নিঃশব্দে জীবন গড়ার ভিন্ন এক সংগ্রাম চলে যেখানে

রাসেল মাহমুদ
রাসেল মাহমুদ রাসেল মাহমুদ , নিজস্ব প্রতিবেদক সিলেট থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ১০:৩০ এএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ৭নং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের ব্রাহ্মণ গ্রামে বসবাস করেন নাজিয়া বেগম ও সফিকুল ইসলাম দম্পতি। এ দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে সন্তান জামিল আহমেদ। বয়স দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মা ছাড়া কিছুই ডাকতে পারতো না জামিল। এতে চিন্তিত হয়ে পড়েন মা নাজিয়া বেগম। নানা চেষ্টার পরেও ছেলে কথা বলতে পারছিল না। ধীরে ধীরে জামিল বড় হতে থাকলো। একসময় নাজিয়া বেগম ও সফিকুল ইসলাম দম্পতি বুঝতে পারলেন তাদের ছেলে বাক প্রতিবন্ধী। তবে বাক প্রতিবন্ধী ছেলে যেন পরিবার ও সামাজের বোঝা না হয়, তাই ছেলের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তাকে কিন্ডার গার্টেন স্কুলে ভর্তি করে দেন নাজিয়া। কথা বলতে না পারলেও জামিলের মেধা বেশ প্রখর। ছেলের পড়ালেখায় আরও বেশি মনোযোগী করতে তাকে সিলেট সরকারি বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করেন নাজিয়া। তেরো বছর বয়সী জামিল আহমেদ বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। এদিকে দীর্ঘ ৩০ বছর প্রবাসে থাকার পর স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন সফিকুল ইসলাম। এ অবস্থায় ছেলে এবং পরিবারের ভবিষ্যত নিয়ে প্রতি মুহূর্ত দুশ্চিন্তায় কাটে নাজিয়া বেগমের।

সম্প্রতি সিলেট সরকারি বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে গিয়ে কথা হয় নাজিয়া বেগমের সঙ্গে। সেসময় তিনি এসব কথা জানান।

jagonews24

সরেজমিনে দেখা যায়, সিলেটের শেখঘাটে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর পেছনেই চলছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ভবন নির্মাণের কাজ। তার পেছনেই একটি দুইতলা ও দুইটি তিনতলা ভবন। দুইতলা বিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবনের নিচতলার চারটি শ্রেণিকক্ষের তিনটিতে চলছে পাঠদান। শ্রেণিকক্ষের বাইরে থেকেই দেখা যায় হাতের ইশারায় পড়াচ্ছেন শিক্ষিকা। স্কুলড্রেস পরা শিক্ষার্থীরাও বইখাতা নিয়ে বেশ মনোযোগী হয়ে ক্লাস করছে। অপর একটি শ্রেণিকক্ষে দেখা যায় ছোট ছোট বাচ্চারা বোর্ডে লেখা দেখে শিক্ষকের পরামর্শে বই খুলে পড়ছে। প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে অভিভাবককেও বসে থাকতে দেখা যায়। জানা যায়, শিশুটি কিছুটা চঞ্চল প্রকৃতির হওয়ায় ওই শিক্ষার্থীর মা প্রতিদিন তাকে স্কুলে নিয়ে আসেন। শ্রেণিকক্ষে যেন কোনো অসুবিধা না করে তাই বাচ্চার সঙ্গে মা নিজেই বসে থাকেন। স্কুল শেষে তাকে আবার বাসায় নিয়ে যান।

আরও পড়ুন: মোট জনসংখ্যার ২.৮ শতাংশ প্রতিবন্ধী 

ওই স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে গিয়ে দেখা যায়, এক শিক্ষিকা শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন। মোট ১০ শিক্ষার্থী ওই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষিকার হাতের ইশারায় বইখাতা নিয়ে পড়ছে। শিক্ষিকার সহায়তায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্রেণিকক্ষে যা পড়ানো হয় তা তারা সহজেই বুঝতে পারে। পড়া বুঝতে কোনো ধরনের অসুবিধা হলে সেটি আবার জিজ্ঞেস করে বুঝে নেয়। শ্রেণিকক্ষে পড়ার বিষয়ে কোনো ধরনের সমস্যা হয় না তাদের। পড়ালেখা করতেও বেশ ভালো লাগে তাদের। আট-দশজন সাধারণ শিক্ষার্থীর মতোই বই খাতায় পড়ালেখা হয় এসব শিক্ষার্থীর। কলমের কালিতে লেখা অক্ষরের মতোই নিঃশব্দে চলে তাদের পাঠদান। সাইন, ব্যাবলিং, লিফ রিডিং, রাইটিং পদ্ধতিতে পড়ানো হয় বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী এই শিক্ষার্থীদের।

jagonews24

বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী এসব শিশু যেন সমাজের বোঝা না হয়, তাই তাদের জন্য সরকারি খরচে গড়ে তোলা হয়েছে বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয় থেকে গত বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় তিনজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদেরকে অধিদপ্তর থেকে পুরস্কৃতও করা হয়। শুধু অ্যাকাডেমিক শিক্ষায় ভালো করাই নয়, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছে স্কুলটির শিক্ষার্থী মো. মানিক মিয়া তালুকদার। চলতি বছরের স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ প্রতিযোগিতায় জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে পুরস্কার পেয়েছে এই বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী সাগর আহমেদ। এই বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করা শিক্ষার্থীদের অনেকে এখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন। ব্যবসা কিংবা চাকরি করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

আরও পড়ুন: প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় নীতিমালা হচ্ছে 

জানা গেছে, সিলেটের শেখঘাটে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর পেছনে ১৯৮১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করা হয় সরকারি বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়। এক দশমিক ৮ একর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৮৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বিদ্যালয়ে দুইজন শিক্ষিকাসহ মোট ৯ জন শিক্ষক রয়েছেন। প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয় এখানে। এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে পড়ালেখা করছে ৬৯ জন। এছাড়াও মাধ্যমিক পর্যায়ে রয়েছে ১৪ জন শিক্ষার্থী। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ছাত্রী রয়েছে ১০ জন। এই প্রতিষ্ঠানে সরকারি খরচে ১০০ জন শিক্ষার্থী পড়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে অধ্যয়নরত ৮৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬৩ জন আবাসিক ও ২০ জন অনাবাসিক হিসেবে পড়ালেখা করছে।

jagonews24

সিলেট সরকারি বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান

এই বিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ভবনের দুই পাশে রয়েছে দুটি আবাসিক ভবন। তিন তলা বিশিষ্ট আবাসিক ভবন দুটিতে ৬৩ জন শিক্ষার্থী থাকে। আবাসিক ভবন দুটির দুই তলা ও তিন তলায় থাকে শিক্ষার্থীরা। এছাড়া একটি আবাসিক ভবনের নিচ তলায় শিক্ষক মিলনায়তন ও প্রধান শিক্ষকের কক্ষ।

আবাসিক ভবনগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি কক্ষে চারজন করে শিক্ষার্থী থাকে। কক্ষের চার কোনায় চারটি লোহার খাটসহ অতি সাধারণ আবাসিক সুবিধার এই কক্ষে চলে নিঃশব্দ জীবনযাপন। বিদ্যালয় ছুটির পর দেখা যায় কেউ নিজ কক্ষে শুয়ে পড়েছে, কেউ গোসল করে নিজের প্রয়োজনীয় কাজ করছে। বাবা-মা ও নিজের পরিবার ছাড়া এটা যেন তাদের ভিন্ন এক পরিবার। এখানে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি হয় চোখের দৃষ্টি আর হাতের ইশারায়।

আরও পড়ুন: ভাতাসহ বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে চব্বিশ লাখ প্রতিবন্ধী 

বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ে পাঠদান চলে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। ক্লাস শেষে বিকেলে খেলাধুলা করে শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যা নামতেই তাদের আবাসিক ভবনের গেটে তালা দেওয়া হয়। দিনে কিংবা রাতে কখনোই স্কুল প্রাঙ্গণের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই কোনো আবাসিক শিক্ষার্থীর। তবে ছুটিতে কিংবা বাড়ি যেতে চাইলেও অভিভাবকরা আবেদক করে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে যান। সকাল-সন্ধ্যা এমন বৃত্তেই চলে তাদের নিঃশব্দ জীবন সংগ্রাম। শৈশবের নানা চাওয়া-পাওয়া ও আকুতি ভাষায় প্রকাশ করতে না পারলেও নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে জীবনযুদ্ধে এই বয়সেই ভিন্ন এক সংগ্রাম করে চলছে এসব শিশু।

jagonews24

সিলেট সরকারি বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মান ভালো। তবে শিক্ষকদের কিছু পদ এখনো শূন্য রয়েছে। এসব পদের নতুন শিক্ষক পেলে শিক্ষার গুণগত মান আরও ভালো হবে। লিফ রিডিং, সাইন, ব্যাবলিং, রাইটিং পদ্ধতিতে পড়ানো হয় বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের। সাধারণ শিক্ষার সবকিছুই এখানে পড়ানো হয়।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও সুযোগ সুবিধা বাড়ালে এসব শিশুরা আরও উপকৃত হবে। একই সঙ্গে দ্বাদশ শ্রেণি করার বিষয়ে অধিদপ্তর থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তা হয়ে গেলে শিক্ষার্থীরা আরও ভালো করবে। এটা বাস্তবায়ন হলে শিক্ষার্থীরা এখান থেকে পড়ালেখা শেষ করে সমাজে সাধারণ মানুষের মতো প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

আরএসএম/কেএসআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।