জেএমআই হসপিটালের বিডিং ‘তদন্ত’ করবে ডিএসই

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:০৯ পিএম, ২০ জানুয়ারি ২০২২

জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের বিডিংয়ের (নিলাম) মধ্য দিয়ে বুক বিল্ডিংয়ের নতুন পদ্ধতির দুর্বলতা বেরিয়ে এসেছে। এ নিয়ে জাগো নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেএমআই হসপিটালের বিডিংয়ের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে তদন্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।

চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি বিকেল ৫টা থেকে ১২ জানুয়ারি বিকেল ৫টা পর্যন্ত জেএমআই হসপিটালের বিডিং অনুষ্ঠিত হয়। এই বিডিংয়ে অংশ নিয়ে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের কাট-অফ প্রাইস নির্ধারণ করেন ২৫ টাকা। তবে বিডিং শুরুর দুই সেকেন্ডের মধ্যে আবেদন করেও কোনো কোনো যোগ্য বিনিয়োগকারী কোম্পানিটির শেয়ার বরাদ্দ পাননি। অর্থাৎ, মাত্র দুই সেকেন্ডেই কোম্পানিটির বিডিং শেষ হয়ে যায়।

এ নিয়ে গত ১৭ জানুয়ারি “দুই সেকেন্ডে ‘শেষ’ জেএমআই হসপিটালের বিডিং” শিরোনামে জাগো নিউজে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে বুক বিল্ডিংয়ের নতুন পদ্ধতির দুর্বলতা তুলে ধরার পাশাপাশি সমস্যা সমাধানের কিছু উপায়ও তুলে ধরা হয়।

জাগো নিউজের এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে ডিএসইর পর্ষদ সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয় বলে ডিএসইর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একইসঙ্গে জেএমআই হসপিটালের বিডিংয়ে কোনো দুর্বলতা ছিল কি না এবং আইনের কোনো লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ থেকে ব্যবস্থাপনা পর্ষদকে বিষয়টি তদন্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএসইর চেয়ারম্যান ইউনুসুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, জেএমআই হসপিটালের বিডিং নিয়ে জাগো নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি আমাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে আমরা পরিচালনা পর্ষদ সভায় আলোচনা করেছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে ব্যবস্থাপনা পর্ষদকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশের প্রেক্ষিতে জেএমআই হসপিটালের বিডিং নিয়ে তদন্তের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, জানতে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারিক আমিন ভূইয়ার সঙ্গে জাগো নিউজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

তবে ডিএসই থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং জাতীয় দৈনিকে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির নির্ধারিত শেয়ারের নিলাম নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে৷ প্রকাশিত প্রতিবেদন ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদের দৃষ্টিগোচরে এসেছে।

‘ডিএসই’র পরিচালনা পর্ষদ তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে খতিয়ে দেখার জন্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দ্রুততার সঙ্গে আইন-কানুন এবং ইএসএস সফটওয়্যারের কার্যক্রমের বিষয়ে পর্যালোচনা করেন।’

পর্যালোচনায় কয়েকটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বর্তমান বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে বিডিং -এ সর্বোচ্চ মূল্য কত হবে তা বিডিং এর পূর্বেই নির্ধারণ করা যায়। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কাট অব প্রাইসে যদি যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ করা কোটার তুলনায় আবেদন বেশি হয় তাহলে টাইম স্টাম্পিংয়ের মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হয়। শেয়ার বরাদ্দ পাওয়ার জন্য বিনিয়োগকারীদের মাঝে আগে বিড করার প্রবণতা দেখা যায়। যখন বিড করা হয় তখন বিডিং সম্পর্কিত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। বিডিং শেষ হওয়ার পর ব্যাংক রিকনসিলেশন পাওয়ার পরে কাট অব প্রাইস ডিসকভারি করার সময় বিডিং সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়।

‘ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ প্রত্যকটা বিডিং ইলেক্ট্রনিক সাবস্ক্রিপশন সিস্টেম (ইএসএস)-এর মাধ্যমে অত্যন্ত সতর্কতা ও স্বচ্ছতার সাথে পরিচালনা করে থাকে৷ এই সফটওয়্যার চালুর পর ডিএসই ৬৭টি কোম্পানির বিডিং প্রক্রিয়া অত্যন্ত সফলতার সাথে সম্পন্ন করে৷ কখনো কোনো পক্ষের কাছ থেকে কোনো ধরনের অভিযোগ আসেনি’- উল্লেখ করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।

এদিকে জেএমআই হসপিটালের বিডিংয়ের প্রেক্ষিতে দেখা দেওয়া সমস্যার বিষয়টি মৌখিকভাবে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) জানিয়েছেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ)। একইসঙ্গে বিষয়টি বিএসইসিকে লিখিতভাবে জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএসইর সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই সংগঠনটি।

এ বিষয়ে ডিবিএর সভাপতি রিচার্ড ডি’রোজারিও জাগো নিউজকে বলেন, জেএমআই হসপিটালের বিডিংয়ের প্রেক্ষিতে দেখা দেওয়া সমস্যার বিষয়টি আমরা মৌখিকভাবে বিএসইসিকে জানিয়েছি। লিখিতভাবেও জানানো হবে।

তিনি বলেন, যতগুলো পদ্ধতি হয়েছে মার্কেটের স্বার্থেই করা হয়েছে। কিন্তু পদ্ধতিগুলো অ্যাপলাই করার সময় দেখা যাচ্ছে কোনো না কোনো একটা প্রবলেম হচ্ছে। আইনগুলো তো তৈরিই হয় সংশোধনী এনে এগুলো ঠিক করার জন্য। এখন দেখা যাচ্ছে, এটাতে (বুক বিল্ডিং পদ্ধতির বিডিং) একটা সমস্যা হচ্ছে, এটাকে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। কী কী পদ্ধতি প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে এগুলোর সমাধান করা যায়, সেগুলো দেখতে হবে এখন।

তিনি আরও বলেন, তাৎক্ষণিক একটা সমাধান আছে প্রো-রাটা পদ্ধতিতে ভাগ করে দেওয়া। অর্থাৎ বিডিংয়ে যারা যারা সর্বোচ্চ দামে আবেদন করেছেন তাদের প্রত্যেককে সমানুপাতে শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া। এটা একটা পদ্ধতি, কিন্তু এটাই সঠিক পদ্ধতি না। কারণ প্রাইস বিডিংয়ের যে পদ্ধতি, তা তো হচ্ছে না এই প্রক্রিয়ায়। এখানে প্রাইস বিডিংয়ের একটি পদ্ধতি করতে হবে। যাতে সত্যিকার অর্থেই একটা প্রাইস বিড হয়, আবার এটাও দেখতে হবে যাতে সেটা মেনুপুলেট না হয়।

এদিকে ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, জেএমআই হসপিটালের বিডিংয়ে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এই টাকার শেয়ার পেতে ৩৮৫ যোগ্য বিনিয়োগকারী ১৩৯ কোটি ৭৯ লাখ ২১ হাজার ৪০০ টাকার দর প্রস্তাব করেন।

এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিটি শেয়ারে ২৫ টাকা করে ১৩৭ কোটি ৬৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকার দর প্রস্তাব জমা পড়ে। যাতে কোম্পানির কাট-অফ প্রাইস ২৫ টাকা নির্ধারিত হয়। এর মধ্যে বিডিং শুরুর দুই সেকেন্ডের মধ্যেই সর্বোচ্চ দামে ১৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার বেশি শেয়ার কেনার প্রস্তাব দেন যোগ্য বিনিয়োগকারীরা। ফলে দুই সেকেন্ডের মধ্যে আবেদন করেও কোনো কোনো যোগ্য বিনিয়োগকারী কোম্পানিটির শেয়ার পাচ্ছেন না।

বিডিংয়ে অংশ নেওয়া ৩৮৫ যোগ্য বিনিয়োগকারীর মধ্যে এক জন সর্বনিম্ন ১৬ টাকা দর প্রস্তাব করেন। এছাড়া দু’জন জন ২২ টাকা করে, দুজন ২৩ টাকা করে এবং একজন ২৪ টাকা করে দর প্রস্তাব করেন।

এর আগে গত বছরের ১৬ নভেম্বর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কোম্পানিটির বিডিংয়ের অনুমোদন দেয়। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে এই কোম্পানিটি জমি ক্রয়, ভবন তৈরি, মেশিনারিজ ক্রয়, ঋণ পরিশোধ কাজে ব্যবহার করবে।

এমএএস/এমকেআর/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]