করোনার মধ্যে দেশবন্ধু গ্রুপের ৮০০ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:০৯ পিএম, ২৭ অক্টোবর ২০২১

করোনাকালে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। এই মহামারিতে ছোট-বড় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কর্মী কাজ হারিয়েছেন। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম এখনো বন্ধ। এ দুর্যোগকালে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে না হেঁটে নতুন বিনিয়োগ করেছে দেশবন্ধু গ্রুপ। ফলে সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান।

করোনার গত দুই বছরে নিজেদের ব্যবসা বাড়াতে উৎপাদমুখী নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে গ্রুপটি। এ লক্ষ্যে গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান দেশবন্ধু সুগার মিলস, দেশবন্ধু বেভারেজ, দেশবন্ধু প্যাকেজিং ও দেশবন্ধু টেক্সটাইল মিলসসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও উৎপাদন বাড়াতে ৮০০ কোটি টাকা নতুন করে বিনিয়োগ করেছে। এতে নতুন করে আরও ২০ শতাংশ কর্মসংস্থান বেড়েছে।

জানা গেছে, ১৯৮৯ সালে ট্রেডিং ও সার আমদানির মাধ্যমে যাত্রা করে ‘দেশবন্ধু’। তারপর থেকে দেশের এই প্রতিষ্ঠিত শিল্প গ্রুপটিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। হাঁটি হাঁটি পা পা করে এ বছর গ্রুপটি অগ্রগতির ৩২ বছর উদযাপন করবে। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়া নতুন প্রকল্পগুলো চালু হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে দেশবন্ধু গ্রুপ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

দেশবন্ধু পলিমার, দেশবন্ধু সিমেন্ট, সাউথইস্ট সোয়েটার, দেশবন্ধু শিপিং, জিএম হোল্ডিংস, সাহেরা অটো রাইস মিলস, দেশবন্ধু সিকিউরিটি সার্ভিসেস, ট্রেডিং কোম্পানিজ, দেশবন্ধু পাওয়ার প্ল্যান্ট, দেশবন্ধু টেক্সটাইল, দেশবন্ধু ফাইবার, দেশবন্ধু কনজ্যুমার অ্যান্ড অ্যাগ্রো, সাহেরা ওয়াসেক হাসপাতাল, দেশবন্ধু পার্সেল অ্যান্ড লজিস্টিকস রয়েছে গ্রুপটির অধীনে।

jagonews24

দেশবন্ধু গ্রুপের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তাফার লক্ষ্যই হলো দেশে কর্মসংস্থান বাড়ানো। একই সঙ্গে দেশের গতিময় অর্থনীতির চাকা সচল রাখা। চলমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন শিল্প স্থাপন অব্যাহত রেখেছে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার। এতে করে বেসরকারি খাতে অবদান রাখাসহ কর্মসংস্থান, উন্নতমানের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে দেশবন্ধু গ্রুপ আরও অগ্রসর হবে বলে আশা করছেন কর্তৃপক্ষ।

দেশবন্ধু গ্রুপের পরিচালক (প্রশাসন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাকির হোসেন বলেন, করোনায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশই বিপর্যস্ত। এমন বাস্তবতায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন অব্যাহত রেখে দেশ ও দেশের মানুষের সেবায় কাজ করে যাচ্ছে দেশবন্ধু গ্রুপ।

তিনি বলেন, শুধু ব্যবসায়িক লাভের জন্য নয়, দেশের মানুষের পাশে থাকার জন্য চিনি, কনজ্যুমার ফুড, বেভারেজসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন করে যাচ্ছে। শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, রপ্তানি করা সব ধরনের পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে দেশবন্ধু।

তিনি আরও বলেন, দেশবন্ধু চিনিকলটি পুরোনো এবং দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী চিনিকল। এটি ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠত হয়। বর্তমানে মিলটির দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১৫০০ টন। অর্থাৎ বছরে সাড়ে চার লাখ টন চিনি উৎপাদিত হচ্ছে কারখানায়।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাকির হোসেন বলেন, দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশবন্ধু চিনিকল ইউরোপীয় কমিশনের ‘ইবিএ’-এর আওতায় ইউরোপে সর্বপ্রথম দেশি চিনি রপ্তানি শুরু করে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। ২০০২ সালে নতুন ব্যবস্থাপনায় আসার পরে বিশ্বের শীর্ষ মানের গুণমান এবং প্যাকেজিংয়ের সুখ্যাতি অর্জন করে দেশবন্ধু সুগার মিলস। সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নির্দেশনাও মেনে এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের বাজার সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে নিজস্ব লজিস্টিকের মাধ্যমে।

jagonews24

তিনি বলেন, দেশবন্ধু গ্রুপ একটি মানবিক ও কর্মীবান্ধব প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত। এদিকে খুব অল্প সময়েই দেশবাসীর মন জয় করেছে দেশবন্ধু বেভারেজের সব ধরনের পণ্য। বিশেষ করে দেশবন্ধু মিনারেল ওয়াটার সারাদেশে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করতে পেরেছে। ফলে চলতি বছরে দেশবন্ধু বেভারেজ কারখানার নতুন সেকশনসহ সার্বিক উন্নয়নে করোনার মধ্যেই ২০০ কোটি টাকার বেশি নতুন বিনিয়োগ করেছি।

তিনি আরও বলেন, কারখানায় উন্নত প্রযুক্তির ইতালিয়ান মেশিনারিজ স্থাপন করা হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এ বছরের মধ্যেই উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজারে দেশবন্ধু বেভারেজের বাজার প্রায় ১১ শতাংশ। কারখানার নতুন মেশিনারিজে উৎপাদন শুরু হলে আগামী বছরের মধ্যে ২৫ শতাংশ বেভারেজ বাজারের দখল নেবে দেশবন্ধু বেভারেজ।

দেশবন্ধু বেভারেজ কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক মারুফ হোসেন বলেন, দেশবন্ধু ফুড অ্যান্ড বেভারেজ দেশবন্ধু গ্রুপের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। দেশবন্ধু গ্রুপ হলো দেশ ও জনগণের বন্ধু। এ ধারণা থেকেই প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পণ্য নিয়ে জনসেবায় হাজির হচ্ছে দেশবন্ধু গ্রুপ। সামনের দিনগুলোতে আরও নতুন নতুন অনেক পণ্য দেশবাসীর সেবায় হাজির করা হবে।

তিনি বলেন, কোনো অবস্থাতেই পণ্যের মানের বিষয়ে ছাড় দেওয়া হয় না। শতভাগ কোয়ালিটি বজায় রেখে নিজস্ব কারখানায় উৎপাদন পণ্যের মাণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। দেশবাসী আমাদের প্রতি আস্থা রেখেছে। আমরা তাদের আস্থার প্রতিদান অবশ্যই দেব।

তিনি আরও বলেন, বেভারেজ তৈরিতে যেসব কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়, তার সবই আমরা অস্ট্রেলিয়া, ইতালি ও ব্রাজিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে থাকি। দেশবন্ধু বেভারেজের নিজস্ব কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে দেশবন্ধু মিনারেল ওয়াটার, দেশবন্ধু কোলা, ফ্রেন্ডস আপ, দেশবন্ধু লিচি, দেশবন্ধু জিরা, দেশবন্ধু অরেঞ্জ, দেশবন্ধু ম্যাংগো জুস, গুরু ও নিয়নসহ মোট ১৮টি ফ্লেবার। দেশবন্ধু বেভারেজে উৎপাদিত পণ্য দেশে বিক্রি ছাড়াও দুবাই, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, গ্রিসেও রপ্তানি হচ্ছে।

jagonews24

দেশবন্ধু প্যাকেজিং ও পলিমার লিমিটেডের প্রধান (বৈদেশিক বিপণন) মো. শফিউল আজম তালুকদার বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে দেশবন্ধু গ্রুপ। তৈরি করে চলেছে কর্মসংস্থান। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে আনছে বৈদেশিক মুদ্রা। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে পালন করছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

তিনি বলেন, সবসময়ের মতো বর্তমানে করোনাকালেও হাত গুটিয়ে বসে নেই। দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে অবিরাম কাজ করে চলেছে দেশবন্ধু গ্রুপ। দেশের এমন দুর্যোগময় সংকটে অবিরাম চিকিৎসাসেবাসহ ও খাদ্যজাত পণ্য উৎপাদন করে যাচ্ছে দেশবন্ধু গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো। একই সঙ্গে নিশ্চিত করছে বাজারে সরবরাহ।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি শতভাগ মেনে নিরলসভাবে কাজ করেছেন শ্রমিক-কর্মচারীসহ কর্তাব্যক্তিরা। দেশবন্ধু গ্রুপের চেয়ারম্যান দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি গোলাম মোস্তফা নিজে সার্বক্ষণিক তদারকি করে চলেছেন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা। লাভ-লোকসানের হিসাব কষে নয়, দেশব্যাপী আক্রান্ত মহামারিতে মানুষের পাশে দাঁড়াতেই ঝুঁকি জেনেও খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করছে দেশবন্ধু গ্রুপ।

এদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত গ্রুপের একমাত্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশবন্ধু পলিমার। সরেজমিনে দেখা গেছে, পলিমারের উৎপাদন কার্যক্রম বেশ গোছালো ও আন্তরিকতার সঙ্গে করছেন কর্মীরা। করোনায় সরকারের স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করছেন তারা।

jagonews24

দেশবন্ধু পলিমারের মহাব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার সাখাওয়াত হোসেন জানান, দেশবন্ধু সুগার মিলস চালু হওয়ার পর মোড়কের জন্য প্রতি বছর ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ চিনির ব্যাগ প্রয়োজন হয় সেই প্রেক্ষিতে ২০০৬ সালে দেশবন্ধু পলিমার কারখানা স্থাপন করা হয়। প্রথমে তাইওয়ানের মেশিনারি দিয়ে স্বল্প পরিসরে অর্থাৎ বার্ষিক এক কোটি ব্যাগ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন মিল স্থাপন করা হয়।

তিনি বলেন, ২০১১ সালে প্রথম সম্প্রসারণ কাজ করে উৎপাদন ক্ষমতা বার্ষিক তিন কোটি ব্যাগ উৎপাদন এর উন্নীত করা হয়। পরবর্তীতে আরও মেশিনারিজ সংযোজনের মাধ্যমে ২০১৩ ও ২০১৬ সালে আরও উৎপাদন বৃদ্ধি করে সিমেন্ট ব্যাগসহ বর্তমানে এর উৎপাদন ছয় কোটি ব্যাগে উন্নত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে দেশবন্ধু পলিমার ও দেশবন্ধু প্যাকেজিংয়ের ডব্লিউপিপি ব্যাগ, ওয়ান এবং ডাবল প্লাই সিমেন্ট ব্যাগ, বিওপিপি (সুইং এবং পেস্টিং) এবং এফআইবিসি ব্যাগ।

এমএএস/এমআরএম/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]