গুণগত মানে ভরসা মিললে পাঠকপ্রিয়তা মেলে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:১৯ পিএম, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

হাবীবুল্লাহ সিরাজী। কবি ও অনুবাদক। মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি। মহাপরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে বইমেলার নকশায় বিশেষ পরিবর্তনও এনেছেন। পরিধি বাড়িয়েছেন মেলা প্রাঙ্গণের।

বইমেলা, সাহিত্যমান, বাংলা একাডেমির প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। বাংলা সাহিত্যের মান বাড়াতে লেখক-প্রকাশক-পাঠককে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। বলেন, ‘নিম্নমানের শত বইয়ের চেয়ে একটি ভালো বই-ই যথেষ্ট।’ এছাড়া চলতি বছরই প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে বলে উল্লেখ করেন। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : হাজার হাজার বই প্রকাশ হচ্ছে মেলায়। কিন্তু আলোচনায় আসার মতো বইয়ের সংখ্যা খুবই কম। এত সংখ্যক বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে কী ফলাফল মিলছে?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : আমি তো আসলে লেখকদের বলতে পারি না যে, ভালো করে বই লেখেন। অথবা, বই লেখার জন্য কোনো নির্দেশনাও থাকতে পারে না। এটি সম্পূর্ণ চর্চার ব্যাপার। লেখকরা নিজ তাগিদে লিখে থাকেন।

jagonews24

তবুও বলছি, নিম্নমানের শত বইয়ের চেয়ে একটি ভালো বই-ই যথেষ্ট। এটিই লেখকদের ব্রত হওয়া উচিত। আমাদের কোনো লেখক পেশাদার নন। কারণ লেখক পেশাদার হওয়ার যে বাস্তবতা, তা আমাদের এখানে নেই। পেশাদার লেখকরা ভালোভাবে জীবনযাপনের সুযোগ পান না। একজন লেখককে অন্য কাজে বা সময়ে ব্যস্ত থাকতে হয়।

জাগো নিউজ : এটা তো রাষ্ট্রের দায়?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : অবশ্যই। রাষ্ট্র-ই লেখক তৈরির পরিবেশ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা চাই, আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিকভাবে লেখকদের সহযোগিতা করা হোক; যাতে একজন লেখককে তার জীবনযাপন নিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতে না হয়। এমন সুযোগ আসলে অবশ্যই ভালো বই রচিত হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই স্বাধীন ও স্বচ্ছতার মানদণ্ড থাকতে হবে।

এ কারণেই আমি মনে করি, বইমেলা থেকেই সাহিত্যমানের বিষয়ে নতুন করে পর্যালোচনার সময় এসেছে। আমরা যেন পাঠকের কাছে সততার সঙ্গে বলতে পারি, এই এই বইগুলো পড়তে পারেন। কারণ জোর করে সাহিত্যচর্চা করানো যায় না। গুণগত মানে ভরসা মিললেই পাঠকপ্রিয়তা মেলে।

jagonews24

জাগো নিউজ : বই মুদ্রণে প্রকাশের দায়বদ্ধতা নিয়ে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে সম্পাদনা নিয়ে আপত্তি থেকেই যায়…

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : অনেকগুলো পক্ষের সম্মিলিত প্রয়াসের মধ্য দিয়ে একটি ভালো বই বের হয়। বিশেষ করে বইয়ের সম্পাদনা, মুদ্রণ, বইয়ের কাগজ ও প্রচ্ছদ প্রকাশ— সব বিষয়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ। মেলা মূলত আয়োজন করে থাকেন প্রকাশকরা। তারা অংশ না নিলে এই মেলা হবে না। সুতরাং দায়টা তাদেরই বেশি। আর বই ভালো প্রকাশ করলে পাঠকের আস্থা বাড়বে। ব্যবসার প্রশ্নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা এ ব্যাপারে প্রকাশকদের বরাবরই তাগিদ দিয়ে আসছি। প্রকাশকরা শিল্প হিসেবে মনে করলেই বইয়ের মান বাড়বে বলে মনে করি।

জাগো নিউজ : বলছিলেন, বইমেলার আয়োজন বাংলা একাডেমির নয়। কিন্তু বাস্তবতার কারণে করতে হচ্ছে। এই দায়িত্ব পালনে বাংলা একাডেমির মূল কাজ ব্যাহত হয় কি-না?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : অবশ্যই। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলা একাডেমির সমস্ত জনবলকে ব্যস্ত থাকতে হয় এই মেলাকে কেন্দ্র করেই। এতে বাংলা একাডেমির যে মৌলিক কাজ, তা দারুণভাবে ব্যাহত হয়। গবেষণা বা অনুবাদের কাজটি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ক্ষতি জেনেও আমাদের সম্পৃক্ত থাকতে হচ্ছে।

জাগো নিউজ : বাংলা একাডেমির কাজ নিয়ে আপনার বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি-না?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : আমি দায়িত্ব নেয়ার পর গবেষণায় বিশেষ জোর দিয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে গবেষণার কাজ একপ্রকার থমকে ছিল। যে গতিতে গবেষণা হওয়ার কথা, তা ছিল না। আমরা গতি আনতে চেষ্টা করছি। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদের গবেষণায় আমরা গুরুত্বারোপ করছি। কারণ গবেষণা ছাড়া কোনোভাবেই একটি জাতির শিল্প-সাহিত্য বা অন্যান্য ক্ষেত্র শুদ্ধ হতে পারে না।

জাগো নিউজ : গবেষণার বিষয় বা ব্যক্তি নির্বাচনে বাংলা একাডেমির বিরুদ্ধে অভিযোগ বেশ পুরোনো। বিশেষ করে পছন্দের বিষয় এবং ব্যক্তিকে দিয়ে গবেষণা করানো হয়, যেখানে রাজনৈতিক বিবেচনাও গুরুত্ব পায়। এই অভিযোগের বিপরীতে কী বলবেন?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : এই অভিযোগ পরম্পরায়। কিন্তু আমি দায়িত্ব নেয়ার পর শতভাগ স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করছি। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে গবেষক নিয়োজিত করা হয়েছে। যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতেই নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এরপরও অভিযোগ যারা করছেন, তারা শুধু প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এমনটি করছেন। অভিযোগের ব্যাপারে কেউ প্রমাণ দিতে পারবেন না। আমি অন্তত চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি।

jagonews24

জাগো নিউজ : বাংলা একাডেমির জনবল বা অর্থ বরাদ্দ নিয়ে সমস্যার কথা দীর্ঘদিনের। এখন কী বলবেন?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : বাংলা একাডেমির জন্য আইন করা হয়েছে ২০১৩ সালে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রবিধান হয়নি। প্রবিধান না হলে জনবল নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয় না। অনেকেই অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগে আছেন। তাদের খুবই সমস্যা। আমি কাছ থেকে এ সমস্যা বুঝতে পারছি।

আগামী জুন মাসের মধ্যেই প্রবিধান সম্পন্ন হবে। এটি হলেই নতুন করে জনবল নিয়োগ দেয়া হবে। আবার অস্থায়ীদের স্থায়ীকরণের বিষয়টি সম্পন্ন হবে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে জনবল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, অর্থের বরাদ্দ যথেষ্ট থাকলে বাংলা একাডেমির মৌলিক কাজের পাশাপাশি বইমেলার আয়োজনের কাজও স্বাচ্ছন্দ্যে করা সম্ভব।

জাগো নিউজ : কোনো প্রস্তাবনা দেয়া আছে কি-না?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা রেখেছি। আশা করছি, সরকার এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দেবে। কারণ অর্থ আর জনবল ঘাটতি রেখে আপনি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করতে পারেন না।

jagonews24

জাগো নিউজ : বইমেলা কেন্দ্র করে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে, যারা বইয়ের বিষয়বস্তু দেখভাল করবেন। এটা নিয়ে ক্ষোভও আছে। অনেকেই বলছেন, মানুষের লেখার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতেই এমন নজরদারি…

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : স্বাধীনতার নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড নেই। কিন্তু আপনার অতি-স্বাধীনতা যদি অন্যের কষ্টের কারণ হয়, তাহলে কিন্তু নজরদারির প্রসঙ্গ আসে। ধর্মীয় বা অন্যান্য বিষয়ে আপত্তিকর কিছু লিখতে আমরা নিরুৎসাহিত করে থাকি। কোনো লেখা যদি কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে সেক্ষেত্রে আমরা বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গঠিত টাস্কফোর্সের সঙ্গে বাংলা একাডেমির লোকবলও আছে। আমরা মূলত সাহায্য করি। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরাসরি হস্তক্ষেপের অধিকার রাখে না এ ব্যাপারে।

আমরা লেখক ও প্রকাশকদের অনুরোধ করছি, আমরা সবাই যেন একটু সজাগ থেকে রচনা করি। আমার কারণে যেন অন্য কেউ কষ্ট না পায়। মেলাটি সার্বজনীন, সবারই দায়িত্ব আছে। আমি সকল প্রকার স্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু সে স্বাধীনতা যেন অন্যের পরাধীনতার কারণ না হয়।

এএসএস/এমএআর/এমকেএইচ

আমি সকল প্রকার স্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু সে স্বাধীনতা যেন অন্যের পরাধীনতার কারণ না হয়

আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিকভাবে লেখকদের সহযোগিতা করা হলে অবশ্যই ভালো বই রচিত হবে

জোর করে সাহিত্যচর্চা করানো যায় না। গুণগত মানে ভরসা মিললেই পাঠকপ্রিয়তা মেলে

গবেষণা ছাড়া কোনোভাবেই একটি জাতির শিল্প-সাহিত্য বা অন্যান্য ক্ষেত্র শুদ্ধ হতে পারে না

অর্থ আর জনবল ঘাটতি রেখে আপনি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করতে পারেন না

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]