ইউরিয়ার সার প্রকল্প

ঘোড়াশাল-পলাশে ব্যয় বাড়ছে ৫ হাজার কোটি টাকা, সময় আরও দু’বছর

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৫৮ পিএম, ০৬ অক্টোবর ২০২২
ফাইল ছবি

প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিসহ নানা কারণে ৫ হাজার ৩৯ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ছে ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্পে। ১০ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা থেকে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। নতুন করে ১১ খাতে বাড়ছে ব্যয়। পাশাপাশি সময়ও বাড়ছে আরও দু’বছর। এরই মধ্যে শেষ হয়েছে অনুমোদিত মেয়াদ। এ সময়ে প্রকৃত অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৬৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। আর ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৪২৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৮০ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্পের ব্যয় মোট ৫ হাজার ৩৯ কোটি টাকা বাড়িয়ে প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। শুধু তাই নয়, সময়ও বাড়ছে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। ফলে প্রকল্প থেকে সুফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও দুই বছর। প্রকল্পটি আগামী মঙ্গলবার (১১ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য কার্যতালিকায় রাখা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।

সূত্র জানায়, প্রকল্পটির যেসব খাতে ব্যয় বাড়ছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো— রেললাইন স্থাপনে ২৬১ কোটি টাকা, গ্যাসলাইন স্থাপনে ৭০ কোটি টাকা এবং আয়কর (জেনারেল কন্ট্রাকটরদের) ১ হাজার ৯১৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এছাড়া আমদানি ভ্যাট হিসাবে ৮৮ কোটি ৬৬ লাখ, গ্যাস বিল ১৬২ কোটি ৪৪ লাখ, মেশিনারি তেল ১৯ কোটি এবং কেমিক্যাল খাতে ৪৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বাড়ছে। আরও বাড়ছে অনাবাসিক ও আবাসিক ভবন নির্মাণে ২০৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। কারখানার জন্য ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতির জন্য ২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। রাস্তা তৈরিতে ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র খাতে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় বাড়বে।

প্রকল্পটিতে ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) মো. নূরুল আলম বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীন ও জাপানের নামকরা কোম্পানি কাজ করছে। বিডার্স ফাইন্যান্সিং হিসাবে জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), ব্যাংক অব টোকিও মিটসুবিশি ইউএফজে লিমিটেড এবং হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন লিমিটেড (এইচএসবিসি) অর্থায়ন করছে। টাইমলাইন অনুযায়ী বাস্তবায়নের কাজ চলছিল। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে এক বছর পিছিয়ে যায়। সেইসঙ্গে রেললাইনসহ নতুন কিছু আইটেম যোগ করতে হয়েছে। সবকিছু মিলে প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ছে। তবে আশা করছি, বর্ধিত মেয়াদের আগেই এটি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

সূত্র জানায়, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ছিল ১০ হাজার ৪৬০ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১ হাজার ৮৪৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা এবং বিডার্স ফাইন্যান্সিং হিসাবে ৮ হাজার ৬১৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এখন প্রথম সংশোধনীতে এসে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ২১ লাখ টাকা। এছাড়া অনুমোদনের সময় প্রকল্পটি ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু সংশোধনী প্রস্তাবে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় বিদ্যমান ঘোড়াশাল ইউরিয়রা ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি এবং পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানির কাছেই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রকল্প সংশোধনের কারণ জানিয়েছে বিসিআইসি। সংস্থাটির পক্ষ থেকে প্রকল্প সংশোধনী প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত কারণে ঋণচুক্তি বিলম্বিত হওয়ায় বাণিজ্যিক চুক্তির ইফেক্টিভ কন্টাক্ট বিলম্বে কার্যকর হয়েছে। এছাড়া কাস্টমস ডিউটি (সিডি) ভ্যাট, রেললাইন স্থাপন, বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপন, লোন ব্যবস্থাপনা ফি, ইন্স্যুরেন্স ও রেজিস্ট্রেশন ফি, কেমিক্যাল পণ্য, মেশিনারিজের জন্য লুব্রিকেন্ট ও ট্রায়াল রানের জন্য গ্যাস ক্রয় এবং আবাসিক ভবননির্মাণ বাবদ ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। সেইসঙ্গে নতুন করে জেনারেল কন্ট্রাকটারদের আয়কর (চুক্তি অনুসারে), সরকারি বিভিন্ন লাইসেন্স ফি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, অডিট ফি ও অনুষ্ঠান খাত সংযোজন, অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুসারে ইকোনমিক কোড বা সাব কোড হালনাগাদকরণ এবং করোনাভাইরাস মহামারির কারণে কারখানা সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি আমদানিতে দেরি হয়েছে। পাশাপাশি বেশকিছু খাতে ব্যয় কমেছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—সিভিল কাজের ট্যাক্স কমেছে ৫০ কোটি টাকা। আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন সংস্কার খাতে কমেছে ৬৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা এবং দেশি-বিদেশি পরামর্শক খাতে কমেছে সাড়ে ৭ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দৈনিক ২ হাজার ৮০০ টন ও বার্ষিক ৯ লাখ ২৪ হাজার ইউরিয়া সার উৎপাদন করা যাবে। এটি আধুনিক নতুন, জ্বালানিসাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব কারখানা হবে। ফলে কৃষি উৎপাদন তথা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। সেইসঙ্গে সুলভমূল্যে কৃষকদের সার সরবরাহ ও ইউরিয়া আমদানি ব্যয় কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা যাবে। এসব বিবেচনায় প্রকল্পটির সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে— প্রকল্পের মাধ্যমে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় বিদ্যমান দুটি ইউরিয়া সার কারখানা যথাক্রমে ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেড ও পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেডে দৈনিক ২৮০০ মেট্রিক টন ও বার্ষিক ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন গ্রানুলার ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে ইউরিয়া সারের চাহিদা মিটানো এবং সুলভমূল্যে কৃষকদের সার সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, দেশে ইউরিয়া সারের আমদামি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।

প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে বলা হয়েছে— এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিদিন ২৮০০ মেট্রিক টন (বার্ষিক ১ লাখ ২৪ হাজার মে. টন) গ্র্যানুলার ইউরিয়া উৎপাদন সম্ভব হবে। ৯৬৮ জন কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং বাৎসরিক আনুমানিক ১০৭৫ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।

প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে— দৈনিক ২৮০০ মেট্রিক টন গ্রানুলার ইউরিয়া সার উৎপাদন, যন্ত্রপাতি বা ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহ ও স্থাপন, সার কারখানার রেললাইনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও রেললাইন নির্মাণ, সার কারখানা স্থাপনের জন্য ভূমি উন্নয়ন এবং অন্যান্য পূর্ত ও নির্মাণকাজ, রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার, নতুন আবাসিক ও অনাবাসিক ভবননির্মাণ, জেটি নির্মাণ, সার সংরক্ষণের জন্য গোডাউন নির্মাণ, কাস্টমার মিটারিং স্টেশন নির্মাণ, দুইটি বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন স্থাপন, যানবাহন ক্রয় বা সংগ্রহ, দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ, প্রি-কমিশনিং, কমিশনিং ও পারফরমেন্স গ্যারান্টি টেস্ট রান, কম্পিউটার ও এক্সেসরিজ, অফিস সরঞ্জামাদি এবং আসবাবপত্র ক্রয়।

এমওএস/এমএএইচ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।