। বিনিয়োগকারী বাড়ার বদলে চলতি মাসে দুই লাখের ওপরে বিও হিসাব কমে গেছে। এর আগে জুন মাসে এক লাখের ওপরে বিও হিসাব কমে যায়।

এতে দেড় মাসের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ বিও হিসাব বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিও হিসাব কমার মূল কারণ প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) নতুন নীতিমালা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন আইপিওতে আবেদন করতে প্রতিটি বিওতে কমপক্ষে ২০ হাজার টাকার বিনিয়োগ থাকতে হবে। এ কারণে আগে যেসব বিনিয়োগকারী শুধু আইপিও করার জন্য বিও হিসাব খুলতেন, তারা তা বন্ধ করে দিয়েছেন।

তারা আরও বলছেন, বিও হিসাবের ভিত্তিতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী কমলেও প্রকৃত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেড়েছে। আগে অনেকেই শুধু আইপিও আবেদন করার জন্য নামে-বেনামে বিও হিসাব খুলতেন। এসব বিও হিসাব থেকে সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগ হতো না, শুধু আইপিও আবেদন হতো। কিন্তু এখন যেহেতু আইপিও আবেদনের ক্ষেত্রে সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সে কারণে শুধু আইপিও’র জন্য খোলা হিসাবগুলো বিনিয়োগকারীরা বন্ধ করে দিচ্ছেন।

অবশ্য গত দেড় মাসে বড় অঙ্কের বিও হিসাব কমে যাওয়ায় কেউ কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, বর্তমানে শেয়ারবাজার বেশি ভালো অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বিও হিসাব কমে যাচ্ছে। তাই কী কারণে বিও হিসাব কমে যাচ্ছে, তা বিএসইসির খতিয়ে দেখা উচিত।

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ (সিডিবিএল)- এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯ জুলাই বিও হিসাব দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৯ হাজার ৩৪৬টি, যা জুন মাস শেষে ছিল ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৪৩১টি। অর্থাৎ চলতি মাসে বিও হিসাব কমেছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৮৫টি। এর আগে জুন মাসে বিও হিসাব কমে ১ লাখ ২২ হাজার ৩৮৬টি। এ হিসেবে গত দেড় মাসে পুঁজিবাজার ছেড়েছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৪৭১ জন বিনিয়োগকারী।

বিও হলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্রোকারেজ হাউস অথবা মার্চেন্ট ব্যাংকে একজন বিনিয়োগকারীর খোলা হিসাব। এই বিও হিসাবের মাধ্যমেই বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে লেনদেন করেন। বিও হিসাব ছাড়া শেয়ারবাজারে লেনদেন করা সম্ভব নয়।

সিডিবিএল’র তথ্য মতে, চলতি মাসে পুরুষ ও নারী উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমেছে। সেই সঙ্গে কমেছে প্রবাসী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীর সংখ্যা। পাশাপাশি কোম্পানি বিনিয়োগকারীও কমেছে।

বর্তমানে (১৯ জুলাই এর হিসাব) পুরুষ বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব আছে ১৭ লাখ ৯ হাজার ৬০০টি। জুন মাস শেষে এই সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৪৪৯টি। অর্থাৎ চলতি মাসে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের হিসাব কমেছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৮৪৯টি।

অপরদিকে বর্তমানে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৫ হাজার ৬৭টি। জুন মাস শেষে এই সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৫২ হাজার ২৭৫টি। এ হিসাবে নারী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমেছে ৬৭ হাজার ২০৮টি।

এদিকে বর্তমানে কোম্পানি বিও হিসাব রয়েছে ১৪ হাজার ৬৭৯টি। জুন মাস শেষে এই সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৭০৭টিতে। সে হিসেবে কোম্পানি বিও হিসাব কমেছে ২৮টি।

ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বর্তমানে দেশি বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ২১ লাখ ৭৮ হাজার ১৮টি। যা জুন মাস শেষে ছিল ২৩ লাখ ৮০ হাজার ৮৭৪টি। অর্থাৎ চলতি মাসে পুঁজিবাজার ছেড়েছেন ২ লাখ ২ হাজার ৮৫৬ দেশি বিনিয়োগকারী।

অপরদিকে বর্তমানে প্রবাসী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব রয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৪৯টি। জুন মাস শেষে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৫০টিতে। অর্থাৎ প্রবাসী ও বিদেশি বিও হিসাব কমেছে ২৪ হাজার ২০১টি।

যোগাযোগ করা হলে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন বাজার ভালো চলছে। সুতরাং বিও হিসাব কমার কথা না। আইপিও’র নতুন নিয়মের কারণে হয় তো কিছু বিও হিসাব বন্ধ হতে পারে। কিন্তু গত দেড় মাসে যে পরিমাণ বিও হিসাব কমেছে তা উদ্বেগজনক। কি কারণে এতো বেশি বিও হিসাব বন্ধ হয়ে গেছে তা সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখা উচিত।’

অন্যদিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, ‘আইপিও আবেদনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কমপক্ষে ২০ হাজার টাকার বিনিয়োগের নিয়ম করে দিয়েছে। এই নিয়মনের কারণে কিছু বিও হিসাব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তবে এটা বাজারের জন্য খারাপ কিছু না, বরং বাজারের জন্য ভালো। কারণ এখন যারা থাকবে তারাই প্রকৃত বিনিয়োগকারী।’

তিনি বলেন, ‘আগে আইপিও’র যে নিয়ম ছিল তাতে শুধু আইপিও ধরার জন্য অনেক বিও হিসাব খোলা হতো। ওই সব বিও থেকে শুধু আইপিও আবেদন করা হতো, সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগ হতো না। কিন্তু এখন সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। আইপিও আবেদন করতে গেলে অবশ্যই সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগ করতে হবে। এটা খুবই ভালো সিদ্ধান্ত। এর ফলে প্রকৃত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়বে এবং বাজারের গভীরতা বাড়বে।’

এমএএস/এমএইচআর/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]