রাষ্ট্রের দৈন্যতায় বাংলা বৈশ্বিক রূপ পায়নি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৪৯ পিএম, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
রাষ্ট্রের দৈন্যতায় বাংলা বৈশ্বিক রূপ পায়নি

‘বিশ্বপুঁজি ব্যবস্থার কারণেই বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হতে পারেনি। বাংলাদেশ যে স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছে, তা পুঁজিবাদের পেছনে ছুটতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। কথিত যে কাঠামোর ওপর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে, তা খুবই ভঙ্গুর। এই রাষ্ট্র কাঠামো কোনোভাবেই গণমানুষের না। গণমানুষের কাঠামো হতে পারেনি বলেই, বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি বিশ্বমানের হতে পারেনি। রাষ্ট্রের দৈন্যতায় বাংলা বৈশ্বিক রূপ পায়নি।’

জ্ঞানতাপস, শিক্ষাবিদ, গবেষক, ভাষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর অভিমত এটি। বাংলা ভাষার প্রচলন এবং এর বৈশ্বিক রূপায়ন নিয়ে মতামত জানতে চাওয়া হয় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে। জাগোনিউজ এর কাছে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি ভাষা-সংস্কৃতির উন্নয়নে রাষ্ট্রের উদাসীনতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বলেন, আমাদের এখানে আসলে সত্যিকার অর্থে সামাজিক বিপ্লব হয়নি। সামাজিক বিপ্লবের সুফল গণমানুষের কাছে পৌঁছায়নি বলেই আমরা জাতি হিসেবে সমৃদ্ধ হতে পারিনি।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ একটি সামাজিক বিপ্লব এবং এর মধ্য দিয়ে একটি জাতিসত্তাও দাঁড়ানোর কথা ছিল বটে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, মুক্তিযুদ্ধ একটি সামাজিক বিপ্লবের ফল। বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছিল গণমানুষ। কিন্তু স্বাধীনতার পর সে স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। আর এ কারণে আমরা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ হতে পারিনি।

সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহার প্রসঙ্গে বলেন, ‘ভাষার জন্য রক্ত দিল। আর সেই রক্তের ওপর ভর করে একটি রাষ্ট্র দাঁড়াল। অথচ আজও বাংলা ভাষার সর্বত্র প্রয়োগ হলো না।’ রাষ্ট্র তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা জারি করে বৈষম্য বজায় রেখেছে। যারা উচ্চবিত্ত তারা ইংরেজি শেখেন। আর মধ্যবিত্তের যারা বাংলা শেখেন, তাদের মধ্যে গভীর কোনো চর্চা নেই। এ কারণেই বাংলা ভাষায় ভালো কোনো বই লেখা হচ্ছে না, সাহিত্য চর্চা হচ্ছে না।

আইন-আদালতের জন্য বই লিখতে হলে ভাষার গভীরতায় প্রবেশ করতে হবে। উচ্চমানের বাংলা চর্চার প্রয়োজন হয়। এটি এখনও রাষ্ট্রে গড়ে ওঠেনি। যে কারণে বৃটিশদের সৃষ্ট কাঠামোতেই আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা হচ্ছে, জানান তিনি। বিশ্বের ৩০ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলেন, যা অত্যন্ত গৌরবের হওয়ার কথা ছিল, তা আমাদের উদাসীনতার কারণেই সম্ভব হয়নি বলে উল্লেখ করেন এই পণ্ডিত। বলেন, রাষ্ট্রের সর্বত্রই বৈষম্য। অর্থনীতি, রাজনীতি আর সমাজনীতির বৈষম্যের কারণেই জ্ঞানে আমাদের অধঃপতন। বৈষম্য দূর করতে পারলে বাংলা ভাষা অনেক আগেই সমৃদ্ধ লাভ করত।

‘১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পেলেন’ এর মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার বৈশ্বিক মর্যাদা বেড়েছে বটে- জবাবে বলেন, ‘অবশ্যই। তবে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে বলেই নোবেল পাওয়া সহজ হয়েছে। আমরা তো আমাদের সাহিত্যকর্ম সঠিকভাবে অনূদিতও করতে পারছি না।

‘বাংলাভাষা সমৃদ্ধ হলে জাতিসংঘে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে এতদিনে জায়গা পেত। আমাদের মনস্তাত্ত্বিক দৈন্যতার কারণেই ভাষা নিয়ে এগুতে পারিনি। যার মূলে রয়েছে নীতিহীন রাষ্ট্রকাঠামো’ বলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

এএসএস/ওআর/জেআইএম