ইউজিসির প্রতিবেদন

অনিয়মে জর্জরিত ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, অপসারণের সুপারিশ

মুরাদ হুসাইন
মুরাদ হুসাইন মুরাদ হুসাইন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:১৪ এএম, ১০ আগস্ট ২০২২
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে ইউজিসির তদন্ত কমিটি

ঢাকার মোহাম্মদপুরের বছিলায় অবস্থিত ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপাচার্য (ভিসি) হিসেবে ২০১৫ সালের ৪ জানুয়ারি যোগ দেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আহসান উল্লাহ। এরপর ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে মেয়াদ শেষ হলে সরকার তাকে দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ দেয়। দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে আহসান উল্লাহর বিরুদ্ধে আসতে থাকে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ। তদন্ত করে সেসব অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ভিসির অপসারণসহ বেশকিছু সুপারিশও করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আহসান উল্লাহর বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের হেনস্তা, নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতিসহ রয়েছে বেশকিছু অভিযোগ। এছাড়া উপাচার্যের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত একাধিক অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি ইউজিসি থেকে এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেই প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে উপাচার্যের দেওয়া সব নিয়োগ-পদোন্নতি বাতিলের। একই সঙ্গে উপাচার্য আহসান উল্লাহকে অপসারণেরও সুপারিশ করা হয়েছে।

তবে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে উপাচার্য দাবি করেন, প্রশ্ন তৈরির জন্য এসব শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভিসি হওয়ার পর ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় ও স্বজনপ্রীতি করেছেন আহসান উল্লাহ। সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন তার নিজের এলাকা চট্টগ্রাম থেকে। পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে গিয়ে বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করেছেন। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই দিয়েছেন নিয়োগ। আবার যাদের নিয়োগ দিয়েছেন তাদের মধ্যে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১০-১৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। আর ৫-১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে কর্মচারীদের থেকে। ৫২ জনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১১২ জনকে। এছাড়া বাড়িভাড়ার নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে ইউজিসি।

অনিয়মে জর্জরিত ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, অপসারণের সুপারিশ

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মুহাম্মদ আহসান উল্লাহ, তার অপসারণে সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি

এসব অনিয়মে উপাচার্যকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন ভিসির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার আবু হানিফ। এছাড়া সিন্ডিকেট সদস্য ও ভবানীপুর ইসলামিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. হাসান মাসুদসহ আরও কয়েকজন উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ বলে তাকে দ্বিতীয় দফায় সিন্ডিকেট সদস্য করা হয়।

এদিকে প্রথম দফায় ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটিতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মো. সাজ্জাদ হোসেনের নেতৃত্বে হয় এ তদন্ত।

এরপর দ্বিতীয় দফায় তদন্ত করে ইউজিসি। সেখানেও সত্যতা মেলে অভিযোগের। এ তদন্ত কমিটিতে ইউজিসির সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক বিশ্বজিৎ চন্দ্রসহ পাঁচ সদস্য ছিলেন।

দ্বিতীয় দফার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার মনোনীত সিন্ডিকেট সদস্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) হেলাল উদ্দীন এসব অনৈতিক ও অবৈধ নিয়োগের বিরোধিতা করায় তাকে সিন্ডিকেট থেকে বাদ দেওয়া হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে জালিয়াতির জন্য অবৈধভাবে ‘নিয়োগ কমিটি’র বাইরে আলাদা প্রশ্নপত্র করা হয়। এছাড়া অবৈধভাবে এক লাফে ১৩ জন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীকে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা বানানো হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইন অনুযায়ী ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোকে গড়ে তোলা হলেও অপ্রয়োজনে উপাচার্যের পছন্দের বেশ কয়েকজনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানতে চাইলে প্রশ্ন মডারেটর ও প্রণয়নের জন্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় বলে দাবি করেন উপাচার্য।

এছাড়া নিয়মে নেই এমন অধীনস্থ মাদরাসায় বিভাগ খোলার অনুমোদন দেওয়া হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়।

এর আগে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন সাব্বির আহমেদ মমতাজী। তার সংশ্লিষ্টতায় মূলত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হন আহসান উল্লাহ। মমতাজীর বিরুদ্ধেও নিয়োগ বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। ক্ষমতাবলে তিনি নিজের ছেলে-মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এসব অভিযোগেরও প্রমাণ পেয়েছে ইউজিসি।

অনিয়মে জর্জরিত ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, অপসারণের সুপারিশ

ইউজিসি ভবন

ইউজিসির সুপারিশ
উপাচার্য আহসান উল্লাহর দেওয়া ১১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ বাতিল করে পুনরায় নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা। তবে যারা ‘অবৈধভাবে’ নিয়োগ পেয়েছেন তাদের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

সিন্ডিকেট সদস্যের কয়েকজন উপাচার্যের সহযোগী হিসেবে কাজ করায় এ সিন্ডিকেট ভেঙে নতুনভাবে গঠন করা ও আহসান উল্লাহকে অপসারণ করে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. আবু ইউসুফ মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, দ্বিতীয় দফায় ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন ইউজিসি থেকে আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দ্রুত সময়ে জানানো হবে সিদ্ধান্ত।

জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক দিল আফরোজা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বর্তমান উপাচার্যের অনিয়ম প্রমাণ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।

এমএইচএম/জেডএইচ/এএসএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।