যা আছে ‘প্রবাসে মেঘ জ্যোৎস্না’য়

মো. রাসেল আহম্মেদ
মো. রাসেল আহম্মেদ মো. রাসেল আহম্মেদ
প্রকাশিত: ১২:২৪ এএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

দীর্ঘদিন পর বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত কোনো বই পড়লাম। ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করা অবস্থায় প্রচুর রেফারেন্স বই পড়তে হতো আমাদের। সেই সঙ্গে আমার বই পড়ার একটা ঝোঁক সেই ছাত্রজীবন থেকেই ছিল। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ ও জীবনীগ্রন্থসহ অনুপ্রেরণামূলক বই সংগ্রহে আছে এবং তা নিয়মিত পড়ি।

মাঝখানে প্রবাসে এসে এই ধারায় কিছুটা ভাটা পড়েছে সময়ের অভাবে। এই বছরের অমর একুশে বইমেলায় ইতালি প্রবাসী ও অল ইউরোপ বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জমির হোসেনের বই ‘প্রবাসে মেঘ জ্যোৎস্না’ পাঠ উন্মোচন হয়েছে। বইটিতে পরবাসে ঘটে যাওয়া নানান করুণ ঘটনা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, ভালো-মন্দ, সুবিধা-অসুবিধা, প্রবাসে পরিবার-পরিজন, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, আমাদের অর্জন ও সমস্যা, বিভিন্ন ভ্রমণ কাহিনি, ইউরোপের জীবনযাপন ইতালি, তথা সমগ্র প্রবাসের চিত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।

একজন প্রবাসী হিসেবে বইটি পড়ে অনুধাবন করেছি, এই যেন আমারও মনের কথা যা কখনও ভাষায় রূপ দিতে পারিনি। জমির হোসেন তার অসাধারণ লেখনীর মাধ্যমে সহজ সরলভাবে উপস্থাপনা করেছেন প্রবাস জীনবের বাস্তব চিত্র। সেই সঙ্গে বিস্তর তথ্য তত্ত্ব-উপাত্ত দিয়ে তুলনা করেছেন বাংলাদেশ ও ইতালি, তথা ইউরোপের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা। সে সবের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়, ভুল রাজনীতি, প্রবাসে মরেও শান্তি নেই, মাকে বেশি মনে পড়ে ও একটি ইতালিয়ান পাসপোর্টের গল্প ইত্যাদি লেখায়।

বিভিন্ন সমস্যার কথা তিনি তুলে ধরার পাশাপাশি সেসবের প্রতিকার নিয়েও কথা বলেছেন। তাছাড়া প্রবাসের অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন সম্ভাবনা কীভাবে কাজে লাগানো যায় তার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ রয়েছে তার লেখাতে। যেমন, রাতের আঁধারে যে দেশে নারীরা নিরাপদ, ইতালিতে বাংলাদেশিরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, প্রণোদনা কি প্রবাসীদের সমস্যার সমাধান? ইত্যাদি লেখায়। প্রবাস জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও তার লেখনীর মাধ্যমে কমিউনিটির উন্নয়নে জমির হোসেন কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে।

তার বিভিন্ন লেখায় প্রবাস জীনবের সত্যিকারের ইতিবৃত্ত এবং নানান দুঃখ বেদনার চিত্র গভীরভাবে উপস্থাপন করেছেন। পাশাপাশি দেশেও ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন। নারী ধর্ষণ সমাজের অবক্ষয়, খাদ্যে ভেজাল বন্ধ করতেই হবে এবং শ্রমিকদের মূল্য নেই ইত্যাদি লেখায়। সেই সঙ্গে সরকার ও কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন করেছেন এসবের প্রতিকারে প্রয়োজনীয় কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণে এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে।

এক্ষেত্রে তিনি বার বার প্রবাসে বাংলাদেশী রাজনীতির ভুল দিকগুলো তুলে ধরেছেন এবং এর থেকে উত্তরণের পথও দেখিয়েছেন। প্রবাসে কমিউনিটির কোনো একটি ভাল কাজ যেমন সবাইকে আনন্দিত করে, তেমনিভাবে যেকোনো খারাপ বা ভুল কাজের পরিণতিও দেখিয়েছেন তার রাজনীতি ও বাসাভাড়া লেখার মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ তিনি উল্লেখ করেছেন, রোম শহরে বাংলাদেশিদের বাসা ভাড়া সঙ্কট কতটা প্রকট।

পরিবার-পরিজনবিহীন খয়ে যাওয়া লাখো কোটি যুবকের আর্তনাদের গল্প প্রবাসে মেঘ জ্যোৎস্না। পরিবারের চাহিদা পূরণে এবং তাদের মুখে হাসি ফোটাতে ঈদের আনন্দবিহীন বছরের পর বছর কাটানো যুবকদের গল্প আছে প্রবাসে মেঘ জ্যোৎস্নায়। এমনকি যারা পরিবার নিয়ে পরবাসে থাকে তাদের সঠিক সংগ্রামের ইতিহাস ও বইটিতে পাওয়া যায় বিভিন্ন লেখায়।

শত ব্যস্ততার মাঝেও সময় ফেলে ঘুরে বেড়িয়েছেন ইতালি এবং ইউরোপের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। সেগুলোর স্পষ্ট ছাপ পাওয়া যায় লেখকের ভ্রমণকাহিনি পড়লে। ইতালির ভেনিস অপরূপ সুন্দর, স্বপ্নের শহর লন্ডন দেখে এলাম ও টেনেরিফ দ্বীপে ইত্যাদি লেখায় তার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। তিনি শুধু ভ্রমণই করেননি বরং জানান চেষ্টা করেছেন সেখানকার ইতিহাস ঐতিহ্য এবং তা তথ্য-উপাত্তসহ উপস্থাপন করেছেন পাঠকদের কাছে। বইয়ের ভ্রমণকাহিনি পড়লে তা অনুধাবন করা যায়।

রচনার ক্ষেত্রে তিনি সহজ সরল ও প্রাঞ্জল শব্দ চয়ন করেছেন। বাক্য গঠনে আধুনিক চলিত রীতি অনুসরণ করেছেন, ফলে সব শ্রেণির পাঠকের কাছে তা সহজবোধ্য হবে এবং পাঠকপ্রিয়তা পাবে বলে আশা প্রকাশ করছি। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় ‌‘ইটালির আকাশে কবে উড়বে বলাকা’র কিছু অংশ। তিনি সেখানে লিখেছেন, যন্ত্রণার কষাঘাতে যান্ত্রিক মেশিনের মতো জীবন মাঝে মাঝে থমকে যায়। আবার কখনও কখনও অমাবস্যার চাঁদ রূপে চেপে বসে হৃদয়ের মাঝে। এরপরও স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সংগ্রম করতে হয় প্রবাসে।

এক কথায় জমির হোসেনের ‘প্রবাসে মেঘ জ্যোৎস্না’ প্রবাস দর্পণ বলে মনে হয়েছে। তার লেখায় প্রবাসের সত্যিকারের সংগ্রাম ও জীবন চিত্র ফুটে উঠেছে। যদিও লেখক ইউরোপের অতি উন্নত একটি দেশের প্রবাসী কিন্তু তার লেখাসমূহ সমগ্র প্রবাসীদের মনের অব্যক্ত কথামালা ফুটে উঠেছে। আপনারাও বইটি সংগ্রহে রাখতে পারেন। বই মেলার চৈতন্য প্রকাশনীর ২৫০/২৫১ নং স্টলে পাওয়া যাচ্ছে বইটি।

লেখক, পর্তুগাল প্রবাসী সাংবাদিক/এমএসএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]