আমি অযোগ্য বলেই হয়তো অভিনয়ের জন্য ডাকে না : আব্দুল আজিজ

বিনোদন প্রতিবেদক
বিনোদন প্রতিবেদক বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:২২ পিএম, ১২ আগস্ট ২০২০

মঞ্চ, রেডিও, টিভি ও সিনেমা; সবখানেই গেল কয়েক দশক ধরে জনপ্রিয় অভিনেতা আব্দুল আজিজ। রেডিওর প্রায় ১৬০০ নাটকে অভিনয় করেছেন। টিভিতে ৬ শতাধিক আর ১০০টিরও বেশি সিনেমার সফল অভিনেতা। মঞ্চেও সরব উপস্থিতি। তিনি একজন নির্মাতা, লেখকও।

এত গুণ যার, এত যার ক্যারিয়ারের বৈচিত্র ও বিস্তৃতি সেই মানুষ আজ আড়ালে। কোথাও নেই তিনি। কেউ মনেও রাখেনি তাকে। বলছি অভিনেতা আব্দুল আজিজের কথা।

এই অভিনেতা জানালেন, ১৯৬৭ সালে সৌরভ আউয়াল পরিচালিত ‘অপরিচিত’ সিনেমার মাধ্যমে রূপালি পর্দায় অভিষেক হয় তার। ছোট একটি চরিত্র। তবে সিনেমায় নিয়মিত হন ১৯৭৫ সাল থেকে প্রয়াত চাষী নজরুল ইসলামের হাত ধরে। তারপর সোনা বউ, হাজার বছর ধরে, আরশি নগর, রুপ নগর, মাটির কসম, দিপু নাম্বার টু, রাবেয়াসহ ১০০টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। বেশির ভাগ সিনেমাতে মন্দ মানুষ হিসেবেই হাজির হতেন।

১৯৭৫ সাল থেকে টেলিভিশনেও নিয়মিত কাজ শুরু করেন। বিটিভির শিশুদের হাসির সিরিয়াল জুই জোনাকী, হিরামনসহ অনেক নাটকে কাজ করেছেন। টেলিভিশনে সব মিলিয়ে ৬ শতাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন। ‘ইত্যাদি’রও নিয়মিত একজন শিল্পী তিনি। ইত্যাদি’র প্রথম পর্ব প্রচার হয় ১৯৮৯ সালে। সেই সময় থেকেই তিনি আছেন এখনো।

এর বাইরে একেবারেই অনিয়মিত। বলা চলে দেখাই যায় না তাকে। কেন? তিনি অভিনয় করতে চান না নাকি অভিনয়ের ডাক পান না? দীর্ঘ আলাপচারিতার চুম্বক অংশ থেকে বিস্তারিত জানাচ্ছেন অরণ্য শোয়েব-

জাগো নিউজ : আপনার বর্তমান ব্যস্ততা কি ?
আব্দুল আজিজ : এই করোনার মধ্যে তো কোনো ব্যস্ততাই নেই। বাসায় থাকি। লেখালেখি চলে মাঝেমধ্যে। এ জীবনে এত দীর্ঘ সময় ঘরে থাকা হয়নি কখনো। সুযোগটা যখন এলোই কাজে লাগাচ্ছি। পরিবারকে সময় দিচ্ছি।

আর কিছু নাটকের প্রস্তাব পেয়েছি। গল্প দিয়ে গেছে। ওগুলো পড়ছি। কাজে তো ফিরতে হবে। মিস করছি শুটিং স্পট।

জাগো নিউজ : করোনার মধ্যে এই মুহূর্তে নাটকের শুটিংয়ে ফিরবেন?
আব্দুল আজিজ : খুব তো কাজ পাই না। কেউ ডাকেই না। দুই একটা নাটকের কাজ এসেছে। আমি বলে দিয়েছি যে যদি সাবধানতা অবলম্বন করে কাজ করতে পারে তাহলে যাবো। ঈদের আগে তো শুনলাম বেশ কয়েক শিল্পী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন শুটিং করতে গিয়ে। তাই ভয় তো হয়ই।

জাগো নিউজ : সর্বশেষ কবে কাজ করেছেন?
আব্দুল আজিজ : অনেকদিন আগে। এখন যদি নাটকে ফিরতে পারি সেটা প্রায় ছয় মাস পর হবে। এরমধ্যে শুধু ঈদের দুটো প্রোগ্রাম করেছি টিভিতে। কোনো নাটক করিনি। হানিফ সংকেতের একটি কাজ ছিল আরেকটি অন্য জনের।

জাগো নিউজ : আগে বিটিভি খুললেই আপনাকে দেখা যেত। নানা রকম চরিত্র। এখন তো অনেক চ্যানেল। আরও বেশি দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু সে অনুযায়ী বলা চলে আপনার উপস্থিতি একেবারে নেই। কারণ কি ?
আব্দুল আজিজ : আসলে আমি অভিনয় কমিয়ে দিয়েছি ব্যাপারটি তা নয়। হয়তো এখন যারা প্রযোজক ও পরিচালক তারা প্রয়োজন মনে করেন না আমাকে। হয়তো আমি অযোগ্য, তাই তারা অভিনয়ে ডাকে না।

তাছাড়া এখন তো পারিবারিক গল্পের নাটক অনেক কম। সেটা তো দেখি আমরা। এখন তো বেশিরভাগ নাটকই শুধু নায়ক-নায়িকা আর তার দুই একজন চ্যালা ফ্যালা নিয়ে হয়ে যাচ্ছে। কাজ করবো বা কাজের সুযোগ পাবো সেই চরিত্রই তো নেই। সিস্টেমটাই আসলে পাল্টে গেছে। এখন নাটকে বাজেট কম, তাই প্রযোজক অতো বড়সড়ো কোনো আয়োজন করে নাটক বানাতে চান না। শর্টকাটে শেষ করেন। সেজন্যই আমার মতো শিল্পীদের সুযোগ কমে গেছে বা বলা যায় শেষ হয়ে গেছে। ওই সিস্টেম শর্ট করতে গিয়ে গল্প, আয়োজন ও চরিত্র কাট হয়ে গেছে আর কী। সেইসঙ্গে দর্শকের চাহিদাও কিন্তু কেটে ফেলা হয়েছে।

Aziz

যেভাবে আগে দেখতাম পারিবারিক গল্প হতো এবং বিশেষ যে চরিত্রগুলো খালা, খালু, মামা, মামী, চাচা, চাচী ইত্যাদি চরিত্র থাকতো। দর্শক সবগুলো চরিত্রই পছন্দ করতেন। কিন্তু এখন এসবের কিচ্ছু নেই।

জাগো নিউজ : আপনি একজন লেখক, নির্মাতা ও অভিনেতা। এই তিনটার মধ্যে কোনটি বেশি চ্যালেঞ্জিং মনে হয়?
আব্দুল আজিজ : ক্ষেত্রবিশেষে সবগুলোই আসলেই চ্যালেঞ্জিং। যখন যেটা করা হয় সেটি চ্যালেঞ্জ নিয়েই করতে হয়। কারণ আমি যে কাজটি করি সেটি যুদ্ধ করে করি। চেষ্টা করি সবসময় নিজেকে ভাঙতে। দর্শকের প্রত্যাশার কথাও মাথায় রাখতে হয়। সত্যি কথা বলতে দর্শককে সন্তুষ্ট করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেটা একজন নির্মাতাকে নিতে হয়, যারা অভিনয় করেন তাদেরকে নিতে হয়। একজন লেখকেরও চ্যালেঞ্জ থাকে পাঠকের সন্তুষ্টি নিয়ে।

জাগো নিউজ : এখনকার নাটকের মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকে। কি বলবেন এই ব্যাপারে ?
আব্দুল আজিজ : আসলে এই প্রশ্নটা তো সবসময়ই থাকে। এখন একটু বেশি হচ্ছে আরকী। সুড়সুড়ি দিয়ে হাসানোর যুগ এসে গেছে। প্রচুর নাটক হচ্ছে, কিন্তু মানটাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না সে অনুযায়ী। তবে সব খারাপ আমি এটা মানি না। অনেক নাটক দেখি যেগুলো খুবই দারুণ লাগে। এই ঈদেও কিন্তু খুব ভালো কিছু কাজ হয়েছে। সেগুলো তেমন করে আলোচনায় আসে না। কথা হয় মন্দ কাজগুলো নিয়ে।

আরেকটা কথা বলবো, নতুন প্রজন্মেও আমাদের অনেক মেধাবী নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী রয়েছে। ভালো কাজের সুযোগ হয়তো তারা পাচ্ছে না। সময়ের সাথে সাথে এরাই কিন্তু সঠিক জায়গাটায় পৌঁছাবে। সেজন্য যারা এখন সবকিছু ডমিনেট করছেন, তাদের উচিত এদের মেধার সঠিক ব্যবহার করা।

জাগো নিউজ : নাটকে এই মুহূর্তে কোন বিষয়টির ঘাটতি আছে বলে মনে করেন ?
আব্দুল আজিজ : প্রথমেই আমি বলবো পারিবারিক গল্পের ঘাটতি আছে। আসলে পারিবারিক গল্প হলেই কিন্তু একটা ঘরে পরিবার নিয়ে সবাই নাটকটি দেখবে টিভি সেটের সামনে বসে। ছোট-বড় সবার বিনোদন থাকতে হবে। অনেক চরিত্র থাকা চাই। একটি ঘরের মধ্যে খুঁটিগুলো না থাকলে ঘরটা আসলে মজবুত হয় না এবং ঘরটি পরিপূর্ণও হয় না। নাটকে পার্শ্ব চরিত্রগুলোকে খুঁটি বলা বলা যায়। প্রতিটি চরিত্রের সাথেই দর্শক নিজেকে মেলাতে চায়।

জাগো নিউজ : আবার কবে চলচ্চিত্রে দেখবো আপনাকে?
আব্দুল আজিজ : আমাদের সবার প্রিয় নির্মাতা অমিতাভ রেজার ‘রিকশা গার্ল’ সিনেমায় কাজ করেছি আমি। খুবই চমৎকার কাজ। এটি মুক্তি পেলেই আমাকে দেখতে পাবেন দর্শক।

জাগোনিউজ স্পেশাল : শেষ দুই প্রশ্নের উত্তর চাই।
১/ আপনার চোখে এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভালো অভিনেতা অভিনেত্রী কে?
উত্তর : কঠিন প্রশ্ন। এটা আসলে বলা মুশকিল। প্রতিনিয়তই আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে মেধাবীরা আসছেন। অনেকেই আছেন ভালো কাজ করছেন।

২/ এই প্রজন্মের অভিনেতা অভিনেত্রীদের মধ্যে কি ঘাটতি কি আছে?
উত্তর : আমার মনে হয় এখন যারা নাটকে কাজ করতে আসে তারা মনেপ্রাণে এই বিশ্বাসটাই নিয়ে আসে যে ‘কাজ করলেই আমি স্টার হয়ে যাবো। গাড়ি-বাড়ি করবো, পয়সা কামাবো’। এই চিন্তাটা সবারই। এইসব চিন্তা করলে অভিনয়শিল্পী হওয়াটা অনেকটাই বাঁধাগ্রস্ত হবে। হচ্ছেও। অনেককে দেখি দুই বছর জমিয়ে কাজ করেছে। তারপর আর নেই। এটা খুব খারাপ। যেহেতু এটা পেশা টাকা-পয়সার চিন্তা তো থাকবেই। খ্যাতিও আসবে। কিন্তু সেটা স্বাভাবিক হতে হবে। সেটাকে ন্যাচারাললি ওয়েতে রিসিভ করতে হবে। বিনয়ী থাকতে হবে। আজকাল তারকাদের আচরণ নিয়ে অনেক বাজে কথা শুনি। এটা খারাপ। শিল্পীর আচরণ হবে শৈল্পিক।

এলএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]