প্রায় শতবর্ষ ধরে নারী শিক্ষার আলোকবর্তিকা মুক্তকেশী উচ্চ বিদ্যালয়

মাটির ঘর থেকে মুক্তকেশী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এখন তিনতলা ভবনে

প্রায় দুই ফুট পুরু মাটির দেয়ালের ঘর। তার ওপর ভাঙাচোরা টিনের চাল। দেয়ালের মাটি খসে পড়েছে। ঘুণপোকার কারণে কাঠের দরজা-জানালাও আছে কেবলই অবয়বে। এ অবস্থায় কোনোভাবে দাঁড়িয়ে আছে জরাজীর্ণ ঘরটি। পরিত্যক্ত এ ঘরই শত বছরের গৌরবের সাক্ষী। এই ঘরটিতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এতদাঞ্চলের মফস্বলের নারীদের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মুক্তকেশী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। যদিও কালের পরিক্রমায় সেই ঘর ছাড়িয়ে কলেবর বেড়েছে নারী শিক্ষার এ বাতিঘরের।

১৯২৮ সাল। উপমহাদেশে তখন চলছে ব্রিটিশ শাসন। চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বর্তমান আমুচিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম ধরলা। সেখানে বাস করতেন সম্পদশালী এক নারী। নাম মুক্তকেশী দেবী। ১১ পুত্র ও ৪ কন্যার এই জননীকে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী দেয় রত্নগর্ভা উপাধি। কারণ ১১ পুত্রকেই তিনি উচ্চশিক্ষিত করেছিলেন। তাদের কেউ ম্যাজিস্ট্রেট, কেউ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, কেউ আইনজীবী, কেউ চিকিৎসক, আবার কেউ প্রকৌশলী হয়েছিলেন। এমনকি একজন হয়েছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক, একজন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকও হয়েছিলেন। এদের মধ্যে মুক্তকেশী দেবীর অষ্টম সন্তান সুবীমল দত্ত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার।

jagonews24

বাঁয়ে মুক্তকেশী দেবী, ডানে তার প্রথম সন্তান রেবতী রমণ দত্ত

তবে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা মুক্তকেশী দেবীর চার কন্যাকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে দেয়নি। এই ‘আক্ষেপ’ থেকেই মুক্তকেশী দেবী তার বড় সন্তান ব্রিটিশ আমলের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রেবতী রমণ দত্তকে নারীদের জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার নির্দেশ দেন। মায়ের নামে তাই রেবতী রমণ ১৯২৮ সালে গড়ে তোলেন ‘মুক্তকেশী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’। মুক্তকেশী দেবীর সাড়ে চার একর জমির ওপর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়৷ একটি মাটির ঘরে গড়ে তোলা হয় এই বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিকক্ষ।

মুক্তকেশীর প্রয়াণের পর তার সন্তানদের সবাই পাড়ি জমান ভারতে। কিন্তু রয়ে যায় বিদ্যালয়টি। ছড়াতে থাকে শিক্ষার আলো। পাঠ নিতে থাকে প্রত্যন্ত এ এলাকার সব ঘরের কন্যারা।

এরই মধ্যে বিদ্যালয়টির জমির অধিকাংশ চলে যায় সরকারের অধীনে। এখন এসব জমি সরকারি ‘ক তফসিল’ভুক্ত হওয়ায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পড়েছে বিপাকে। মামলা চালাতে গিয়ে খরচ হচ্ছে বিদ্যালয়ের বিপুল অর্থ।

jagonews24

পরিত্যক্ত এই ঘরই শত বছরের গৌরবের সাক্ষী

১৬ বছর ধরে অবহেলিত এ বিদ্যালয়কে আগলে রেখেছেন আমুচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান কাজল দে। তার হাত ধরেই গত ১০ বছরে এই বিদ্যালয়ে গড়ে উঠেছে একাধিক সুরম্য ভবন, পুকুরের সুপরিসর ঘাট, সীমানা দেয়াল, বিজ্ঞানাগার ও লাইব্রেরি।

বিদ্যালয়টির শ্রেণিকক্ষগুলোতেও লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে ক্লাস করেন এখানকার ছাত্রীরা। প্রায় ৫০০ ছাত্রীর এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নামমাত্র বেতন দিয়ে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। বাবা-মায়ের আয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয় ছাত্রীদের বেতন। সর্বনিম্ন ৩০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭০ টাকা ফিতে এখানে আধুনিক ও প্রযুক্তিসম্পন্ন শিক্ষা মেলে। আবার আবেদনসাপেক্ষে বিনা বেতনেও পড়ছেন কেউ কেউ।

সম্প্রতি বিদ্যালয়টি ঘুরে দেখা যায়, প্রবেশপথেই দৃষ্টিনন্দন তোরণ। স্কুল ভবনের সিঁড়িতে পা রাখার আগেই চোখে পড়বে টাইলসে মোড়ানো পরিচ্ছন্ন ওয়াশ ব্লক। ছাত্রীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারও। নিচতলায় বিদ্যালয়টির ১২ জন শিক্ষকের জন্য প্রশস্ত মিলনায়তন। দ্বিতীয় তলায় উঠলেই দেখা মিলবে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের। প্রত্যেক ক্লাস রুমেই একটি করে কম্পিউটার ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর রয়েছে। আমুচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল দে এ ক্লাসরুমগুলো ডিজিটাল করার অর্থায়নকারী।

jagonews24

কালের পরিক্রমায় অবয়ব বেড়েছে মুক্তকেশী উচ্চ বিদ্যালয়ের

বিদ্যালয়টির পাশেই রয়েছে বিশাল অডিটোরিয়াম। আবার মূল ফটকের পাশেই রয়েছে বিজ্ঞানাগার ও লাইব্রেরি। যেটুকু জমি এখন বিদ্যালয়ের দখলে আছে, সেটুকু জমিতে চেয়ারম্যান কাজল দের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে সীমানাপ্রাচীর। তার পাশেই আছে পাকা ঘাট সম্বলিত বিশাল পুকুর।

বিদ্যালয়টির দশম শ্রেণিতে পড়ে বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ার কৃষক পরিবারের সন্তান মুন্নী তালুকদার। জাগো নিউজকে এ কিশোরী বলে, ‘চমৎকার পরিবেশে আমাদের পড়াশোনা হয় এখানে। ডিজিটাল ক্লাসরুম, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, ওয়াশ ব্লকের কারণে আমাদের স্কুলের পরিবেশ অন্য স্কুলের চেয়ে আলাদা। খুব অল্প বেতনে আমরা এখানে পড়ি।’

বিদ্যালয়ের কোন বিষয় সবচেয়ে ভালো লাগে—এমন প্রশ্নের জবাবে মুন্নী তালুকদার বলে, ‘শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পাঠদান ও আদরমাখা আচরণ আমাদের বেশি ভালো লাগে।’

jagonews24

প্রায় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৫০০ ছাত্রী পড়াশোনা করে

১০ বছর ধরে মুক্তকেশী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বপালনকারী আমুচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল দে জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ বিদ্যালয় অত্র অঞ্চলে নারী শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়েছে। আমাদের আবেগ-অনুভূতির জায়গা এ বিদ্যালয়। আমরা সবাই মিলে এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছি।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূপুর কান্তি চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৫০০ ছাত্রী পড়াশোনা করে। উপমহাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে নারীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রথম বিদ্যালয় এটি। বিদ্যালয়টি ডিজিটালে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া চলছে৷ ইতোমধ্যে স্থানীয় চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় আমরা ক্লাসরুমগুলো ডিজিটাল করতে পেরেছি। তবে আমাদের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে বিদ্যালয়ের জমি উদ্ধারে। আট বছর ধরে আমরা আদালতে ঘুরছি জমি ফিরে পেতে। এজন্য বিদ্যালয়ের অনেক টাকাও খরচ হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, আমাদের বিদ্যালয়ের জায়গাগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে দ্রুত এ সংকট কেটে যাবে।’

মিজানুর রহমান/এইচএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]