ব্রহ্মপুত্র তীরে বাঁধ নির্মাণের ব্যয় নিয়ে অডিট আপত্তি

মফিজুল সাদিক
মফিজুল সাদিক মফিজুল সাদিক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৪৫ এএম, ০৯ আগস্ট ২০২২
নদীভাঙন রোধে নেওয়া হয় প্রকল্প

কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন ঠেকাতে চিলমারী ও উলিপুর উপজেলায় একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে চারটি অডিট আপত্তি এসেছে। ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষা অনুযায়ী এসেছে এসব অডিট আপত্তি। এতে মোট অর্থের পরিমাণ ১৯ কোটি ১ লাখ ৩১ হাজার ৪৪৩ টাকা। এছাড়া আরও উঠে এসেছে প্রকল্পের নানা ধরনের ঝুঁকি।

‘কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী ও উলিপুর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ডানতীর ভাঙনরোধ’ প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

আইএমইডির সমীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, সিসি ব্লকের সরবরাহের চেয়ে কম ডাম্পিং করার পরও পুরো বিল পরিশোধ করায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এই অর্থের পরিমাণ ৭৮ লাখ ২৪ হাজার ১০ টাকা। সিসি ব্লকের ম্যানুফ্যাকচারিং, স্টেকিং ডাম্পিং ছাড়া অনির্মিত বিল পরিশোধ করা হয়। এ খাতে অর্থের পরিমাণ ১৮ কোটি ৭ লাখ ৩১ হাজার ৮৩৯ টাকা। চুক্তিপত্রের শর্ত মোতাবেক ঠিকাদার চুক্তির বিবিধ ঝুঁকির ওপর বিমা করেননি। ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ২৪ লাখ ৩ হাজার ৪৪১ টাকা।

আএইমইডির অডিট আপত্তি প্রসঙ্গে বাপাউবো উত্তরাঞ্চলের (রংপুর) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মুহাম্মদ আমিরুল হক ভূঞা জাগো নিউজকে বলেন, অনেক সময় অডিট আপত্তি আসে। সেগুলোর জবাবও দেওয়া হয়। জবাব দিলে এগুলো নিষ্পত্তি হয়। আমি নতুন, এ বিষয়ে তেমন কিছু জানি না। প্রকল্পের পরিচালক বিষয়টি নিয়ে ভালো বলতে পারবেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় বরাবর অডিট আপত্তির জবাব দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি।

এ প্রসঙ্গে প্রকল্পের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জাগো নিউজকে বলেন, আমরা অডিট আপত্তির জবাব দাখিল করেছি। এখনো নিষ্পত্তির জবাব পাইনি। নিষ্পত্তির জন্য যেসব পেপার্স দরকার তা দিয়েছি। যথাযথ ডকুমেন্টসহ জবাব দিয়েছি। তারা যদি মনে করে এগুলো নিষ্পত্তিমূলক তাহলে নিষ্পত্তি করবে। যদি আরও তথ্য চায় তাও দেওয়া হবে। আমরা এ বিষয়ে সাপোর্ট দেই। এগুলো কিন্তু রেগুলার প্রসেস। প্রকল্প চলমান, প্রকল্প সমাপ্তির পরও প্রসেস হয়। অডিট দপ্তর থেকে বিষয়গুলো আপত্তি তোলা হয়, আমরাও জবাব দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, আপত্তি কিন্তু আইএমইডি দেয়নি। আপত্তিগুলো অডিট পরিদপ্তর থেকে দেওয়া হয়। সরকারি অডিট যারা করে তারা এই আপত্তি দিয়েছে। টাকার পরিমাণ ঠিকই আছে। নিষ্পত্তির জন্য জবাব দাখিল করেছি। বাংলাদেশের সব দপ্তরেই অডিট দেওয়া হয়, এটা সাধারণ প্রক্রিয়া।

আএইমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাঁধ নির্মাণে জিও ব্যাগ ও সিসি ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের মধ্যে কিছু অসাধু মানুষ জিও ব্যাগের বালু ফেলে দিয়ে ব্যাগগুলো নিয়ে ব্যবহার করছে বাড়ির কাজে। একইভাবে সিসি ব্লকও বেড়িবাঁধ থেকে তুলে নিয়ে বাসার কাজে ব্যবহার করছে। ফলে বেড়ে গেছে নদীভাঙনের ঝুঁকি। এছাড়া নদীতীর সংরক্ষণ কাজের নিকটবর্তী স্থানে বালু উত্তোলন, মজুত, কখনো রিভেটমেন্ট ও নদীতীরের ফুটপাত থেকে সিসি ব্লক নিজেদের কাজে ব্যবহারের ফলে তীর ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে। রেগুলেটরের নকশা অনুমোদন ও জমি অধিগ্রহণের দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের অগ্রগতিও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) অনুযায়ী প্রতি তিনমাস অন্তর একটি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। এতে প্রকল্পের কার্যক্রম বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করার বিষয়ে মনিটরিং যথাযথ হয়নি।

মূল ডিপিপির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর প্রকল্পের পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বোর্ডের অনুন্নয়ন ও রাজস্ব বাজেটে প্রাপ্ত বরাদ্দ থেকে সমন্বয় করে প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এ পরিমাণ অর্থ প্রকল্পের পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ পাওয়া যায় না। ফলে বাপাউবোকে এ অর্থ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এ পরিমাণ অর্থের জোগান ও সমন্বয় কীভাবে হবে এবং প্রকল্প শেষে কোন খাতে কত পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা ডিপিপিতে নেই ।

প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১ হাজার ৮৬৪টি সিসি ব্লক গুণগতমান ঠিক না করেই বসানো হয়। পরে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বাতিল করা হয় এগুলো।

সমীক্ষা প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, এপ্রিল ২০২২ পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৬৩ শতাংশ। অবশিষ্ট কাজ অনুমোদিত প্রকল্প মেয়াদে (৩০ জুন, ২০২৩) সম্পন্ন করা কষ্টসাধ্য। কারণ রেগুলেটরের নির্মাণকাজ এখনো শুরুই হয়নি।

নদীভাঙন ঠেকাতে কুড়িগ্রামে চলমান পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই প্রকল্পে খরচ হচ্ছে ৪৪৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এটি জানুয়ারি, ২০১৯ থেকে জুন, ২০২৩ মেয়াদে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু মূল প্রকল্পটি নির্দিষ্ট সময়ে সমাপ্ত হয়নি।

প্রকল্পের উদ্দেশ্যগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে এবং হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নিবিড় পরিবীক্ষণ করার জন্য আইএমইডি একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিযুক্ত করে। মূল ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৩০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ও প্রকল্পের সমাপ্তি জুন, ২০২২ সাল নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীসময়ে প্রকল্পের মেয়াদ একবছর বাড়িয়ে অতিরিক্ত দেড় কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ, এক কিলোমিটার বিকল্প বাঁধ নির্মাণ, একটি রেগুলেটর ও ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ পুনরাকৃতিকরণের কাজ কারিগরি কমিটির প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়। ফলে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৪৮ দশমিক ১৫ শতাংশ বাড়ে।

এমওএস/এমএইচআর/এএসএ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।