দেশেই পলিস্টাইরিন ফেব্রিকস উৎপাদন করবে প্রাণ-আরএফএল

সাইফুল হক মিঠু
সাইফুল হক মিঠু সাইফুল হক মিঠু
প্রকাশিত: ০৮:৩৪ এএম, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বাড়ছে প্লাস্টিকের ব্যবহার। ব্যবহৃত প্লাস্টিক যত্রতত্র ছড়িয়ে ডেকে আনছে পরিবেশ বির্পযয়। সেই বিপর্যয় রোধে এগিয়ে এসেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগ্রুপ প্রাণ-আরএফএল। ব্যবহৃত প্লাস্টিক রিসাইক্লিং করে এতদিন মগ, চেয়ার তৈরি করলেও এবার পলিস্টাইরিন ফেব্রিক তৈরির পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

কোমলপানীয় বা জুসের পিইটি বোতল চূর্ণ থেকে দেশেই তৈরি হবে এই ফেব্রিক। আর সেই ফেব্রিক থেকে সুতা ও গার্মেন্টসপণ্য তৈরি করতে চায় শিল্পগ্রুপটি। এরই মধ্যে নীতিগত সিদ্ধান্ত, মেশিন কেনা ও ফ্যাক্টরির জায়গা নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। পরিকল্পনা রয়েছে আগামী দুই বছরের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়ার।

জানা যায়, দেশে পলিস্টাইরিনের ব্যাপক চাহিদা আছে। বাংলাদেশে যন্ত্রপাতি ও দক্ষ লোকবলের অভাবে দেশে প্লাস্টিকপণ্যের প্রাচুর্য থাকার পরও বিদেশ থেকে এই ফেব্রিক ও সুতা আমদানি করতে হয়। বর্তমানে স্বল্প পরিসরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পিইটি বোতল থেকে এই ফেব্রিক তৈরি করছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে পোশাকখাতে বিপুল পরিমাণ পলিস্টাইরিন ফেব্রিক আমদানি করতে হয়। কোম্পানিগুলো পিইটি ফ্লেক্স বা চিপ (চূর্ণ) সংগ্রহ করে তা চীন ও ভারতের মতো দেশে পাঠায়। পরে ওইসব দেশ থেকে ফেব্রিক ও সুতা আমদানি করে। এতে তাদের পলিস্টাইরিন থেকে গার্মেন্টসপণ্য উৎপাদন করতে খরচ বাড়ছে। দেশে এ ধরনের ফেব্রিক করা গেলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহ-সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জাগো নিউজকে বলেন, বিদেশ থেকে পলিস্টাইরিন সুতা আমদানি করে ৩০টির বেশি ফ্যাক্টরি। বাংলাদেশে এ ধরনের কাপড় ও সুতার হিউজ মার্কেট রয়েছে। শুধু বাংলাদেশের চাহিদা মেটাতে গেলেইে একশটির বেশি ফ্যাক্টরি দরকার।

জানা যায়, পিইটি বোতল ও পিইটি জাতীয় প্যাকেজিংয়ের ব্যাপক ব্যবহার হয় বাংলাদেশে। প্রাণ-আরএফএল এ খাতে আগামী দুই বছরের মধ্যে পিইটি বোতলের রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করছে, যেখানে ফেব্রিক পর্যন্ত করা যাবে। এতে পরোক্ষভাবে পরিবেশের ব্যাপক উপকার হবে, বিকশিত হবে দেশের গার্মেন্টসখাত।

এর আগে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকপণ্য থেকে ২০১৯ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপের জার্সি ও কিট বানিয়ে আলোচনায় আসে শ্রীলংকান ক্রিকেটদল। পরিবেশ দূষণে দেশটির অনেক সামুদ্রিক প্রাণী যখন বিপন্ন তখন পরিবেশবান্ধব জার্সি প্রশংসা পায় দুনিয়াজুড়ে।

এ বিষয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল জাগো নিউজকে বলেন, পিইটি বোতল দিয়ে জার্সিসহ অন্য গার্মেন্টসপণ্য বানানোর পরিকল্পনা আছে আমাদের। ভবিষ্যতে এসব পণ্যের চাহিদা বাড়বে, পিইটি বোতলের ব্যবহার অনেক বাড়ছে। সেগুলো রিসাইকেল করে পরিবেশ উপযোগী করতে এটা করার পরিকল্পনা আছে আমাদের। এর ব্যাপক চাহিদা আছে দেশে। মার্কেটে গেলে বোঝা যায় কী পরিমাণ পলিস্টার গ্রেডের প্রোডাক্ট আমরা ব্যবহার করি। ইয়াং জেনারেশন এখন কটন পছন্দ করে না।

‘পিইটি থেকে পলিস্টার গ্রেডের প্রোডাক্ট তৈরি করতে ফ্যাক্টরির অ্যাপ্রুভাল হয়েছে, জায়গা সিলেকশনও হয়ে গেছে। স্ট্র্যাকচারাল ডেভেলপমেন্ট, মেশিনারিজ বসানো বাকি।’

jagonews24

জানা যায়, প্রাণ-আরএফএল প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ মেট্রিক টন প্লাস্টিকপণ্য উৎপাদন করে। প্লাস্টিকপণ্য রিসাইক্লিং কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ২০১২ সাল থেকে। প্রতিবছর তারা প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন ব্যবহৃত প্লাস্টিক সংগ্রহ করে। এখান থেকে প্রায় ২৭ হাজার মেট্রিক টন কাঁচামাল উৎপন্ন হয়। আমদানি করলে এ পরিমাণ কাঁচামালের আর্থিকমূল্য হতো প্রায় ৪শ কোটি টাকা। প্লাস্টিক রিসাইক্লিং খাতে গ্রুপটির এ পর্যন্ত মোট বিনিয়োগ প্রায় ৩২০ কোটি টাকা। প্রায় দুই হাজার লোকের সরাসরি এবং চার হাজার লোকের পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে এতে।

কামরুজ্জামান কামাল আরও বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় আমরা কালেকশন সেন্টার করেছি। ১২টি জায়গায় থেকে ব্যবহৃত প্লাস্টিক সংগ্রহ করেছি। আমরা মানুষকে এখন সচেতন করছি। তাদের বলছি আপনারা ব্যবহৃত প্লাস্টিক ভালোভাবে ডিসপোজাল করেন। বেশি বেশি রিসাইকেল প্রোডাক্ট আপনারা ব্যবহার করেন। উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের প্রোডাক্ট প্রিমিয়াম প্রোডাক্ট হিসেবে বিক্রি হয়। মানুষ গর্ববোধ করে এসব প্রোডাক্ট ব্যবহার করে।

আরএফএল রিসাইক্লিং প্রজেক্টের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল জাগো নিউজকে বলেন, আমরা সব ধরনের প্লাস্টিক রিসাইকেল করি। পলিস্টাইরিনের বিষয়টি আমাদের নাগালের বাইরে ছিল। এটা আমরা শুরু করেছি। এই মূহূর্তে মেশিনারিজ ও অন্য জিনিস সংগ্রহ করছি।

‘পিইটি বোতল থেকে ফাইবার করতে হয়। সেটা থেকে সুতা তৈরি করতে হয়। তারপর তৈরি করতে হয় গার্মেন্টস প্রোডাক্ট। আমাদের দেশে প্লাস্টিকের চিপে থেকে ফাইবার করার যন্ত্রাংশ নেই। বাংলাদেশে যেটা হয়, চিপ আকারে সেটি চীন বা ভারতে পাঠানো হয়। সেটাকে ফাইবার ও সুতা করে সেসব দেশ থেকে আনা লাগে।’

তিনি আরও বলেন, এরই মধ্যে আমাদের ম্যানেজমেন্টের অ্যাপ্রুভাল পর্যায়ে আছে। মেশিনারিজ, লোকবল সিলেকশন হয়ে গেছে। এখন আমরা ইনভেস্টমেন্টে যাবো। ‘হবিগঞ্জ-টু’ নামে আমাদের আরেকটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক হচ্ছে। সেখানে আমাদের এই ফ্যাক্টরিটা হবে। আশা করি আমরা দুই বছরের মধ্যে প্রোডাক্টশনে আসতে পারবো।

এসএম/এএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]