‘ফরমায়েশি হলেও তো বিষয়টা আঁকাআঁকিই’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৪৪ পিএম, ১৫ মার্চ ২০২২

আইয়ুব আল আমিন। প্রচ্ছদশিল্পী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে স্নাতকোত্তর। গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে কাজ করছেন একটি জাতীয় দৈনিকে। ছবি আঁকার পাশাপাশি লিখছেন বইও।

ছবি আঁকা, বই লেখাসহ সৃষ্টিশীলতা প্রসঙ্গে মুখোমুখি হয়েছেন জাগো নিউজের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ: প্রচ্ছদশিল্পকে সম্ভবত পেশা হিসেবেই বেছে নিলেন। সুখ মিলছে?

আইয়ুব আল আমিন: সুখ তো আপেক্ষিক বিষয়। তবে হ্যাঁ, আনন্দ না পেলে তো আমি এটা কন্টিনিউ করতে পারতাম না। প্রচ্ছদ করার একটা আলাদা মজা আছে, সেটা হলো গল্পটা পড়লাম বা কবিতাগুলো পড়লাম, সেটা অনুভব করে নিজের মধ্যে একটা ইমেজ তৈরি হলো এবং সেটাই এঁকে ফেললাম। এর মতো মজা আর কী হতে পারে আমি জানি না।

জাগো নিউজ: শিল্পের মান বিচারে প্রচ্ছদ কি আসলে মৌলিক কোনো শিল্প, নাকি অন্যের রূপে রূপায়িত কোনো সৃষ্টি? যেমন- লেখকের ভাষা প্রচ্ছদে ফুটে ওঠে। অর্থাৎ নির্ভরতার প্রশ্নে…?

আইয়ুব আল আমিন: আমি মনে করি, একজন শিল্পীর আবেগ থেকে হোক চিন্তা থেকে হোক আর কোনো কিছু দেখেই হোক, তার সব সৃষ্টিই মৌলিক। আমি যে ছবিটা প্রচ্ছদে আঁকছি সেটার গল্পটা তো আরেকজনের লেখা। তার সেই চিন্তার ওপর ভিত্তি করে আমি ছবিটা আঁকছি। তাহলে সেই শিল্পটি মৌলিক থাকলো কি না, আমি বলবো তারপরও সেটা মৌলিক, কারণ একটা উপন্যাসই যদি আপনি আলাদা দুজন শিল্পীকে দেন প্রচ্ছদ করার জন্য, তাহলে দেখবেন দুজনই ওই গল্পটাই আঁকছেন, কিন্তু তাদের ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা।

এদেশে বেশিরভাগ লেখক-প্রকাশক প্রচ্ছদশিল্পটাকে বই প্রকাশ সংক্রান্ত আর ১০টা কাজের মতোই মনে করেন। এই যেমন টাইপিস্ট যেমন টাইপ করছেন, প্রুফ রিডার প্রুফ দেখছেন, বাইন্ডার যেমন বই বাইন্ড করছেন। টাকা দিলাম কাজটা করে দিলো। কাজ ভালো হয়নি বা ভুল হয়েছে আবার করেন। কিন্তু শিল্প তো এমন নয়। একজন শিল্পী তার শিল্প নিয়ে শুধু তার নিজের সঙ্গেই বোঝাপড়া করতে পারেন, আর কারও সঙ্গে নয়। কখনোই নয়।

জাগো নিউজ: যদি আপনি প্রচ্ছদকে শিল্পই মানেন, তাহলে এর সঙ্গে পেশাদারত্বকে কীভাবে দেখা যায়?

আইয়ুব আল আমিন: মজার বিষয় হলো আমি পড়াশোনা শেষ করা পর্যন্ত ভেবেছিলাম, কোনো ধরনের চাকরি করবো না। ছবিই আঁকবো শুধু। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় এসে পড়লাম চরম বাস্তবতার মুখে।

আমাদের দেশে শুধু এস এম সুলতান ছাড়া এমন একজন নামি শিল্পী আপনি পাবেন না, যিনি শুধু ছবি এঁকে জীবন পার করতে পেরেছেন। দেখবেন বিখ্যাতরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা কোনো না কোনো বড় চাকরি করার পাশাপাশি ছবি এঁকেছেন। ঢাকার বাইরে থেকে এসে আমি পড়ে গেলাম মহাসমুদ্রে। আমি ছবি আঁকলে কে কিনবে সেই ছবি, আমাকে কে চেনে? তাহলে ব্যয়বহুল এই শহরে আমি বাঁচবো কী করে? এমন সময় আমি খেয়াল করলাম বইয়ের প্রচ্ছদ এবং অলংকরণের বেলায় ওই বিষয়টা নেই। কাজ করলে সঙ্গে সঙ্গে টাকাটা পাওয়া যায়। তাই বলে এই কাজও অতটা সহজ ছিল না আমার জন্য। আমি ছাত্রাবস্থা থেকেই একটু-আধটু প্রচ্ছদ এবং অলংকরণের কাজ করতাম। আমার জন্য তাই বলতে পারেন কিছুটা সহজ হলো। এই কাজ করতে করতে ভাবলাম আমি তো ছবিই আঁকছি, যেটা করতে চেয়েছি সব সময়। ফরমায়েশি হলেও তো বিষয়টা ছবি আঁকাই এবং আমার দিনও চলে যাচ্ছে।

জাগো নিউজ: প্রযুক্তির উন্নয়নে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে সর্বত্রই। আপনিও প্রযুক্তিনির্ভর ছবি আঁকছেন, প্রচ্ছদ করছেন। কালি-কলমে হাতে আঁকা আর কম্পিউটারের মাউস ধরে আঁকার তফাৎ অবশ্যই অনুধাবন করেন?

আইয়ুব আল আমিন: হ্যাঁ। এটা ঠিক। তবে আমি প্রচ্ছদ করার জন্য গল্প বা থিমটা বুঝে নিয়ে ছবিটা মাথায় সেট করে ফেলি। তারপর সেটা কালির তুলিতে হাতে কলমেই আঁকি। তারপর সেটা স্ক্যান করে বা ছবি তুলে কম্পিউটারে নিয়ে প্রচ্ছদ হিসেবে রেডি করি। সেক্ষেত্রে বলতে পারেন আমি টোটালি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠতে পারিনি এখনো। তবে হ্যাঁ এখন অনেক প্রচ্ছদই হচ্ছে কোনোরকম তুলির আঁচড় ছাড়াই। সেগুলো মানের দিক দিয়ে যে খারাপ এমনও নয়। কিন্তু আমি পারসোনালি বিষয়টা এড়িয়েই যাই। কারণ ছবি আঁকাটা আমার নেশা। যখন মনের খেয়ালে আঁকার সুযোগ আমার নেই, তখন যেখানে সুযোগ আছে সেখানেই আঁকবো। তবে এটাই সত্য এখন প্রযুক্তিকে শুধু আঁকাআঁকির ক্ষেত্রেই নয়, জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

জাগো নিউজ: প্রচ্ছদশিল্পের চ্যালেঞ্জ বাড়িয়েছে সম্ভবত বিজ্ঞাপনের বাজারও। আবার বিজ্ঞাপনের কারণেই প্রচ্ছদশিল্পের কদর বাড়ছে। আপনিও হয়তো সহমত পোষণ করবেন?

আইয়ুব আল আমিন: একদম সত্য কথা। পুঁজি যখন সারাবিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করছে তখন এটা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কি? প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করেই টিকে থাকতে হচ্ছে শিল্পীদের। দিন দিন এটা বাড়ছে। এখন প্রযুক্তির যুগে একটা প্রচ্ছদ মুহূর্তেই সারাবিশ্বের মানুষ দেখতে পাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আপনার কাজটা মানুষ কীভাবে গ্রহণ করলো আপনি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জেনে যাচ্ছেন। এটা আমি ইতিবাচকই ভাবি।

জাগো নিউজ: সৃষ্টিশীল কাজে অন্য সৃষ্টির প্রভাব। আর অনুকরণেরও বিষয় তো থাকেই। এটি এড়িয়ে চলেন, নাকি আঁকড়ে ধরেন? আর কার প্রভাব পড়লো আপনার এই শিল্প জগতে?

আইয়ুব আল আমিন: একজন শিল্পী কারও না কারও কাজে প্রভাবিত হবেনই। তিনি সচেতনভাবে না চাইলেও হবেন। কিন্তু অনুকরণ বিষয়টা আলাদা। আমি এটি সম্পূর্ণ পরিহার করার চেষ্টা করি। আমার অনেক প্রিয় শিল্পী আছেন যাদের কাজ আমার ভীষণ পছন্দ। তাই বলে আমি তাদের কাজটা দেখে হুবহু ওইরকমই কিছু করে ফেলবো, এমন নয়। কোনো একটা ছবি ভালো লাগলে সেটা আমার মাথায় গেঁথে যায় এবং অবচেতনভাবেই ওই গেঁথে যাওয়াটা কাজে প্রভাব ফেলে। সেক্ষেত্রে কারও অনুকরণ নয়, অনুসরণ করি বলতে পারেন। দেশে এবং দেশের বাইরে এমন অনেকেই আছেন যাদের কাজ আমার অসম্ভব ভালো লাগে। শুধু প্রচ্ছদ আঁকার ক্ষেত্র হলে শ্রদ্ধেয় কাইয়ুম চৌধুরী অদ্বিতীয়। ওনার প্রতিটা বইয়ের প্রচ্ছদ বা পোস্টার বলেন, প্রতিটিই মাস্টারপিস পেইন্টিং। ওনার টাইপোগ্রাফির বেলায়ও একই কথা বলবো। সমর মজুমদারের কাজেও আমি মুগ্ধ না হয়ে পারি না। সমরদা’র কাজ আমার প্রথম দেখায় যতটা ভালো লাগে যতদিন যায় সেই কাজটা ততই ভালো লাগতে থাকে। এটা ওনার ম্যাজিক। প্রচ্ছদের বিষয়ে ধ্রুবদার কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সব্যসাচী হাজরা দাদার কাজও আমার ভালো লাগে অনেক বেশি। দেশের বাইরে পূর্ণেন্দু পত্রীর কাজ আমাকে মুগ্ধ করে বরাবর। হীরণ মিত্রের কাজ ভালো লাগে।

এবার মেলায় আমার একটা বই এসেছে গল্পের। সেটার প্রচ্ছদ করেছেন কলকাতার সৌরীশ মিত্র। বুঝতেই পারছেন ওনার কাজের আমি কত ভক্ত যে আমার বইয়ের প্রচ্ছদই তাকে দিয়ে করিয়েছি।

জাগো নিউজ: প্রচ্ছদশিল্পীদের ব্যস্ততা অনেকটা বইমেলা ঘিরেই। অন্য শিল্পীরাও আঁকছেন। ধ্রুব এষসহ অন্যদের প্রচ্ছদও দেখছেন। নিজেকে আলাদা করে ভাবেন?

আইয়ুব আল আমিন: এ বিষয়টা অবাক করার মতো। এমন একটা বৈশ্বিক মহামারি আমরা পার করলাম, এখনো করছি। তার প্রভাব মানুষের জীবনের সবক্ষেত্রেই পড়েছে ব্যাপকভাবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু বই প্রকাশের ক্ষেত্রে এর কোনো প্রভাব আমার চোখে ওইভাবে পড়েনি। কারণ বইমেলা শুরু হওয়ার চার-পাঁচ মাস আগে থেকেই আমি কাজের চাপে দম নিতে পারছিলাম না করোনার মধ্যেই। আমার মনে হয় লেখকরা লকডাউনে ঘরে বসে বসে অনেক সময় পেয়েছেন এবং সেটাকে কাজেও লাগিয়েছেন।

একটা কথা আমি জানি, কাজে যদি সততা থাকে তাহলে একই কাজ হাজারজন করলেও সবার কাজই আলাদা হবে। প্রতিটি মানুষের মন-মনন এবং চিন্তাভাবনা আলাদা। আমি আমার মতো কাজ করে যাই এবং আমি জানি কখনো সেই কাজ কারও সঙ্গে মিলবে না। আমি সচেতনভাবে কারও চেয়ে আলাদা হতে চাই না। সেটা দরকারও নেই। কারণ আপনা আপনি সবার কাজ সবার থেকে আলাদাই হয়।

জাগো নিউজ: করোনাকালের বইমেলা। কতগুলো প্রচ্ছদ আঁকলেন এবার?

আইয়ুব আল আমিন: কতগুলো কাজ করছি হিসাব করার সময় পাইনি এখনো। তবে আমার ধারণা কয়েকশ’ তো হবেই।

জাগো নিউজ: আঁকতে আঁকতে লেখক বনেও গেলেন। আনন্দ বেশি কোথায়? লেখায় নাকি আঁকায়?

আইয়ুব আল আমিন: দুটোর দুরকম আনন্দ। তবে দুটো বিষয়ই শৈশব থেকে আমার মধ্যে ছিল। পরে আঁকাআঁকি নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পেলাম আর লেখাটা নিজের মধ্যে যতটুকু ছিল ওটুকুই। এটা কোথাও শিখিনি আমি।

ছবি আঁকার জন্য মোটামুটি হলেও একটা প্রিপারেশন লাগে। এই ব্যস্ত শহরে যে কোনো সময় চাইলেই ছবি আঁকতে বসে যেতে পারি না। কিন্তু যে কোনো অবস্থায় আমি মাথার মধ্যে একটা লেখা তৈরি করে ফেলতে পারছি। জ্যামে বসে মোবাইলেই আমি লেখাটা লিখেও ফেলতে পারছি। আমি মনে করি আঁকা এবং লেখা দুটো আলাদা মাধ্যম হলেও মোটা দাগে দুটো বিষয় মূলত একই এবং কখনো কখনো একটা আরেকটার পরিপূরকও। যেমন সত্যজিৎ রায় ফেলুদা লিখেছেন। লেখা পড়ে ফেলুদার মুখটা একেকজন একেক রকম ভাববেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি যখন ফেলুদা আঁকলেন তখন লেখা পড়লেই ফেলুদার মুখটা আমরা দেখি। একইভাবে বনলতা সেন দেখতে কেমন তার বিশদ বর্ণনা থাকলেও আপনি তাকে এক রকম ভাবেন আমি হয়তো আরেক রকম। কিন্তু লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসা দেখেন, নামটা বলার সঙ্গে সঙ্গে একটাই মুখ আমাদের দুজনের মানসপটে ভেসে উঠলো।

জাগো নিউজ: শিল্পীরা এলোমেলো হাঁটেন। তবু কোনো লক্ষ্য…

আইয়ুব আল আমিন: একদম ঠিক বলেছেন, অন্তত আমার বেলায়। পুরোপুরিভাবেই এলোমেলো। কোনো পরিকল্পনা নেই এটা আশপাশের সবাই জানেন। তবে ছবি নিয়েই থাকবো। ছবি আঁকবো নয়তো ছবি লিখবো। লক্ষ্য যদি বলেন তাহলে ওই ছবিই।

এএসএস/এইচএ/এএসএম

একজন শিল্পীর আবেগ থেকে হোক চিন্তা থেকে হোক আর কোনো কিছু দেখেই হোক, তার সব সৃষ্টিই মৌলিক। আমি যে ছবিটা প্রচ্ছদে আঁকছি সেটার গল্প তো আরেকজনের লেখা। তার সেই চিন্তার ওপর ভিত্তি করে আমি ছবিটা আঁকছি। তাহলে সেই শিল্পটি মৌলিক থাকলো কি না, আমি বলবো তারপরও সেটা মৌলিক, কারণ একটা উপন্যাসই যদি আপনি আলাদা দুজন শিল্পীকে দেন প্রচ্ছদ করার জন্য, তাহলে দেখবেন দুজনই ওই গল্পটাই আঁকছেন, কিন্তু তাদের ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]