বুলিংয়ের ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষকে লিগ্যাল নোটিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৪৫ পিএম, ২২ অক্টোবর ২০১৯

বুলিংয়ের শিকার এক অভিভাবকের অভিযোগের ভিত্তিতে ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকার (আইএসডি) প্রিন্সিপাল ডিরেক্টর টি জে কোবরানকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন ব্যারিস্টার হাসান আজিম। এ বিষয়ে স্কুলের হেড অব সেকেন্ডারি ইলডিকো মুরে বুলিংয়ের শিকার শিশুটির সাহায্যে এগিয়ে না এসে বরং অপমানজনক আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর স্কুল থেকে ঝরে পড়া নিশ্চিত করেছেন বলে অভিযোগ অভিভাবকের।

২০১৭ সালে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী সহপাঠীদের বুলিংয়ের শিকারের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। বিভিন্ন সময় সন্তানের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে বুলিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন ওই শিশুর মা সালমা খানম। তবে ঘটনার প্রতিকার না করে বরং নির্যাতিত শিশুটিকেই দোষারোপ করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। একসময় স্কুল থেকে ঝড়ে পড়ে শিশুটি।

এ প্রেক্ষিতে সন্তানের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির জন্যে আইএসডি স্কুল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে ৮৫ কোটি টাকা (১০ মিলিয়ন ইউএস ডলার) ক্ষতিপূরণ দারি করেছেন অভিভাবক দম্পতি। অনাদায়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলা হয়েছে নোটিশে।

লিগ্যাল নোটিশে জানানো হয়, ২০১৭ সালে স্কুল থেকে শিক্ষা সফরে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় ওই গ্রেডের শিক্ষার্থীদের। সেই ভ্রমণে সহপাঠীরা শিশুটির শরীরের আকার এবং ত্বক নিয়ে তার সঙ্গে আপত্তিজনক ব্যবহার এবং অপমানজনক বাক্য ব্যবহার করে। যা তার মনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে এবং অসুস্থ করে তোলে। ধারাবাহিক বুলিংয়ের শিকার হওয়ার ফলে শারীরিক শিক্ষা এবং সাঁতারের ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দেয় সে। একসময় এর ফলে মাথা ব্যথা, বমি এবং দীর্ঘমেয়াদে অসুস্থ হয়ে পড়ে সে এবং নিজেকে সব কিছু থেকে গুঁটিয়ে নেয়।

সন্তানের এই অসুস্থতার প্রেক্ষিতে সালমা খানম বেশ কয়েকবার স্কুল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান এবং যে সহপাঠীরা তাকে উত্ত্যক্ত করে, তাদের বিষয়ে তথ্য দেন। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে না নিয়ে বরং সেই সহপাঠীদের সঙ্গেই তাকে ক্লাস করতে বাধ্য করেন। এমনকি হেড অব সেকেন্ডারি, ইলডিকো এ ঘটনা জানার পরও কোনো ধরনের সহমর্মিতা দেখাননি। বরং ঘটনার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার জন্যে বলেন।

বুলিংয়ের শিকার হতে হতে এক পর্যায়ে শিশুটি বিমর্ষ, স্কুলে যেতে ভয় পাওয়া ও গ্রেড নেমে যেতে থাকে। কর্তৃপক্ষ তার অসুস্থতা এবং অস্বস্তির বিষয়টি জেনেও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং অভিভাবককে ধারাবাহিকভাবে একাডেমিক কনসার্ন লেটার পাঠান।

কয়েকজন সহপাঠী এবং হেড অব সেকেন্ডারির এ ধরনের আপত্তিজনক ব্যবহার মেনে নিয়েও শিশুটি যখন আবারো স্কুলে যাওয়া শুরু করে তখন ঘটলো সবচেয়ে ঘৃণ্যতম ঘটনা। চলতি বছরের গত ১৪ মে স্কুলের হেড অব সেকেন্ডারি ইলডিকো কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই শিশুটির উপস্থিতিতে তার অভিভাবককে বলেন, এই শিক্ষার্থী অষ্টম গ্রেডে উঠতে পারবে না এবং আইএসডিতে থাকতে পারবে না। বরং তাকে বিদেশে কোনো আবাসিক স্কুলে ভর্তি করানোর পরামর্শ দেয়া হয়। এই ঘটনায় শিশুটি আরও বেশি আঘাত পায় এবং পুরোপুরি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে। পরিবারেও শিশুটি নিজেকে গুটিয়ে নেয়, অস্বাভাবিক আচরণ এবং আত্মহত্যার হুমকি দেয়।

বুলিং এতোটাই ঘৃণ্যতম পর্যায়ে পৌঁছে যে শিশুটি আত্মপরিচয় সংকটে ভুগতে থাকে এবং পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে সালমা খানম বলেন, বিষয়টি বারবার স্কুল কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছি। কিন্তু তারা কোনো গুরুত্বই দেয়নি। বরং তাদের আচরণে মনে হয়েছে এ ধরনের অপরাধকে প্রশ্রয় দিয়েছে। বিচার চেয়ে এবং সন্তানের শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ চেয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষকে উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। কোনো ব্যবস্থা না নেয়া হলে মামলা করা হবে।

এ বিষয়ে ব্যারিস্টার হাসান আজিম বলেন, বুলিং বাচ্চাদের মনে বিরূপ প্রভাব এবং মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অ্যান্টি বুলিং নীতি থাকতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে এর রূপ হবে র‌্যাগিংয়ের মতো ভয়াবহ। এ ক্ষেত্রে বুলিং যারা করছে এবং যারা শিকার হচ্ছেন সব শিশুকেই কাউন্সিলিংয়ের অধীনে আনতে হবে।

শিশুদের বুলিংয়ে যে কতটা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, সে বিষয়ে ব্যারিস্টার মাহিন এম রহমান বলেন, গত বছরই ভিকারুন নিসা নূন স্কুলের শিক্ষার্থী অরিত্রির আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল তার অভিভাবককে তার সামনে অপমান করায়। এখানে হেড অব স্কুল ইলডিকো ওই একই অপরাধ করেছেন। সন্তানের সামনে বাবা মার কাছে নালিশ করেছেন। যেখানে শিশুরা নিজেদের অপরাধী ভাবতে শুরু করে এবং আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর সিদ্ধান্তে পৌঁছে। অথচ এখানে স্কুল কর্তৃপক্ষেরই শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর কথা ছিল। এ স্কুলের বিরুদ্ধে আগেও এ ধরনের অভিযোগ ছিল।

তিনি আরও বলেন, বুলিং একটি অপরাধ। এর প্রতিকার না করে যদি প্রশ্রয় দেয়া হয়, সেটি পরবর্তীতে বড় আকার ধারণ করে। বুলিংকারী শিশুটিই বড় হয়ে র‌্যাগিংয়ের চর্চা করবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির প্রিন্সিপাল ডিরেক্টর টি জে কোবরান বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানে বুলিং বিষয়ে কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। এ ধরনের ঘটনা নিয়ে এক অভিভাবক আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। যথাসময়ে এর উত্তর দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এমএইচএম/এএইচ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]