‘শাবিপ্রবির সংকট সমাধানে সময়ক্ষেপণের আর সুযোগ নেই’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৩৪ পিএম, ২৩ জানুয়ারি ২০২২
ছবিতে বাঁ থেকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ও গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু

শান্তির ক্যাম্পাসে অশান্তির বাতাস। অ্যাম্বুলেন্সের মুহুর্মুহু সাইরেনে প্রকম্পিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনা। তীব্র শীত আর ঘনকুয়াশায় অনশনরত শিক্ষার্থীদের অনেকেই অসুস্থ। গুরুতরদের নেওয়া হচ্ছে হাসপাতালে। অন্যদের হাতে স্যালাইনের ক্যানোলা পরানো। তবু ভাঙেনি পণ। ১০ দিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবির আন্দোলনে পুলিশ এবং ছাত্রলীগের হামলার পর এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যেরই পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ, মোমবাতি প্রজ্বলন থেকে আন্দোলন গড়িয়েছে আমরণ অনশনে। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও সংহতি প্রকাশ করেছে। সংহতি প্রকাশ করেছে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও একাংশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে যৌক্তিক মনে করে অনেকে সরব হয়েছেন।

অনশনরত শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও পরিস্থিতি সামলে আনতে সরকার নির্বিকার বলে অভিযোগ উঠেছে। আজ রোববার (২৩ জানুয়ারি) জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে আলোচনা হয় এবং শিক্ষামন্ত্রীর ভূমিকার সমালোচনা করা হয়।

শাবিপ্রবির এ সংকট প্রসঙ্গে জাগো নিউজ কথা বলেছে লেখক-গবেষক ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপুর সঙ্গে।

jagonews24আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এবার শাবিপ্রবি উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা/ছবি: জাগো নিউজ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘বিশ্ববিদ্যালয়কে রাষ্ট্র-সমাজের ভরসার জায়গা’ উল্লেখ করে বলেন, শাবিপ্রবিতে এ পর্যন্ত যা হলো, তা অত্যন্ত বেদনার। সরকারের উদাসীনতার কারণেই এমন হচ্ছে। যতটুকু জানতে পেরেছি, শিক্ষার্থীরা প্রথমে যৌক্তিক একটি দাবি নিয়ে আন্দোলনে নামে। পরে সেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ-ছাত্রলীগ হামলা  করে। এটি দুঃখজনক এবং বছরের পর বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাই-ই হয়ে আসছে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনুগতদের উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়। উপাচার্যরাও সরকারকে রক্ষা করতে মরিয়া। অনেকটাই বিনিময়। আর এমনটি হচ্ছে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংসদ না থাকায়। ছাত্র সংসদ না থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক জীবন গড়ে ওঠে না। বস্তুর মতো একটি জীবন গড়ে থাকে। প্রশাসনের কোনো জবাবদিহি নেই। শিক্ষার্থীরা তাদের কথা বলার জন্য কোনো প্লাটফর্ম পায় না। আজকের যে সংকট, তা ছাত্র সংসদ না থাকার কারণেই। সমাজ, রাজনীতির জন্য নেতৃত্ব গড়ে ওঠার কথা যেখানে, সেখানেও চরম ঘাটতি রয়েছে।’

‘সুতরাং শাবিপ্রবির আজকের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে ভুল হবে। সামগ্রিক জায়গা থেকে এই সংকটকে বিবেচনা করতে হবে’—বলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

শিক্ষার্থীদের দাবিকে গুরুত্ব দিলেই সমাধান ত্বরান্বিত হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষের অবশ্যই বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে। শীতের মধ্যে শিক্ষার্থীরা গণঅনশনের ডাক দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘শাবিপ্রবির সংকট সমাধানে সময়ক্ষেপণের আর সুযোগ নেই। কারণ শিক্ষার্থীরা গণঅনশনের ডাক দিয়েছে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনই মূল্যবান। একটু অবহেলায় অঘটন ঘটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের কোনো যৌক্তিক দাবি এড়িয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। অবশ্যই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সিলেটের সাধারণ মানুষও একাত্মতা ঘোষণা করছেন। এই বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট মহল আমলে নেবে বলে বিশ্বাস করি।’

অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু বলেন, ‘একজন শিক্ষকের প্রধানতম গুণ সহানুভূতি আর সংহতি। শিক্ষার্থীরা হচ্ছে সন্তানের মতো। পিতা কখনোই চাইবেন না, শীতের মধ্যে সন্তানেরা অনশনে থাকুক। আমি একজন শিক্ষক হিসেবে অবশ্যই বেদনা অনুভব করছি। আমি মনে করি, বড় ধরনের ফারাক তৈরি হয়ে গেছে শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের। এটি স্বীকার করতেই হবে। নানা কারণেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যকার দূরত্ব বেড়েছে। আর আজকের যে সংকট, তার জন্য এই দূরত্ব একটি কারণ।’

jagonews24উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে শনিবার রাতে শাবিপ্রবিতে মোমবাতি প্রজ্বলন করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা/ছবি: জাগো নিউজ

‘আবার এমন আন্দোলন ভিন্নখাতেও প্রবাহিত হতে দেখা যায়। এর প্রমাণও আছে। সে দিকটাও নজরে রাখা জরুরি’—সতর্ক করেন রাবি উপাচার্য।

৩৪ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শাবিপ্রবির উপাচার্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে খবর ছড়িয়েছে, যদি খবর সত্য হয়, এর কী কারণ? জানতে চাইলে গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু বলেন, ‘উপাচার্যদের সভায় আমিও ছিলাম। কিন্তু এমন কথা আমার জানা নেই। এটি কীভাবে ঘটলো, তাও আমি জানি না। এ বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। আমি এমন কোনো বিবৃতিতে স্বাক্ষরও করিনি।’

তবে শাবিপ্রবির ঘটনায় তিনি মর্মাহত জানিয়ে রাবি উপাচার্য বলেন, ‘এই সংকটের আশু সমাধান হওয়া দরকার। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যকার দূরত্ব কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষ ও সহকারী প্রাধ্যক্ষদের পদত্যাগ, হলের অব্যবস্থাপনা দূর করে সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত এবং ছাত্রীবান্ধব ও দায়িত্বশীল প্রাধ্যক্ষ কমিটি নিয়োগের দাবিতে ১৩ জানুয়ারি রাতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা।

১৬ জানুয়ারি চতুর্থ দিনের মতো আন্দোলন চলছিল। বিকেলের পর থেকে উত্তপ্ত হয়ে পড়ে ক্যাম্পাস। দাবি আদায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া আইআইসিটি ভবনে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে অবরুদ্ধ করে রাখেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তারা ভবনের কলাপসিবল গেটে তালা লাগিয়ে দেন। তখন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের তালা খুলে দিতে বলেন। জবাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়ান শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করলে তারাও পাল্টা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন। প্রায় ২৫ মিনিট উভয় পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

jagonews24উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে ১৯ জানুয়ারি থেকে অনশন করছেন শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা/ছবি: জাগো নিউজ

শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পুলিশ। পরে শিক্ষার্থীরা সরে গেলে তালা ভেঙে প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর উপাচার্যকে উদ্ধার করে পুলিশ তার বাসভবনে নিয়ে যায়। এর আধাঘণ্টা পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।

সেদিন থেকেই আগের দাবির সঙ্গে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিও যুক্ত করেন। ১৯ জানুয়ারি থেকে তারা শুরু করেছেন আমরণ অনশন। এর মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থও হয়ে পড়েছেন। তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

সংকটের সমাধানে শনিবার (২২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি তার বাসভবনে শিক্ষক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি ব্রিফিংয়ে শিক্ষার্থীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। এরপর গভীর রাতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও ভার্চুয়ালি আলোচনা করেন শিক্ষামন্ত্রী। কিন্তু আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।

রোববার সন্ধ্যার পর শিক্ষার্থীরা উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদের বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এএসএস/এইচএ/জিকেএস

শাবিপ্রবির সংকট সমাধানে সময়ক্ষেপণের আর সুযোগ নেই। কারণ শিক্ষার্থীরা গণঅনশনের ডাক দিয়েছে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনই মূল্যবান। একটু অবহেলায় অঘটন ঘটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের কোনো যৌক্তিক দাবি এড়িয়ে ভালো কিছু হতে পারে না

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]