প্রচুর জন্মদিন ফিরে আসুক এটিএম শামসুজ্জামানের জীবনে

লিমন আহমেদ
লিমন আহমেদ লিমন আহমেদ , বিনোদন প্রধান
প্রকাশিত: ০১:২০ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

গেল রোজার মাস। ইফতারিতে বসে আছি। হঠাৎ বেজে উঠলো এক সহকর্মীর ফোন। বড় উৎকণ্ঠা তার গলায়। কোনোমতে বললেন, ‘এটিএম শামসুজ্জামান সাহেব নাকি আর নেই। মারা গেছেন। একটু খবর নিবেন নাকি ভাই।!’

খবর নেয়ার আশ্বাস দিয়ে তার কলটি কেটে কল দিলাম এটিএম শামসুজ্জামানের ছোট ভাই
আলহাজ সালেহ জামান সেলিমের কাছে। তিনি নিশ্চিত করলেন যে অভিনেতা ভালো আছেন। আমি আশ্বস্ত হলাম। সহকর্মীকেও শান্ত করলাম যে, ‘ইফতার করুন। এটিএম সাহেবের মৃত্যু সংবাদ লিখতে আপাতত ছুটতে হবে না।’

চলতি বছরে অসুস্থ হয়ে একুশে পদকজয়ী অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান হাসপাতালে ভর্তি হবার পর প্রায় প্রতিদিনই তার মৃত্যুর গুজব শুনতে হয়েছে। কখনো বাসে বসে, কখনো হোন্ডায়, কখনো অফিসে, কখনো আড্ডায় কিংবা অনুষ্ঠানে কারো না কোর কল এসেছে এই কিংবদন্তির মৃত্যুর খবর নিয়ে।

সেইসব বিরক্তির খবর নিশ্চিত করতে বারবার বিরক্ত করেছি শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের পরিচালক আলহাজ সালেহ জামান সেলিম ভাইকে। সরাসরি না বললেও তিনি বুঝতেন তার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার জন্য কল করেছি। উনি কখনো কখনো বিরক্তি লুকিয়ে বলতেন, ‘তেমন কিছু হলে আমি আপনাকে কল করে জানাবো। আপনার নাম্বার আমার কাছে সেভ করা আছে।’

তবুও যখন কোনো সাংবাদিক বা শোবিজের কেউ কল দিয়ে এটিএম শামসুজ্জামানের মৃত্যু হয়েছে বলে খোঁজ নিতে বলতেন ভাবতাম কিছু একটা হয়তো হয়েই গেছে। সেলিম ভাই ব্যস্ত রয়েছেন, আমাকে জানানোর কথা মনে নেই হয়তো। কিন্তু কল করে লজ্জা পেতাম।

একজন অভিনেতার মৃত্যু নিয়ে এভাবে বারবার খোঁজ নেয়া একজন সাংবাদিকের জন্য কতোটা বিব্রতকর সেটা ওই সাংবাদিক ছাড়া আর কেউ বুঝবেন না। পেশা হিসেবে তখনই সাংবাদিকতাটাকে করুণ মনে হয়।

আবার প্রচন্ড রাগ হয় সেইসব অর্বাচীনদের উপর যারা কোনো রকম সত্যতা ছাড়াই বিভিন্ন তারকাদের মৃত্যুর গুজব ছড়ায়। এতে কী লাভ যে তাদের হয় সেটা আজও বোঝে উঠিনি। এর আগে নায়করাজ রাজ্জাক, অভিনেত্রী দিতি, নির্মাতা আমজাদ হোসেন, গায়ক লাকী আখন্দ, অভিনেতা টেলি সামাদেরও মৃত্যু গুজব ছড়ানো হয়েছে। বারবার, বহুবার।

তবে অত্যন্ত সুখের খবরটা হলো সব গুজবকে উড়িয়ে দিয়ে স্রষ্ঠার অশেষ কৃপায় সেরে উঠেছেন সবার প্রিয় অভিনেতা, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার ও গল্পকার এটিএম শামসুজ্জামান। তিনি হাসপাতাল ছেড়ে এখন নিজ বাড়িতেই থাকছেন। দিব্যি খাচ্ছেন, চলছেন, বই পড়ছেন। বয়স আর বার্ধক্যের অসুখ তাকে নত করলেও হারিয়ে দিতে পারিনি। জীবনটাকে এখনো তিনি ধারণ করে আছেন বহু সংগ্রামে অভিজ্ঞ বটবৃক্ষের মতো। এভাবেই তিনি প্রচুর বেঁচে থাকুন প্রত্যাশা করি।

আজ তার জন্মদিন। ১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে জন্মগ্রহণ করেন অভিনয়ের জন্য পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া এটিএম শামসুজ্জামান। তিনি ৭৮ বছরে পা রাখলেন।

জন্মদিনে ভক্ত-প্রিয়জনদের শুভেচ্ছায় ভাসছেন এই কিংবদন্তি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে লিখছেন শোবিজের মানুষেরা। লিখছেন সাধারণ ভক্তরাও। মেয়ের বাসায় আজ জন্মদিনের কেক কেটে সকাল শুরু করেছেন তিনি। এটা আনন্দের খবর।

আমাদের সবার প্রত্যাশা- সুস্থ থাকুন এটিএম শামসুজ্জামান। তার জীবনে আরও অনেক জন্মদিন ফিরে আসুক। জন্মদিনের সেঞ্চুরিটাও যেন করে যেতে পারেন তিনি।

প্রসঙ্গত, এটিএম শামসুজ্জামান নোয়াখালী জেলার ভোলাকোটের বড় বাড়ি আর ঢাকায় থাকতেন দেবেন্দ্রনাথ দাস লেনে। বর্তমানে পুরান ঢাকাতে থাকেন তিনি। লেখাপড়া করেছেন ঢাকার পগোজ স্কুল, কলেজিয়েট স্কুল, রাজশাহীর লোকনাথ হাই স্কুলে। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন ময়মনসিংহ সিটি কলেজিয়েট হাই স্কুল থেকে। তারপর জগন্নাথ কলেজ ভর্তি হন।

পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে এটিএম শামসুজ্জামান সবার বড়। ১৯৬১ সালে পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর ‘বিষকন্যা’ চলচ্চিত্রে সহকারি পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্র জীবন শুরু করেন। প্রথম কাহিনী ও চিত্রনাট্য লিখেছেন ‘জলছবি’ চলচ্চিত্রের জন্য। ছবির পরিচালক ছিলেন নারায়ণ ঘোষ মিতা, এ ছবির মাধ্যমেই অভিনেতা ফারুকের চলচ্চিত্রে অভিষেক।

এ পর্যন্ত শতাধিক চিত্রনাট্য ও কাহিনী লিখেছেন তিনি। প্রথমদিকে কৌতুক অভিনেতা হিসেবে চলচ্চিত্র জীবন শুর করেন। ১৯৬৫ সালে চরিত্র অভিনেতা হিসেবে চলচ্চিত্র পর্দায় আগমন তার। ১৯৭৬ সালে চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ চলচ্চিত্রে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন।

১৯৮৭ সালে কাজী হায়াত পরিচালিত ‘দায়ী কে?’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। তিনি রেদওয়ান রনি পরিচালিত ‘চোরাবালি’-তে অভিনয় করেন ও শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব-চরিত্রে অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

চলচ্চিত্র জীবনে একটি সিনেমা পরিচালনাও করেছেন তিনি। ‘ইবাদত’ নামের সেই ছবিতে জুটি বেঁধেছিলেন রিয়াজ-শাবনূর।

নব্বই দশকের শেষদিকে টিভি নাটকেও নিয়মিত দেখা যায় তাকে। সেখানেও তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা পান। অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত নাটক-টেলিছবিতে দেখা গেছে তাকে। সুস্থ হয়ে আবারও অভিনয়ে ফিরে আসার ইচ্ছে রয়েছে তার।

দেখুন এটিএম শামসুজ্জামানের জন্মদিন পালনের ভিডিও :

এলএ/এমকেএইচ

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও - [email protected]