ক্ষুদে ভোটারদের বড় ভোট উৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৩৬ পিএম, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের পর এবার নির্বাচনী উৎসবে সামিল হলো সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা। লক্ষ্য স্টুডেন্টস কাউন্সিল নির্বাচন। তবে এটি কেবল নির্বাচন নয়, যথারীতি এ যেন নির্বাচনী উৎসব। আর এই উৎসবে সামিল হতেই রোববার বিদ্যালয়ে এসেছিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৭৭ লাখ ক্ষুদে ভোটার। শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখরিত ছিল রাজধানীসহ সারাদেশের ৬৩ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সকালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পা রেখেই তারা মেতে ওঠে উল্লাসে। নিজ নিজ স্কুলে নির্বাচনী উৎসবে সামিল হয়ে শিশুরা নিজেরাই ভোট দিয়ে নির্বাচন করে নিজেদের প্রতিনিধি।

নির্বাচন কমিশনার, প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছে শিশুরাই। শৃঙ্খলা রক্ষায় কেউ কেউ হয়েছে র্যাব, পুলিশ, আনসার বাহিনীর সদস্য। সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রতিটি বিদ্যালয়ে ৭ জন করে প্রার্থী নির্বাচিত হলো; যেখানে প্রার্থী ছিল ৮ লাখ ২৭ হাজার ৫৯৫ জন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর জানিয়েছে, প্রায় ৯৫ শতাংশ উপস্থিতি ছিল ব্যতিক্রমী এই উৎসবে।

অধিদফতর জানিয়েছে, শিশুকাল থেকে গণতন্ত্র চর্চা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধাশীল হওয়া, অন্যের প্রতি সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি, ঝরেপড়া রোধে সহযোগিতার লক্ষ্যে প্রাথমিকেও স্টুডেন্টস কাউন্সিল গঠনের গুরুত্ব অপরিসীম। ২০১০ সাল থেকে দেশের ১৯টি জেলার ২০টি উপজেলার ১০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে স্টুডেন্টস কাউন্সিল গঠন করা হয়। এরপর ২০১৩ সাল থেকে সারাদেশের সকল উপজেলা/থানার সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ নির্বাচন চালু করা হয়। এতে স্থানীয় জনসাধারণ, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিপুল আগ্রহ ও উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করে।

রোববার দেশের ৬৩ হাজার ৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্টুডেন্ট কাউন্সিল নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে ভোটগ্রহণ চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ শেষে বিকেলে ফল ঘোষণা করা হয়। এ নির্বাচনে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে পারে। মোট ভোটারের সংখ্যা ৭৬ লাখ ৬২ হাজার ৩৫২ জন। আর প্রার্থীর সংখ্যা ৮ লাখ ২৭ হাজার ৫৯৫ জন। তাদের মধ্যে ৪ লাখ ৪১ হাজার ২৮ জনকে ভোটের মাধ্যমে স্টুডেন্ট কাউন্সিল প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করে। রাজধানীতে বেশ কয়েকটি স্কুলের নির্বাচন পরিদর্শন করেছেন প্রাথমিক শিক্ষা সচিব আকরাম আল হোসেন ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. ফসিউল্লাহসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।

মহাপরিচালক নির্বাচনী উৎসবে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, আসলেই এটা নির্বাচনের চেয়ে বেশি কিছুই। এটা যেন নির্বাচনী এক উৎসব। শিশুরা নির্বাচনী উৎসবে সামিল হয়ে ভোট দিয়ে গঠন করেছে স্টুডেন্টস কাউন্সিল। এইযে ছোট ছোট শিশু কিশোররা সারাদেশে অত্যন্ত সুন্দরভাবে উৎসবের মধ্য দিয়ে নির্বাচন করে ফেলল, কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি। সারাদেশ থেকেই ভালো সারা মিলেছে। শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা বিষয়টিকে নিয়েছে অত্যন্ত সুন্দরভাবে।

jagonews24

জানা গেছে, এ নির্বাচনে মুদ্রিত কোনো পোস্টার ও প্রতীক ব্যবহার করা হয় না। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সাত দিনের মধ্যে সভা করে নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন, প্রতি শ্রেণী কক্ষে দু'জন করে সহযোগী সদস্য মনোনীত এবং এক বছরের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবে।

প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে ভর্তির হার বৃদ্ধি, ঝরে পড়া রোধ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, শিশুদের মাঝে গণতন্ত্র চর্চা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, অন্যের মতামতের প্রতি সহিষ্ণুতা এবং শ্রদ্ধা প্রদর্শন, বিদ্যালয়ের শিখন শিখানো কার্যক্রমে শিক্ষকদের সহায়তা এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এই আয়োজনের লক্ষ্য।

সকালে রাজধানীর মহাখালীর আব্দুল হামিদ দর্জি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, আনন্দঘন পরিবেশে ছাত্র পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা ভোট দিচ্ছে। প্রার্থীরাও উৎসবে সামিল হয়ে ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছেন।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ফায়দাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের আগ্রহে খুশি প্রধান শিক্ষক বদরুল আলম। খুশি অভিভাবক ও স্কুল ব্যাবস্থাপনা কমিটির সদস্যরাও। প্রধান শিক্ষক বদরুল আলম বললেন, এই আয়োজন শিশুদের নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করবে। আমার শিশুরা অত্যন্ত খুশি। আবার অনেক শিক্ষকই মনে করছেন এর ফলে শিশুদের ক্ষতিও হতে পারে।

তাদের মতে, স্টুডেন্ট কাউন্সিলের নির্বাচনের নাম করে ছোট ছোট এই শিশুদের মাঝে 'রাজনীতির বিষফোঁড়া' ঢোকানো হচ্ছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। শিশুরা এই নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানালেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সভা করে নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করবে। নির্বাচিত ছাত্র পরিষদের মধ্যে কেউ দেখবে শিক্ষা, কেউ দেখবে স্কুলের পরিবেশ, কেউ দেখবে আইনশৃঙ্খলা ও খেলাধূলার সকল বিষয়। নির্বাচিতদের একজন হবে প্রধানমন্ত্রী। সহযোগী প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিতদের একজন থাকবে ছাত্র ও একজন ছাত্রী।

এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি মাধ্যমিক ও দাখিল মাদরাসায় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠন করা হয় স্টুডেন্টস কেবিনেট। সেই নির্বাচনী উৎসবে দেশের ২২ হাজার ৯২৬টি শিক্ষা মাধ্যমিক স্কুল ও মাদ্রাসায় গঠন করা হয়েছে মন্ত্রিসভা।

এমএইচএম/এনএফ/এমকেএইচ