শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘চোখ ওঠা’ ছড়াচ্ছে দ্রুত, পাঠদান ব্যাহত

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৪৮ পিএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
ফাইল ছবি

রাজধানীতে বাড়ছে ‘চোখ ওঠা’ রোগ। অতি ছোঁয়াচে এ রোগ সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীদের জন্য। বিশেষত স্কুলপড়ুয়া খুদে শিক্ষার্থীদের জন্য। এরই মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চোখ ওঠা রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। ক্লাসের একজনের চোখ উঠলে তা দ্রুত অন্যদের মাঝে ছড়াচ্ছে। এ অবস্থায় কিছু স্কুল সাময়িক বন্ধও রাখা হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রম। বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংক্রমণ কমাতেই স্কুল বন্ধ বা আক্রান্ত শিক্ষার্থীকে ছুটি দিয়ে বাসায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত হচ্ছে।

চক্ষু বিশেষজ্ঞরা অবশ্য অভয় দিয়ে বলছেন, চোখ উঠলে চিন্তার কিছু নেই। এ রোগে আক্রান্ত হলে শিশুরা পাঁচদিন আর প্রাপ্তবয়স্করা সাত বা সর্বোচ্চ ১০ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আইসোলেশনে (আলাদা) থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

jagonews24

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর পোস্তগোলায় ঢাকা নেছারিয়া কামিল মাদরাসায় গত ছয়দিন আগে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর চোখ ওঠে। এরপর ক্লাসে আরও কয়েকজন আক্রান্ত হয়। পরে অনেক শিক্ষার্থীর মাঝে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় সাতদিনের জন্য মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক সৈয়দ মো. হাবিবুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, একজন শিক্ষার্থীর চোখ ওঠার পর দ্রুত তা ১৫-২০ জনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এটি যেন ভয়াবহভাবে না ছড়ায় সেজন্য মাদরাসা গত বৃহস্পতিবার থেকে আগামী শনিবার পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বাসায় থেকে পড়ালেখা করতে বলা হয়েছে।

যাত্রাবাড়ীর জুরাইন কমিশনার রোডে সানভীম কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে প্রায় ৩০ জন খুদে শিক্ষার্থী চোখ ওঠা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের আগামী শনিবার পর্যন্ত ছুটি দেওয়া হয়েছে।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিলকিস বেগম জাগো নিউজকে বলেন, হঠাৎ করে শিশুদের মধ্যে চোখ ওঠা শুরু হয়েছে। একজন থেকে দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক শিশু চোখ ব্যথা ও মাথা ব্যথা বলে কান্নাকাটি করছে। আক্রান্তদের ছুটি দিয়ে বাসায় থাকতে বলা হয়েছে।

jagonews24

ওই স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী হুমায়রার বাবা হাবিব আলম জাগো নিউজকে বলেন, ক্লাসে এক সহপাঠীর চোখ ওঠার দুদিন পর আমার মেয়েও আক্রান্ত হয়েছে। হঠাৎ মেয়েটার চোখ লাল হয়ে যায়। চোখ ব্যথা ও মাথা ব্যথা বলে কান্নাকাটি করছিল। রাতেই (রোববার) ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।

রাজধানীর এমন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হঠাৎ চোখ ওঠা শুরু হয়েছে। একজন আক্রান্ত হলে দ্রুত সেটি মহামারি আকারে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।

আক্রান্ত রোগীদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, চোখ ওঠলে কখনো কখনো এক চোখে অথবা দুই চোখেই জ্বালা করে এবং লাল হয়ে চোখ ফুলে যায়। চোখ জ্বলা, চুলকানি, খচখচে ভাব থাকা, চোখ থেকে পানি পড়া, চোখে বারবার সাদা ময়লা আসা, কিছু ক্ষেত্রে তীব্র ব্যথা এ রোগের অন্যতম লক্ষণ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটিকে কনজাংটিভাইটিস বা রেড/পিংক আই বলা হয়। এ সমস্যাটি ‘চোখ ওঠা’ নামেই বেশি পরিচিত। কনজাংটিভা নামে চোখের পর্দায় প্রদাহ হলে তাকে চোখ ওঠা রোগ বলা হয়। রোগটি অতি ছোঁয়াচে হওয়ায় দ্রুত ছড়াতে সক্ষম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চক্ষু বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. জাফর খালেদ রোববার বিকেলে জাগো নিউজকে বলেন, শিশুদের চোখ ওঠার হার বেড়েছে। এটি একটি ভাইরাস, যা করোনার মতো ছড়াচ্ছে। একজন আক্রান্ত হলে সংস্পর্শে থাকা অন্যরাও আক্রান্ত হচ্ছে। এর প্রকোপ তিন থেকে ছয় মাস থাকতে পারে। তবে এর সংক্রমণ সক্ষমতা দু-তিন মাস স্থায়ী হবে। এসময়ের মধ্যে যারা কন্ট্রাকে আসবে তারা আক্রান্ত হবে। যাদের ইমিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা) কম তারাই বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। তবে চোখ ওঠা রোগের একটি ভালো দিক হচ্ছে, অল্প বয়সীরা দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়।

jagonews24

এ বিষয়ে এই চক্ষু বিশেষজ্ঞ বলেন, শিশুরা আক্রান্ত হলে তিন থেকে পাঁচদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠছে, আর বয়স্কদের সুস্থ হতে পাঁচ-সাতদিন লাগছে। এজন্য আলাদা চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। ভাইরাসের সংক্রমণে সেখানে তৈরি হয় প্রদাহ, ফুলে যায় চোখের ছোট ছোট রক্তনালী। ফুলে থাকা রক্তনালীগুলোর কারণেই চোখের রং লালচে হয়ে যায়, যেটাকে চোখ ওঠা বা ‘কনজাংকটিভাইটিস’ বলা হয়। যাদের বেশি চোখ ও মাথা ব্যথা থাকে তাদের কারও কারও অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ দেওয়া হয়। এ ধরনের রোগীরা সর্বোচ্চ ১০ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, কারও চোখ উঠলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে আইসোলেশন (আলাদা রাখা) করতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত আলাদা রাখা যাবে তত ভালো। এতে অন্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমবে। তবে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের মতো দরজা-জানালা বন্ধ রাখার প্রয়োজন হয় না। এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা ভালো। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিস বা একই বাথরুম ব্যবহার না করাও ভালো। চোখের পানি বা বাতাসে এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। কোনো শিক্ষার্থী আক্রান্ত হলে অন্তত সাতদিন স্কুলে যাওয়া যাবে না। দেশে প্রতি বছরই চোখ ওঠার সংক্রমণ কম-বেশি হয়।

এমএইচএম/এমকেআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।