ফিরেছে হারানো চাকরি, মেলেনি স্বস্তি

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:০৩ পিএম, ১৬ অক্টোবর ২০২১
নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন ভিড় বাড়ছে টিসিবির লাইনেও

রাজধানীর রামপুরার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম। ২০১২ সালে যোগ দেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটছিল তার। কিন্তু করোনার প্রকোপে ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময় হঠাৎ চাকরি হারান। উপায় না দেখে যে বাসায় ভাড়া থাকেন, সংসারের ঘানি টানতে সেই বাসায়ই নেন দারোয়ানের চাকরি।

প্রায় এক বছর দারোয়ানের চাকরি করার পর চলতি বছরের মাঝামাঝি সময় ফিরে পান হারানো সেই চাকরি। তবে বেতন আগের চেয়ে বেশ কম। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম চড়া। ফলে হারানো চাকরি ফিরে পেলেও মিলছে না মানসিক স্বস্তি। একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে ছেলের স্কুলের খরচ। এ নিয়ে প্রতিদিনই দুশ্চিন্তায় কাটছে সাইফুলের জীবন।

তিনি বলেন, করোনার আগে ভালো বেতনেই চাকরি করতাম। গত বছর চাকরি হারিয়ে খুব ভেঙে পড়েছিলাম। সংসার চালাতে বাধ্য হয়েছিলাম দারোয়ানের চাকরি নিতে। আল্লাহর রহমতে আবার হারানো চাকরি ফিরে পেয়েছি। কিন্তু বেতন আগের চেয়ে অনেক কম। এখন যা বেতন পাচ্ছি, তা দিয়ে কষ্ট করেই সংসার চালাতে হচ্ছে। এর সঙ্গে চাল-ডাল, মাছ-মাংস ও সবজির যে দাম তাতে কষ্ট আরও বেড়েছে।

চাকরি করে মাসে যে টাকা পান, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলছে সাইফুলের। মাসে দু-একদিনের বেশি ভাত-মাংস খাওয়া হয় না তার। বেশিরভাগ সময় ডাল, আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে হয় বলে জানান তিনি।

সাইফুল বলেন, এভাবেই টেনেটুনে সংসার চালাচ্ছি। মাস শেষে কোনো টাকা জমা থাকে না। সামনে ছেলেকে আবার স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। এসব খরচ কীভাবে জোগাড় করবো তা নিয়ে প্রতিদিন দুশ্চিন্তায় থাকি। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না।

শুধু সাইফুল ইসলাম নন, তার মতো করোনার মধ্যে অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। এদের অনেকে আবার পেয়েছেন নতুন চাকরিও। তবে আগের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি অনেকে। এর সঙ্গে সম্প্রতি বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। ফলে একপ্রকার অস্বস্তির মধ্য দিয়েই দিন পার করতে হচ্ছে একটি বড় অংশকে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের দিন এখন বেশ কষ্টে কাটছে।

রাজধানীর বাড্ডার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন মরিয়ম। মাসে বেতন পান ১৪ হাজার টাকা। এ আয়ের ওপর নির্ভর করেই দুই সন্তান নিয়ে বাড্ডায় একটি ভাড়া বাসায় থাকেন এই পোশাক কর্মী।

আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, করোনার কারণে গত দুই বছরে মালিক কোনো বেতন বাড়াননি। মাসে ঘর ভাড়া দিতে হয় সাত হাজার টাকা। দুই হাজার টাকা লাগে চাল কিনতে। বাকি পাঁচ হাজার টাকার ওপর ভর করে চলতে হয় পুরো মাস। ডাল, তেল, আলু, পেঁয়াজ কিনতেই বাকি টাকা প্রায় শেষ হয়ে যায়। মাসের বেশিরভাগ সময় নিরামিষ খেয়ে থাকতে হয়। মাংস খুব একটা কপালে জোটে না। আমরা যে কী কষ্টে আছি তা বলে বোঝাতে পারবো না।

মরিয়মের এক ছেলে ও এক মেয়ে স্কুলে পড়ে। করোনার কারণে স্কুল বন্ধ থাকায়, গত বছর তাদের বেতন দিতে হয়নি। কিন্তু সামনে সন্তানদের আবার স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় মরিয়ম।

এই নারীর মতোই কষ্টে দিন কাটছে রিকশাচালক ফয়েজের। তিনি বলেন, করোনার কারণে অনেক দিন বেকার বসে ছিলাম। গ্রামে গিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করেছি। এখন সবকিছু খুলে দেওয়ায় আবার ফিরে এসেছি ঢাকায়। কিন্তু আগের মতো আর আয় হয় না। আয় কমার সঙ্গে ঢাকায় থাকার খরচ বেড়েছে। আগে গ্যারেজে থাকা-খাওয়ার জন্য যে টাকা দেওয়া লাগতো, এখন প্রায় তার দ্বিগুণ দিতে হয়।

ফয়েজের ভাষ্য, রিকশা চালিয়ে মাসে ১২-১৫ হাজার টাকার মতো আয় হয় তার। ঢাকায় থাকা-খাওয়ার পেছনেই প্রায় ১০ হাজার টাকা চলে যায়। গ্রামের বাড়িতে তার স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। তাদের জন্য পাঠাতে হয় টাকা। ফয়েজ বলেন, তাহলে কীভাবে আমাদের দিন চলছে একটু আপনারাই চিন্তা করেন।

ফিরেছে হারানো চাকরি, মেলেনি স্বস্তি

নিত্যপণ্যের দাম নতুন করে টিসিবির লাইনে নিয়ে আসছে অনেককে

মতিঝিলের বেসরকারি একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন মো. সুমন। তিনি বলেন, চাকরি আছে, কিন্তু দুশ্চিন্তার অভাব নেই। চাল-ডাল, তেল-চিনি, মাছ-মাংস, সবজিসহ সব কিছুর দাম হু হু করে বাড়ছে। অনেক কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছি। এক মাসের বেশি হয়ে গেছে, দুপুরে খাবার খাই না।

সবজি খাওয়ার উপায় নেই
আয়-রোজগারের যখন এমন অবস্থা, তখন সবজির বাজারও যেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। দু-একটি বাদে বেশিরভাগ সবজির কেজি এখন ৫০ টাকার ওপর। এমনকি ১০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে একাধিক সবজি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, তিনজনের পরিবারের জন্য ১০০ টাকার সবজি কিনলে দু’দিন যাওয়া কষ্টকর।

বাজারে প্রতি কেজি শসা বিক্রি হচ্ছে ৪০-৬০ টাকা, করলা ৫০-৭০, পাকা টমেটো ১২০-১৪০, শিম ১০০-১২০, গাজর ১০০-১৬০, বরবটি ৬০-৮০, বেগুন ৬০-৭০ এবং প্রতি কেজি পটল বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫০ টাকায়। শীতের আগাম সবজি ফুলকপি ও বাঁধাকপির পিস বিক্রি হচ্ছে ৩০-৫০ টাকা।

তেলে অশান্তি
সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত বছরের তুলনায় এখন সুপার পাম অয়েল তেল ৫২ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। লুজ সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৫০ দশমিক ২৭ শতাংশ বেশি দামে। লুজ পাম অয়েলের দাম বেড়েছে ৫৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। বোতলের পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের দাম গত বছরের তুলনায় ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং এক লিটার তেলের দাম ৪২ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেড়েছে।

৩০ শতাংশ বেড়েছে ময়দার দাম
এদিকে টিসিবির হিসাব মতে, গত বছরের তুলনায় বর্তমানে খোলা ময়দার দাম বেড়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ৯ দশমিক ২০ শতাংশ দাম বেড়েছে প্যাকেট ময়দার। খোলা আটার দাম বেড়েছে ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং প্যাকেট আটার দাম বেড়েছে ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

ভোগাচ্ছে চাল
আটা-ময়দার মতো চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের চাল। যদিও বছরের ব্যবধানে চালের দাম খুব একটা বেশি বাড়েনি। কিন্তু গরিবের মোটা চালের কেজিও এখন ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৬-৬৮ টাকা কেজি। মাঝারি মানের চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫২-৫৮ টাকায়।

স্বস্তি নেই ডালে
নিত্যপণ্যের দামে হাঁসফাঁস করা লোকজন বলছেন, সারাদিন পরিশ্রম করে তারা যে ডাল দিয়ে দু’মুঠো ভাত খাবেন তারও যেন উপায় নেই। মাঝারি দানার মসুর ডাল বছরের ব্যবধানে ১০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ২২ দশমিক ৭৬ শতাংশ দাম বেড়েছে বড় দানার মসুর ডালের।

পেঁয়াজে ব্যাপক ঝাঁজ
কয়েকদিন আগের তুলনায় কিছুটা দাম কমলেও ৬৫ টাকার নিচে এখন এক কেজি দেশি পেঁয়াজ কেনা যাচ্ছে না। আমদানি করা ভারতের পেঁয়াজ কিনতে লাগছে ৫০ টাকার বেশি। তেজপাতা, লবঙ্গ, জিরা, আদার জন্যও বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে ভোক্তাদের। দেশি আদার কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৭০-১৯০ টাকা এবং আমদানি করা আদা বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৮০ টাকা। লবঙ্গের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।

এমএএস/জেডএইচ/এইচএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]