কেউ হতাশ, কারও আনন্দ লাফালাফিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:১৯ পিএম, ০২ মার্চ ২০১৯

বাবা সিসিমপুর কোথায়? টুকটুকি, হালুম, শিকু, ইকরি কাউকে তো দেখছি না। বলো না বাবা সিসিমপুর কোথায় হবে। আমি ইকরির গল্প শুনব। বলো না বাবা, চুপ করে রয়েছ কেন?

অমর একুশে গ্রন্থমেলার শেষ দিন শনিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিশু চত্বরের পাশে বাবা জামিউল হাসানের হাত ধরে এভাবেই সিসিমপুর দেখার আবদার করছিল মেয়ে চৈতি।

চৈতি যেখানে দাঁড়িয়ে বাবার হাত ধরে সিসিমপুর দেখার বায়না করছিল, তার থেকে একশ’ গজ দূরে তৈরি করা হয়েছে একটি মঞ্চ। এ মঞ্চের ভিতরে একটি গাছে গোল একটি ব্যানারে লেখা রয়েছে শিশু চত্বর।

আরও পড়ুন- শিশুপ্রহর আছে, নেই সিসিমপুর

এ চত্বরেই মাসব্যাপী গ্রন্থমেলার প্রতি শুক্র ও শনিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে শিশুদের প্রিয় অনুষ্ঠান সিসিমপুর। দুই ঘণ্টার এ শিশুপ্রহরে শিশু চত্বরে উপস্থিত হয়ে সিসিমপুরের জনপ্রিয় চরিত্র টুকটুকি, হালুম, শিকু, ইকরি শিশুদের আনন্দে ভাসিয়েছে।

তবে গ্রন্থমেলার শেষ দিন শনিবার শিশুপ্রহর উদযাপন করা হলেও শিশু-কিশোরদের প্রিয় অনুষ্ঠান সিসিমপুরের কোনো শোয়ের ব্যবস্থা করা হয়নি। এতে প্রিয় টুকটুকি, হালুম, শিকু, ইকরির গল্প শুনতে না পেরে চৈতির মতো অনেক শিশুই হতাশ হয়।

অবশ্য প্রিয় টুকটুকি, হালুম, শিকু, ইকরির দেখা না মিললেও অনেককে শিশু চত্বরের বেদীতে লাফালাফির মাধ্যমে আনন্দে মেতে থাকতে দেখা গেছে। শিশুদের সেই আনন্দ ছিল অনেকটাই মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানোর মতো। হবেই বা না কেন, ইট-পাথরের এ যান্ত্রিক শহরে শিশুদের মুক্ত বাতাস পাওয়া যে অনেকটাই দুরহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

southeast

বইমেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ১১টার পর থেকেই শিশুরা বাবা-মায়ের হাত ধরে শিশু চত্বরের মঞ্চে উপস্থিত হয়েছে। মঞ্চে শিকু, হালুম, টুকটুকি, ইকরি না থাকলেও, ছিল কাগজে আঁকা তাদের ছবি। হলুদ টি-শার্ট পরিহিত দুই যুবককে মঞ্চের তত্ত্বাবধায়ন করতে দেখা যায়।

এদেরই একজন রাজু আহমেদ জানান, আজও শিশু প্রহর আছে। তবে আজ কোনো শো হবে না। সিসিমপুরের কেউ আজ আসবে না। শো গতকাল শুক্রবারই শেষ হয়ে গেছে।

রাজু আহমেদের এমন বক্তব্যে কিছুটা হতাশ হয়ে কয়েকজন শিশুকে বাবা-মায়ের হাত ধরে শিশু চত্বরের সামনে থেকে চলে যেতে দেখা যায়। এ সময় কোনো কোনো শিশুর মুখ ছিল অনেকটাই মলিন। তবে শিশুদের একটি অংশকে শিশু চত্বরের মঞ্চে লাফালাফিতে মত্ত থাকতে দেখা যায়।

তত্ত্বাবধায়ক রাজুর কাছ থেকে শুনে বাবা জামিউল যখন তার ছোট শিশু চৈতিকে বললেন, ‘বাবা আজ সিসিমপুর হবে না। টুকটুকি, হালুম, শিকু, ইকরি আসবে না।’ তখন অনেকটাই মলিন দেখাচ্ছিল চৈতির মুখটা।

অভিমানী ভঙ্গিতে চৈতি তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘বাবা তুমি তো বাসায় বললে আজ সিসিমপুর দেখাবে। টুকটুকি, হালুম, শিকু, ইকরি গল্প শুনাবে। আমি ওদের সঙ্গে হাত মেলাতে পারব। খেলতে পারব। তাহলে এখন কেন বলছ সিসিমপুর হবে না।’

bookfear-news-(1).jpg

মেয়ের এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারলেন না বাবা জামিউল। মেয়ের হাত ধরে শিশু চত্বর থেকে অন্যদিকে হাঁটা শুরু করেন। এ সময় এ প্রতিবেদক জাগো নিউজের পরিচয় দিলে জামিউল বলেন, ‘ভাই খুবই হতাশ হলাম। মেয়েকে সিসিমপুর দেখাব বলে নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে জানতে পারলাম আজ সিসিমপুর হবে না। এ কথা শুনে মেয়ের মন খারাপ হয়ে গেছে। কীভাবে ওকে সান্ত্বনা দেব বুঝতে পারছি না।’

তিনি বলেন, ‘বইমেলার শিশুপ্রহরের মূল আকর্ষণ সিসিমপুর। বাবা-মা শিশুদের এখানে নিয়ে আসেন সিসিমপুর দেখার জন্য। সিসিমপুর পছন্দ করে না এমন শিশু খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাসা থেকে সিসিমপুর দেখানোর কথা বলে যদি এখনে এসে শিশুরা দেখে টুকটুকি, হালুম, শিকু, ইকরি কেউ নেই তাহলে তো মন একটু খারাপ হবেই। আজ সিসিমপুর থাকবে না আয়োজকদের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা আগেই দেয়া উচিত ছিল।’

সিসিমপুর হবে না শুনে চৈতির মতো হতাশ হওয়া আর এক শিশু মিথিলা বলে, ‘সিসিমপুরের ইকরির গল্প শুনতে আমার খুব ভালো লাগে। তাই সিসিমপুর দেখব বলে বাবার সঙ্গে এখানে এসেছি। কিন্তু এক আঙ্কেল বললেন আজ সিসিমপুর হবে না। এটা শুনে খুব খারাপ লাগলো।’

মেলা প্রাঙ্গণে অবস্থিত পানির ফুয়ারার পাশে মায়ের হাত ধরে মলিন মুখে ঘুরে বেড়ানো শিশু রোহান বলেন, ‘আম্মু তো বাসায় বলল সিসিমপুর হবে। টুকটুকি, হালুম, শিকু, ইকরি সবাই আসবে এবং গল্প বলবে। খুব মজা হবে। কিন্তু এখানে তো টুকটুকি, হালুম, শিকু, ইকরি কাউকে দেখতে পারছি না। ওরা কখন আসবে আম্মু তাও বলছে না।’

bookfear-news-(1).jpg

এদিকে শিশু চত্বরে কয়েকজন শিশুর সঙ্গে লাফালাফি করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়া এক শিশুর বাবা মিরাজ বলেন, ‘বইমেলার শুক্র ও শনিবার সকাল ১১টা থেকে সিসিমপুর হয়। এ জন্য বাবুকে সিসিমপুর দেখাতে এখানে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু আসার পর জানতে পারলাম আজ সিসিমপুর হবে না।’

তিনি বলেন, ‘সিসিমপুর না হলেও মঞ্চে কয়েকজন শিশু খেলা করছে দেখে বাবুকে ছেড়ে দিলাম। ওই শিশুদের সঙ্গে আমার বাবুও খেলা করছে, আনন্দ করছে। আমার খুব ভালো লাগছে। যান্ত্রিক এ শহরে শিশুদের নিয়ে তো খুব একটা ঘোরাঘুরির সুযোগ হয় না।’

প্রথা অনুযায়ী অমর একুশে বইমেলা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু লেখক ও প্রকাশকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় দুইদিন সময় বাড়ানো হয়। ফলে আজ শনিবার রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে মেলা।

গত ১ ফেব্রুয়ারি মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি।

এমএএস/এনডিএস/এমএস