এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ জয়ে স্থানীয় বাজার সক্ষমতা বাড়াতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:০৬ পিএম, ২৮ আগস্ট ২০২১

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্থানীয় বাজারের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শুল্ক ও কর কাঠামোর যুগোপযোগীকরণ আবশ্যক। একই সঙ্গে অটোমেশন, পণ্য উৎপাদন ও সাপ্লাই চেইন ইকোসিস্টেমের উন্নয়ন, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণসহায়তা জরুরি।

শনিবার (২৮ আগস্ট) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের প্রস্তুতি, স্থানীয় বাজারের উন্নয়ন’ শীর্ষক ভার্চুয়াল ডায়ালগে এ কথা বলেন আলোচকরা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি দাস বলেন, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রদত্ত সরাসরি ভর্তুকিসহ নানাবিধ সুবিধা হ্রাস পাবে। এমতাবস্থায় রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে আরও অধিকহারে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

একই সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ শিল্পায়ন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন। বাণিজ্য সচিব এলডিসি-পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ীদের ক্যাশ ইনসেনটিভ সহায়তা দিতে না পারলেও অন্যান্য পন্থায় উদ্যোক্তাদের সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন।

দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার প্রক্রিয়াসমূহ আরও সহজীকরণের ওপর তিনি জোর দেন। জানান, সরকার দেশের ব্যবসা পরিচালনার সূচকের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং এ সুযোগ গ্রহণ করে ব্যবসায়ীদের আরও বেশি হারে বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে হবে।

ডায়ালগের স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের কারণে ২০২৬ সালের পর বাংলাদেশের রপ্তানির বাজারকে কমপ্লায়েন্স, ব্র্যান্ডিং ও আইপিআরের চ্যালেঞ্জসহ অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শুল্ক-অশুল্ক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হবে, যা আমাদের স্থানীয় বাজারকে প্রভাবিত করবে। আমাদের জিডিপিতে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য ও সেবাখাতের অবদান প্রায় ৬০ শতাংশ। এছাড়া ফ্যাশনওয়্যার, ফুটওয়্যার ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

এ অবস্থায় শুল্ক ব্যবস্থাপনা, কর কাঠামো ও ভোক্তাদের আচরণ পরিবর্তনের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় বাজারের উন্নয়ন, পণ্য উৎপাদন, সাপ্লাই চেইন ইকোসিস্টেম ও সর্বোপরি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানান ডিসিসিআই সভাপতি।

তিনি স্থানীয় বাজারের পরিবেশ উন্নয়নের জন্য নতুন বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন ও সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। রিজওয়ান রহমান স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আরও শক্তিশালী করতে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের স্থানীয় বাজার উন্নয়নে ব্যবসায়ীদের দক্ষতা ও পণ্য উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তাব করেন এনবিআর সদস্য (ভ্যাটনীতি) মো. মাসুদ সাদিক। দেশের পণ্য রপ্তানি বাড়াতে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণসহায়তা, ভ্যাট প্রদানের প্রক্রিয়া আরও সহজীকরণ, অবকাঠামোখাতের উন্নয়ন, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এছাড়া বন্ড সিস্টেম অটোমেশনের পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানোরও পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (গবেষণা) ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় দেশের উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিয়েছে এবং সম্প্রতি ঘোষিত মুদ্রানীতিতে অনেকাংশেই সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে উদ্যোক্তারা স্বল্প সুদে আর্থিক সহায়তা পাবেন।

তিনি জানান, করোনা মহামারির ফলে পর্যটন খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ৫০০ কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ঘোষণা করা হবে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সদস্য শাহ মো. আবু রায়হান আলবেরুনী বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের শুল্ক ও ট্যারিফ কাঠামো এবং নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংস্কার একান্ত আবশ্যক। তিনি স্থানীয় বেকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের উন্নয়নে আমাদের উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান এবং জাপান ও কোরিয়ার উদাহরণকে অনুসরণ করে দেশের কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়নের ওপর জোর দেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ-এর চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান খান চৌধুরী বলেন, ব্যবসা পরিচালনার জন্য ইতিবাচক মনোভাব খুবই জরুরি। তিনি বলেন, রপ্তানি বাড়লে দেশের স্থানীয় বাজারেরও উন্নয়ন হবে। রপ্তানি সম্প্রসারণে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাসমূহ দ্রুত নিরসন করার ওপর তিনি জোর দেন এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য পণ্য উৎপাদন ব্যয় কমানো ও উৎপাদনের হার বাড়ানোর আহ্বান জানান। এছাড়া তিনি তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও বন্ড সুবিধা ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে এফটিও স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া দ্রুততর করার প্রস্তাব করেন।

ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল বাসার হাওলাদার বাংলাদেশের অবকাঠামাসহ অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের জন্য স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণসহায়তার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রপ্তানি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে সহযোগিতার প্রস্তাব করেন।

বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বাপী) মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান বলেন, দেশীয় চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ মিটিয়ে, বিশ্বের ১৫১টি দেশে আমাদের উৎপাদিত ওষুধ রপ্তানি করা হচ্ছে এবং করোনো মহামারিকালে এ খাতে রপ্তানির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। দেশে এপিআই উৎপাদন বাড়াতে কার্যক্রম চলমান।

ইএআর/বিএ/এইচএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]