গাজী মাজহারুল আনোয়ার : বাংলা গানের সূর্য

লিমন আহমেদ
লিমন আহমেদ লিমন আহমেদ , বিনোদন প্রধান
প্রকাশিত: ১২:১৪ পিএম, ০২ অক্টোবর ২০২০

মানুষ এক জীবনে হাজার হাজার কোটি টাকা উপার্জন করে, গাড়ি করে, বাড়ি করে; একটা সময় সবই চলে যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও শান শওকতের অধিকারী সম্রাটের ক্ষমতা হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। মাটিতে মিশে গেছে মানুষের গড়া অনেক গর্বিত সভ্যতাও। তার ভিড়ে কিছু মানুষ এমন কিছু কাজ করে গেছেন যা শত সহস্র বছর পেরিয়েও এই পৃথিবীতে টিকে আছে নন্দিত হয়ে, অনুপ্রেরণায়।

সেই অনুপ্রেরণার পৃথিবীতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার লিখলেন অনবদ্য এক ইতিহাস। প্রায় ৩০ হাজার গান লিখেছেন তিনি। যা অবিশ্বাস্য, বিস্ময়কর ও অসাধারণ এক সাফল্য। মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, প্রকৃতি, জীবনবোধ, প্রেম, বিরহ, স্নেহ; অনুভূতির বৈচিত্রময় প্রকাশে গেল কয়েক দশক ধরেই এদেশের মানুষের কাছে খুব প্রিয় গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা গান। অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা তিনি। আমাদের সংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি। বিবিসি বাংলার তৈরি করা করা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশটি বাংলা গানের তালিকায় রয়েছে তার লেখা তিনটি গান। এটাও এক বিরল সম্মান বটে।

গানের বাইরেও গাজী মাজহারুল আনোয়ার বিকশিত হয়েছেন একজন চলচ্চিত্র চিত্রনাট্যকার, পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবেও। কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে এক জীবনে কোটি মানুষের ভালোবাসা ও দোয়াকেই সেরা বলে মনে করেন। পেয়েছেন বেশ কয়েকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তিনি ২০০২ সালে বাংলাদেশের একুশে পদকও লাভ করেন।

সম্প্রতি তার বাসভবনে হয়ে গেল এক ঘরোয়া আড্ডা। যেখানে চেনাজানা সদালাপী গাজী মাজহারুল আনোয়ারকেই পাওয়া গেল। পাশাপাশি জানা গেল তার কিছু অজানা অধ্যায়-

কুমিল্লায় সূর্য উঠেছে
জন্মেছেন কুমিল্লায়। দাউদকান্দি থানার তালেশ্বর গ্রাম তার। বনেদি পরিবারের সন্তান। দাদা ও দাদি দুজনই ছিলেন জমিদার বংশের। বাবা ব্রিটিশ আমলের আইনজীবী। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। বেড়ে উঠেছেন কুমিল্লাতেই। তার প্রথম স্কুল কুমিল্লা জেলা স্কুল। এরপর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। জীবনের দারুণ সময় কেটেছে তার কুমিল্লায়। শিক্ষীজীবনের সেইসব দিন আজও ফিরে এসে স্মৃতির আয়নায় ভেসে উঠে, ডুবে যায়; সোনালি পোশাকে।

বড় দুঃখ নিয়ে বাবা লিখলেন, ‘ইউ আর মাই লস্ট গেম’
সব পিতামাতাই প্রত্যাশা করে ছেলে বড় হবে, নাম করবে। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের বাবা ও মা-ও সেটা করতেন। সন্তান নিয়ে এটুকু বাবা-মায়ের অধিকার। তবে তাই বলে ছেলের স্বাধীন জীবনে তারা খুব একটা হস্তক্ষেপ করেননি। কারণ ছোটবেলা থেকেই ভিষণ মেধাবী ছিলেন গাজী। বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। আইনজীবী বাবা চাইতেন ছেলে ডাক্তার হবে। কলেজ শেষ করে ছেলে ভর্তিও হলেন ঢাকা মেডিকেলে। কিন্তু ওষুধের গন্ধ, মরে পঁচে গলে পড়ে থাকা লাশের গন্ধ, হাসপাতালের দিনযাপন সহ্য করতে পারলেন না। সিদ্ধান্ত নিলেন ডাক্তারি ছেড়ে দেবেন। সুন্দরী ক্লাসমেট অবাক হলো। সে সাহস দিলো, বললো সবরকম সহযোগিতা করবে। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। এই সেই। গাজী মাজহারুল আনোয়ার ধারণা করলেন ওই সুন্দরী সহপাঠিনী তার প্রেমে পড়েছেন। তবে সেই প্রেম ডাক্তারি পড়ার সাহস দিতে পারলো না। অগ্যতা ‘বিদায় জিন্দাবাদ’ বলে দিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজকে। সেই সময়টাতেই তিনি শুরু করলেন গান লেখা। এ খবর বাবার কানে যেতেই বাবা বড় বিষাদ-বেদনা নিয়ে চিঠি লিখলেন, ‘ইউ আর মাই লস্ট গেম’।

‘প্রথমত বাবা মানতে পারেননি আমি ডাক্তারি ছেড়ে দিয়েছি। তারপর যখন শুনলেন আমি গান লিখে বেড়াচ্ছি খুব হতাশ হয়ে গেলেন। ধরেই নিলেন ছেলের গতি আর হবে না। বড় দুঃখ নিয়ে তিনি আমাকে চিঠিতে লিখেছিলেন, আমি তার হারিয়ে যাওয়া নাম। তবে সেই কথায় তিনি অটল থাকতে পারেননি। যখন বেশ নাম ডাক হলো একদিন ডাকলেন। কাছে যেতেই বুকে জড়িয়ে নিলেন। বললেন, ‘তুমি কখনোই আমার হারিয়ে ফেলা ছেলে নও।’ সেদিন খুব আনন্দ হয়েছিলো। মনে হয়েছিলো যাক, বাবার স্বপ্ন পূরণ না করতে পারলেও তাকে অন্তত লজ্জিত করিনি বোঝা গেল’- যোগ করেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

Gazi-05.jpg

দাদার দেয়া রঙিন সেই পাঁচ টাকার নোট
আমার দাদা জমিদার ছিলেন। বিশাল এলাকা ছিলো তার। দাদীও জমিদার বাড়ির মেয়ে। ছেলেবেলায় দাদা-দাদীর কাছে যেতাম, দারুণ সময় কাটতো। দাদা ছিলেন সুফি টাইপের মানুষ। অনেক কিছু চিন্তা করে কাজ করতেন, কথা বলতেন। একবার আমের মৌসুমে বাড়ি গেলাম। দাদা একটা একটা করে আম খেতে দিচ্ছেন। তাই দেখে দাদী রেগে গেলেন। বললেন, ‘চারদিকে এত এত আম গাছ। আম পড়ছে, পঁচে গলে যাচ্ছে। আর তুমি আমাদের নাতিদের গুনে গুনে আম খাওয়াচ্ছো?’ দাদা উত্তর দিলেন, ‘দেখো আমি ওদের একেক প্রজাতির আম একটা একটা করে খাওয়াচ্ছি। যাতে করে ওরা বুঝতে পারে ভালো কোনটা আর মন্দ কোনটা। জীবনে ভালো মন্দ বিচার করতে পারাটা জরুরি। ছেড়ে দিলে ওরা তো সব আম একসাথে খেয়ে বুঝতে পারবে না কোনটার স্বাদ কেমন।’ দাদার সেই কথাটা আজও মনে পড়ে।

সেই দাদা আমাকে প্রথমবার গানের জন্য পারিশ্রমিক দিয়েছিলেন। গল্পটা হলো গ্রামে তখন কিছু লোকজন দলবেঁধে গান শোনাতো। লোকে তাদের গান শুনে টাকা দিতো। সেটা বেশিরভাগ সময়ই রাতের বেলায় হতো। একদিন সকালে দাদা আমাকে বললেন, ‘কাল রাতে গানের দল যে গানটি গেয়েছে তুমি কি তার দুটি লাইন বলতে পারবে? যদি পারো পাঁচ টাকা পাবে।’ চেয়ে দেখলাম দাদার সাদা পাঞ্জাবীর বুক পকেটে লাল রঙের পাঁচ টাকার নোট। টাকার লোভে হরহর করে বলে দিলাম গানের দুটি লাইন। সেটি ছিলো গানের কোরাস। বারবার গাইছিলো শিল্পীরা। তাই মনে ও মগজে ঢুকে গিয়েছিলো। দাদা শুনে খুব খুশি হলেন। টাকাটাও দিলেন।

দাদা ওই বয়সে পাঁচ টাকার লোভ দেখিয়ে ভালো করলেন না মন্দ করলেন জানি না। তবে গানের জন্য আমাকে প্রথম পারিশ্রমিকটা দাদাই দিয়েছিলেন। সেটা হয়তো একটা ইশারা ছিলো আমি গানেই ক্যারিয়ার গড়ে তুলবো।

ষাট দশকে মালিবাগের উত্তাল দিনগুলো
ষাটের দশক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন। নানা ইস্যুতে উত্তাল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। মিছিল, মিটিং, আন্দোলন, বিপ্লব- চলছেই। তখন মালিবাগে থাকতেন তরুণ গাজী মাজহারুল আনোয়ার। এক ভ্যান চালক স্ত্রীকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তাকে রান্না করে খাওয়াবে সেই চুক্তিতে। ১৯৬৩ সাল থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি গান লেখালেখি শুরু করেন তিনি।

তখন আলতাফ মাহমুদদের মতো গুণি মানুষদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। ডিআইটি রোডে বিটিভি তখন। সেখানকার স্টুডিওতেই কাটতো সময়। নিয়মিত যেতেন রেডিওতেও। দেশের গানের সোনালি যুগ চলছিলো। তবে অস্থিরতার মধ্যেও সময় কাটাতে হতো। যখন তখন পুলিশ-মিলিটারির হানা।

আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে ইয়াহিয়া খানকে নিয়ে একটি গান লিখে বিপদে পড়ে গেলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। তার নামে ওয়ারেন্ট জারি হলো। আলতাফ মাহমুদ বলে দিলেন একটু সাবধানে থাকতে। বাধ্য হয়ে লুকিয়ে চলাফেরা করতে হতো।

‘এইসব আতঙ্কের মধ্যেই ডিআইটি রোডে বিটিভির স্টুডিওতে বসে আছি। নতুন গানের কাজ চলছিলো। হঠাৎ বিকট আওয়াজ। সবাই ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আমি আর বের হতে পারিনি। মিলিটারি এসে ধরলো। পরিচয় দিলাম গান লিখি। বললাম যে সরকারি রেডিও-টিভি’র জন্য গান লিখি। ফিল্মেও চেষ্টা করছি। ওরা খুব একটা বিশ্বাস করলো না। বললো, ‘তাহলে চল, এফডিসির রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে চল আমাদের।’ কি আর করা। ভয় নিয়েই ওদের সঙ্গে গাড়িতে উঠে বসলাম। পিঠে বন্ধুক ধরা। মনে মনে ভাবছি, ইয়াহিয়া বিরুদ্ধে গানটা যে লিখেছি আমি সেটা ওরা জানে না, এই রক্ষা। এফডিসি নিয়ে গেলাম। তখন গেট ছিলো পেছনের দিকে। এফডিসি চিনি দেখে ভাবলো যে মিথ্যে বলিনি। গেটের সামনে নিয়ে একটা লাথি মেরে আমাকে ফেলে চলে গেল। ব্যথা পেয়েছিলাম কি না সেটা আর অনুভব করিনি। ওরা চলে গেছে তাতেই শান্তি। তখন বিশাল গোফওয়ালা এক দারোয়ান ছিলেন এফডিসিতে। তিনি আমাকে চিনতেন। ভেতরে নিয়ে তিনি সেবা করলেন’- স্মৃতিচারণে বললেন কিংবদন্তি গীতিকবি।

তিনি জানান, এই মিলিটারিরা বাংলাদেশ বেতারের অনেক ক্ষতি করে গেছে। যাবার সময় সব কাগজপত্র পুড়িয়ে দিয়েছিলো তারা। অনেক গানের কোনো হিসেব পাই না আমি। হয়তো আরও অনেকেরই এমনটা হয়েছে।

Gazi-05.jpg

মায়ের চিঠির জবাব দিতে গিয়ে তৈরি হলো বিখ্যাত গান
আমি পুলিশ-মিলিটারির ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অনেকদিন বাড়ি যাই না। মা চিঠি লিখলেন। ঝাপসা লেখার একটা চিঠি। মনে হয় লিখতে লিখতে কাঁদছিলেন। কাগজে চোখর পানি পড়েছিলো। হয়তো অনেক কিছুই লিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কীভাবে কী বলবেন বুঝে উঠতে পারেননি। বকবেন নাকি শাসন করবেন! মাত্র এক লাইনের একটি চিঠি দিলেন। তার জবাব দিতে আমি লিখলাম, ‘মাগো আর তোমাকে ঘুম পাড়ানি মাসি হতে দেবোনা/ তোমার মাথার খোঁপারই ফুল বাসি হতে দেবোনা/ তোমায় মাগো কারো ঘরের দাসি হতে দেবোনা’। সেটি পরে গান হিসেবে লিখে শেষ করি। গেয়েছিলেন সাবিনা ইয়াসমিন। এটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো।

জয় বাংলা বাংলার জয়
১৯৭০ সালের ৭ মার্চ, রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিলেন। দেশের মানুষ ঝাপিয়ে পড়লো স্বাধীনতার জন্য সেই ডাকে সাড়া দিয়ে। বঙ্গবন্ধু ভাষণ শেষ করলেন ‘জয় বাংলা’ দিয়ে। সেই জয় বাংলার বারুদ ছড়িয়ে গেল সর্বত্র। যেদিন ভাষণ দিলেন সেদিনের সন্ধ্যায় ফার্মগেটে একটি স্টুডিওতে বসে আছি। সেটি তখন খুব বিখ্যাত স্টুডিও। বড় বড় সব গানের মানুষদের আনাগোনা। সেখানে ছিলেন সালাহউদ্দিন স্যার। তিনি আমার স্কুলের স্যার ছিলেন। বললেন, ‘জয় বাংলা’ নিয়ে একটা কাজ করতে পারো। এই মুহূর্তে এটা প্রচার করা খুব জরুরি। মানুষকে উৎসাহ দেবে। আমি ভাবতে থাকলাম ‘জয় বাংলা’ নিয়ে কি লেখা যায়। শেষে বাংলা শব্দটা থাকলে ছন্দ মেলাতে কষ্ট হচ্ছে। ভালো শব্দ পাই না। বাংলা, হ্যাংলা....! তারপর সেটাকে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ করে নিলাম। দেখলাম দ্রুতই গান দাঁড়িয়ে গেল। আনোয়ার পারভেজকে ফোন করে বললাম স্টুডিওতে আসতে। সঙ্গে যেন শাহিনকেও (সংগীতশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ) নিয়ে আসে। আব্দুল জব্বারকেও আসতে বললাম।

এদিকে হঠাৎ ঢুকলেন আলতাফ মাহমুদ। তিনি দেখলেন আমি লিখছি। কাগজটা নিয়েই বললেন, ‘বাহ, দারুণ হয়েছে তো। দে সুর করি।’ কাগজটা নিয়ে হারমোনি টান দিয়ে বসেই সুর করে ফেললেন। আমি বললাম, ‘আনোয়ার পারভেজ আসছে। আপনি বসেন।’ পরে আনোয়ার পারভেজ এলো, আলাউদ্দিন আলী এলো, জব্বার, শাহিন। সবাই মিলে দেখলাম গানটি তৈরি হলো। এর সুর-সংগীত করলো আনোয়ার পারভেজ। শাহিন আর জব্বার গাইলো। সঙ্গে আরও অনেক শিল্পী ছিলেন। গান তৈরি করে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি শুনে খুব পছন্দ করলেন। বললেন এই গান দিয়েই যাত্রা করবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। আর গান প্রকাশ হতেই রাতারাতি সবার মুখে মুখে চলে গেল ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’।

ওস্তাদ সত্য সাহা এবং সিগেমার প্রথম গান
আমার ওস্তাদ সত্য সাহা। তার স্নেহ-ভালোবাসা আমার জীবনের জন্য আশির্বাদ হয়ে এসেছে। তার হাত ধরেই সিগেমায় গান লেখা শুরু করলাম। মুক্তিযুদ্ধের আগে আগে। আমাকে নিয়ে গেলেন সুভাষ দত্তের কাছে। বললেন আপনার নতুন ছবিতে এ ছেলে গান লিখবে। সুভাষ দত্ত আমার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, অল্প বয়স। ভালো করে গোফই উঠেনি। তিনি বিরক্ত হলেন। সত্য সাহার জন্য কিছু বলতেও পারলেন না। আমাকে গানের সিচুয়েশন বুঝিয়ে দিয়ে ভেতরে চলে গেলেন।

আমি আর সত্য দা চেষ্টা করে যাচ্ছি। উনি বললেন, একদম টেনশান করবি না। তুই পারবি। জাস্ট সিচুয়েশনটা কল্পনা করে দেখ মনে কি আসে। ব্যস, লিখলাম প্রথম লাইন, ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’। সেটাই সুরে তুললেন সত্য দা। আরও কয়েক লাইন লিখলাম। আমাদের কাছে এসে সুভাষ দা বললেন, ‘এই, ভালোই তো লাগছে জিনিসটা। শেষ করো তাহলে।’

গান শেষ হলো। ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ সিগেমায় আঞ্জুমান আরা বেগমের গাওয়া সেই গানের আবেদন আজও ফুরায়নি।

বন্ধুরাজ রাজ্জাক.....
একটা সময় চলচ্চিত্রের মানুষদের আড্ডার প্রিয় স্থান ছিলো প্রয়াত নায়করাজ রাজ্জাকের বাসা আর গাজী মাজহারুল আনোয়ারের বাসা। এই দুজন আবার ছিলেন বিশেষ বন্ধু। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ভাষায়, ‘চলচ্চিত্রে যদি কেউ আমার বন্ধু থেকে থাকে সে হচ্ছে রাজ্জাক। আমি প্রায় ৪৩টি ছবি প্রযোজনা করেছি, তার প্রায় সবগুলোতেই রাজ্জাক অভিনয় করেছেন। কত বিপদ আপদের বন্ধু সে আমার। ওর মতো বন্ধু থাকলে আড্ডার জন্য তৃতীয় ব্যক্তি খোঁজা লাগে না। একাই জমিয়ে রাখতে পারতো।’

তাকে হারিয়ে ফেলাটা চলচ্চিত্রের জন্য ‘গ্রেট লস’ বলে মনে করেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

Gazi-05.jpg

শাবানার দেয়া কষ্ট মুছে দিলেন শবনম
ছবির নাম সন্ধি। রাজ্জাক, শবনম, জাফর ইকবাল, সুচরিতা অভিনীত এ ছবি সুপারহিট হয়েছিলো। ঠিক হলো রাজ্জাক-শাবানা জুটি কাজ করবেন। সব চূড়ান্ত। শুটিংয়ের কয়েকদিন আগে শাবানা বলে দিলেন তিনি কাজটি করতে পারবেন না। শিডিউল মিলছে না। কষ্ট পেলেন ছবির প্রযোজক, পরিচালক গাজী মাজহারুল আনোয়ার। ঘটনা শুনে নায়ক রাজ্জাকও বিরক্ত হলেন। তিনি বলে দিলেন, ‘দেখ গাজী, এই ছবিতে শাবানার মতো তারকাকেই নিতে হবে। প্রয়োজনে আমি পারিশ্রমিকে ছাড় দেবো। তুই ব্যবস্থা কর যেমনে পারিস।’ বিষয়টা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল। অনেক ভেবে চিন্তে গাজী মাজহারুল আনোয়ার ফোন করলেন বলিউডের বিখ্যাত গীতিকবি জাভেদ আকতারকে। তার স্ত্রী শাবানা আজমিকে কাস্ট করবেন ‘সন্ধি’ ছবিতে। মোটামুটি সব ঠিক হলো। কিন্তু সেখানেও জটিলতা দেখা দিলো। পরে সত্য সাহা ঘটনা শুনে পরামর্শ দিলেন শবনমকে নেয়ার জন্য।

‘উনার নাম মাথাতেই ছিলো না। সত্য দা মনে করিয়ে দিলেন। আমি যেন আকাশ ধরে ফেললাম হাতে। যেভাবেই হোক শবনমকে নিয়েই কাজটি করবো ঠিক করলাম। তিনি পাকিস্তান পিরিয়ড থেকেই তুমুল জনপ্রিয় নায়িকা। তার স্বামী রবিন ঘোষের সঙ্গে আমি কাজ করেছি। খুব ভালো পরিচয়। কথা বললাম। তিনি শবনমের নাম্বার দিলেন, তাকে বলেও দিলেন আমার কথা। শবনম তখন লন্ডনে। ফোনে কথা হলো। কোনোদিন ভুলবো না। সে কি রেসপেক্ট, কী আন্তরিকতা। ছবির প্রস্তাব পেয়েই বললেন, ‘আমার স্বামী বলে দিয়েছে আমি যেন আপনার কাছে কোনো পারিশ্রমিক না চাই। তা কবে থেকে শুটিং শুরু করবেন বলুন। আমি প্রস্তুত।’ তার মুখে কথাগুলো শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলাম। সব চূড়ান্ত করে রাজ্জাককে জানাতেই সে লাফিয়ে বললো, ‘শাবানার না থাকার চেয়ে বড় খুশির খবর হলো শবনম আছেন।’

বউ..... তোমারে সেলাম
১৯৭২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গাজী মাজহারুল আনোয়ার জোহরা হোসেইনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। জোহরা হোসেইন বিটিভির সংবাদ পাঠিকা, মহিলাবিষয়ক সংস্কৃতি অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ইস্ট পাকিস্তান স্পোর্টসের রানিং আইটেম চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থা দেশ চিত্রকথার কর্ণধার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে সবকিছু থেকেই হঠাৎ অব্যাহতি নেন। মন দেন সংসারে। কারণ, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়লে ভোগান্তির শিকার হবে সংসার-সন্তান।

গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘কীভাবে বললে বলা হবে জানি না, তবে আমার স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। নারীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কবি নজরুলের মতো আর কোনো কবি এভাবে বলতে পারেননি, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’ এই আমি আজকের যে মানুষটা, এত নাম, সুনাম আর আলোচনা- সবকিছুর পেছনে আমার স্ত্রীই আসল শিল্পী। সে নিজের ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস করে আমাকে সবরকম চিন্তা থেকে, ব্যস্ততা থেকে মুক্তি দিয়ে সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। সংসার সামলেছে, সন্তান মানুষ করেছে।’

প্রেমিকাদের জন্য- এই মন তোমাকে দিলাম
গীতিকার হিসেবে পরিচিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে ভক্তও বেড়ে গেল অনেক। প্রায়ই চিঠি পেতাম। অনেকে লিখতেন তাকে নিয়ে যেন একটা গান লিখি। অনেক আড্ডা-অনুষ্ঠানেও অনেকে বলতেন, তাকে নিয়ে যেন একটা গান লিখি। আমারও ইচ্ছে করতো লিখি (হা হা হা)। কিন্তু এতজনের জন্য গান লেখা তো পসিবল না। তাই সবাইকে খুশি করতে লিখলাম, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’। এরপর যেই বলেছে, আমাকে নিয়ে একটা গান লেখো, তাকেই বলেছি ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ শুনে নিও।

মুক্তির দূত বঙ্গবন্ধু
বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন কাছ থেকে। তার স্নেহের স্পর্শ নেয়ার সৌভাগ্যও হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অস্ত্র হাতে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধেও। তাকে নিয়ে আজ নানা রকম অবমূল্যায়ন ব্যথিত করে গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে। তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষকে স্রষ্টা পাঠান মুক্তির দূত হিসেবে। এরা স্পেশাল ওয়ান। আসেন, মুক্তির আলো ছড়িয়ে যান। আমাদের জন্য এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি আমাদের এখানে নেতাদেরও নেতা, দেশ ও দেশের মানুষের সবচেয়ে আপনজন। তার মতো বড় দেশপ্রেমিক এদেশে কেউ নেই, হবেও না। আমৃত্যু দেশের জন্য তিনি কাজ করেছেন। সবাই যখন চুপ বা আপোষের কথা ভাবছেন তখন তিনি প্রতিবাদ করতে পারতেন। এজন্য তাকে বহু নির্যাতনও ভোগ করতে হয়েছে। কারাগারে গিয়েছেন বহুবার। তার জন্য একটা স্যুটকেস সবসময়ই তৈরিই থাকতো। যখন পুলিশ আসতো তিনি বেগম মুজিবকে ডাকতেন, ‘কই জামাল কামালের মা, ব্যাগটা গুছিয়ে দাও।’ এমনভাবে বলতেন মনে হতো বেড়াতে যাচ্ছেন।

তার ব্যক্তিত্ব চুম্বকের মতো টানে। তাকে যারা সামনে থেকে দেখেছেন সেটা তারাই অনুধাবণ করতে পারবেন। তার প্রতি মুগ্ধ হয়েই লিখেছিলাম, ‘হে বন্ধু বঙ্গবন্ধু তোমার কালো ফ্রেমের চশমাটা আমায় দাও, আমি চোখে দিয়ে দেখব তুমি কেমন করে দেশটাকে এত ভালোবাসো, যতবার চাই কাছে পেতে ততবারই তুমি আসো, তুমি গানের মতো আসো, তুমি কবিতার মতো আসো’ কবিতা। মুক্তিযুদ্ধের পর যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম কবিতাটি নিয়ে গিয়েছিলাম। শুনেছিলাম, এটি তিনি বাঁধাই করে ঘরের দেয়ালে রেখেছিলেন। চলতি বছরে কবিতাটি গান হিসেবে গেয়েছেন কুমার বিশ্বজিৎ।

তাকে নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকা উচিত নয়। ভুল মানুষ করে। কিন্তু যার গুণ একটি জাতিকে স্বাধীনতা দিয়েছে, একটি দেশ ও পৃথিবীকে রাজনীতির মাঠে সমৃদ্ধ করেছে তার ভুল নিয়ে আলোচনা করে গর্বিত হবার কিছু নেই। যারা করেন তারা আলোচনার জন্য করেন। ইতিহাসকে ঠেলে ঠেলেও একচুল নড়ানো যায় না।’

বীরাঙ্গনাদের কেউ নেই
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলো। যে হিসেব আমরা পেয়েছি মানুষ তার চেয়েও অনেক বেশি মারা গেছে। তবু দেশ স্বাধীন হলো রক্তের সমুদ্র পাড়ি দিয়ে। সবাই বাড়ি ফিরলো। সবকিছুই আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায়। কিন্তু একটা শ্রেণি অসহায় থেকে গেল। তারা হলেন বীরাঙ্গনা। তাদের কথা কেউ বলেনি, বলতো না। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে হয়তো তারা প্রাপ্য সম্মানটা পেতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেটা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের পর বেশ লম্বা একটা সময় ধরে বীরাঙ্গনাদের অসহ্য় দিনযাপন করতে হয়েছে। তাদের নিয়ে বক্তৃতা হয়েছে, ব্যবসা হয়েছে আবেগের। কিন্তু কাজের কাজটা হয়নি। তাদের সামাজিক সম্মান তৈরি করা যায়নি। সেটা নিয়ে একটা গান লিখেছিলাম। সাবিনা ইয়াসমিন গেয়েছেন। ‘ওকে আর করলো না কেউ বিয়ে/ অনেক কথা লেখা হলো পত্রিকাতে/ অনেক কথা শোনা হলো বক্তৃতাতে/ কত কথা কইলো সবাই ওকে নিয়ে’- কথার গানটির সুর ও সংগীত করেছেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।

Gazi-05.jpg

রাজনীতির নই, আমি সংস্কৃতির
রাজনৈতিক দলগুলোতে আমার গান ও গানের লাইন ব্যবহার হয় এটা নিয়ে অনেক কথাই শুনি। আমি এসব কানে নেই না। আমি মনে রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের জন্য হয়তো জরুরি কিন্তু তার সৃষ্টির জন্য নয়। আমি যা কিছু সৃষ্টি করেছি তার মানুষের জন্য। আমি সংস্কৃতির সেবক হিসেবে আজীবন কাজ করার চেষ্টা করেছি। যখনই মনে হয়েছে রাষ্ট্র বা দেশের রাজনীতির এখন আমাকে প্রয়োজন, আমি সেবা দিতে ছুটে গিয়েছি। এখানে দল একটি মাধ্যম মাত্র, মূল জায়গাটি সেবার। দেশকে ভালোবেসে দেশের জন্য লিখেছি, কথা বলতে চেয়েছি। এটা যুদ্ধের মতোই। ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে গান লিখে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গান লিখে আমাকে আসামি হয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। অনেক গায়ক, নায়ক, পরিচালকরা অনেক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। আলতাফ মাহমুদ, জহির রায়হানের মতো মানুষেরা হারিয়ে গেছেন। তারাও যোদ্ধা। যদিও আমি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছি কিন্তু আমি মনে করি সশস্ত্র যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই আমরা অনেকে যোদ্ধা ছিলাম। যারা সংস্কৃতি দিয়ে যুদ্ধটা করেছি। বঙ্গবন্ধু আমাদের যুদ্ধটার মূল্যায়ণ দিতে পেরেছিলেন। তিনি সংস্কৃতির হাতিয়ারকে কাজে লাগাতে পেরেছেন এদেশের স্বাধীনতার জন্য। কষ্ট হয় ভাবলে, আমাদের সেই সংস্কৃতির আজ কী বেহাল দশা! সংস্কৃতি তার সঠিক জায়গায় নেই বলেই হয়তো রাজনীতি অবস্থাও আজ দুর্বল।

বর্তমানে গান বাজনা
শিল্প ও সংস্কৃতির দেয়ালে এখন হিসু করা হচ্ছে। অবাক হয়ে যাই, কীসব গান লেখা হচ্ছে এগুলো? তাও আবার সিগেমার মতো বিশাল ক্যানভাসে ছাড়া হচ্ছে এসব গান! কেন? উদ্দেশ্যটা কি। এগুলো কখনোই গান হতে পারে না। প্রেম, রোমান্স বা যাপিত জীবনের সবকিছুতেই একটা সৌন্দর্য আছে। সেটার প্রকাশ জানতে হবে। দেয়ালে হিসু করা নিয়ে যদি গান বানানো হয় আর সেটা প্রকাশও হয় তাহলে সংস্কৃতির সৌন্দর্যটা আঘাতপ্রাপ্ত হয়। আমাদের গান, নাটক, সিগেমা, সাহিত্য যা কিছু সংস্কৃতি প্রায় সবখানেই সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলতেন, গানকে পরিবারের মধ্যে আনতে হবে। কারণ গান পরিবার থেকে বিচ্যুত হলে তার আয়ু খুব কম। বা এভাবেও বলা যায়, যে গান পরিবারের মধ্যে বেঁচে থাকে সেই গানই কালজয়ী হয়। এজন্যই নজরুল-রবীন্দ্রনাথের গান কালজয়ী। কারণ তাদের গান পরিবার থেকে সারাদেশে ছড়াতো। যেমন একটা সময় ছিলো যখন যে বাড়িতে গ্রামোফোন থাকতো সে বাড়ির বউয়েরা সপ্তাহে একদিন পাশের বাড়ির বউদের নিয়ে আয়োজন করে গান শুনতেন। নতুন রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুল সংগীত এসেছে বাজারে, আসুন একদিন শুনবেন বলে দাওয়াত দিতেন। বিশেষ রান্না বান্না চলতো। তো দুপুরে খাওয়ার পর সবাই গোল হয়ে বসতেন। বাড়ির গিন্নি গ্রামোফোনে একটা গান বাজিয়ে দিলেন। এখানে গ্রামোফোন থাকার একটা বড়াইও কিন্তু হতো। তো এভাবে যেটা হয়েছে অন্য বউরার তাদের বাড়িতে গিয়ে গ্রামোফোন কেনার বায়না ধরেছে, রবীন্দ্র-নজরুলের গানের ভক্ত হয়েছে। এক এক করে সব ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল এ দুই কবির গান। এটাই কিন্তু হয়েছে এবং হয়।

যেসব গান পরিবারের মধ্যে সম্মান পেয়েছে সেগুলোই জনপ্রিয় হয়েছে, কালজয়ী হয়েছে। আর এখন দেয়ালে হিসু করার গান শুনতে হচ্ছে। এটি কি কোনো পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে শুনবেন? আহা! খুব কষ্ট হয়।

প্রায়ই পার্টি আসে গান চাইতে। তাদের সঙ্গে কথা বলে এত হতাশ হই যে মাঝেমাঝে কাঁদতে ইচ্ছে করে। এ কেমন প্রজন্মে এসে পড়েছি। শিল্পচর্চায় জড়িত কিন্তু শিল্পটাই ধারণ করতে পারছে না। নাম নিতে চাই না কারো। শিখতে হবে। গান বাজনা, আচরণ; সব। শেখার জন্য কোনো আপোষ করা যাবে না। দেখুন, মহানবী (স.) বলে গেছেন, ‘তোমরা শেখার জন্য প্রয়োজনে চীন দেশে যাও।’ একথাটা তিনি কেন বলেছেন? কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তার দেশে শেখার মতো যথেষ্ট তেমন কিছু নেই যা তার জাতিকে জ্ঞানে বুদ্ধিতে শ্রেষ্ট করে তুলবে। সে সময় চীনের সভ্যতা ছিলো বিখ্যাত। মানে হলো যেখানে সঠিক শিক্ষা পাওয়া যাবে সেখানে যেতে হবে। শিখতে হবে। না শিখে কেউ বাঁচবে না, গান, সংস্কৃতি কিছুই বাঁচবে না।

সিগেমার অবস্থা তো আরও ভয়াবহ। কি ইন্ডাস্ট্রি কি হয়ে গেল! কলকাতা এখন ভালো করছে। আমরা কেন পারছি না? আমাদের কি মেধা নেই? আমি মনে করি সব আছে। শুধু সমন্বয় নেই, প্রেজেন্টেশন নেই সঠিকভাবে। আসলে কিছুই ঠিক নেই। যেখানে যার থাকার দরকার সে সেখানে নেই। অনেকে বলে কেন প্রযোজনা করি না। কোথায় করবো? কি বানাবো? কাদের নিয়ে? সে ছবি চালাবো কোথায়। জানিনা উত্তরণ হবে কী করে। তবে হবে তো বৈকি। আশায় আছি।

তারকা সালমান শাহ
সালমানের মা নীলা চৌধুরীর সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করতেন। পারিবারিক সম্পর্ক। উনার স্বামী তো ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। চমৎকার মানুষ। এমন একটা শিক্ষিত পরিবারের ছেলে সালমান সিগেমায় এসেছে। ও খুব লাকি ছিলো। এসেই বাজিমাত করে দিলো। একেবারে সুপারস্টার বনে গেল। খুব চঞ্চল ছিলো। অস্থির। আমার ‘স্নেহ’ ছবিতে কাজ করেছে। এই দেখতাম গিটার নিয়ে দৌড়াচ্ছে, এই হোন্ডা। মানে বসতো না। আনন্দে ডুবে থাকতো। বাট কাজটা করতো মন দিয়ে। অভিনয়টা ওর স্বভাবজাত। যারা বলে সালমান মৃত্যুর পর তারকা হয়েছে তারা ভুল বলে, ইচ্ছে করে বলে। সালমান বেঁচে থাকতেই টপ হিরো ছিলো। ওর তারকা হয়ে উঠা অনেকের জন্য সমস্যা হয়ে গেল ইন্ডাস্ট্রিতে। অল্প দিনেই সবার নজর কেড়েছিলো। আবার যারা নতুন এসেছে তাদের জন্য সালমান ছিলো বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বীকৃতি ও অতৃপ্তি
আমৃত্যু গানের সঙ্গে থাকতে পারছি এটাকেই আমি জীবনের বা ক্যারিয়ারের জন্য সেরা স্বীকৃতি হিসেবে দেখি। এখনো তো গান লিখছি। সবার ভালোবাসায় কয়েক প্রজন্ম পেরিয়েও নতুন প্রজন্মের সঙ্গে লিখে যেতে পারছি। হয়তো খুব একটা খারাপ লিখছি না। গেল কয়েক বছরে কিছু সিগেমায় আমার গানগুলো শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে। শ্রোতারা ভালোবেসেছেন, এটাই স্বীকৃতি। এছাড়া জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি একাধিকবার, একুশে পদক দিয়েছে রাষ্ট্র; এগুলো প্রশান্তি দেয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য দেশের সর্বপ্রথম পুরস্কার বাংলাদেশ প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি সেই ১৯৭২ সালে। দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার পেয়েছি। ভারত থেকেই প্রায় এক ডজন অ্যাওয়ার্ড আছে। আমার বারিধারার এই ঘর (বারিধারায়) ও মালিবাগের আরেকটা বাড়ি আছে সেখানে এক ঘর ভর্তি নানা রকম পুরস্কার আর স্বীকৃতি-সম্মাননায়।

এসব পুরস্কারের জন্য কাজ করিনি। আমার ধারণা কেউ করে না। এগুলো অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে মাত্র। দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছি। এটাই বড় আনন্দ। স্বীকৃতির জন্য নীতি বা মূল্যবোধ বিসর্জান দেইনি কখনো। তাহলে অনেক বড় বড় সুযোগ জীবনে এসেছে, সেগুলো মিস করতে হতো না।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আগে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের একটা যুদ্ধ হয়েছিলো। সে যুদ্ধে ভারতের অনেক সৈনিক মারা যায়। তো আমাদের দেশ স্বাধীন হবার পর আমার কাছে প্রস্তাব এলো ওই যুদ্ধে শহীদ ভারতীয়দের জন্য একটি গান লিখে দিতে। অনেক বড় প্রজেক্ট। শহীদদের নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভ হবে। সেখানে ফলকে লেখা থাকবে আমার লেখা গানটি। ভারতের এত নামি নামি লেখকদের ভিড়ে আমার জন্য এই কাজটি নিঃসন্দেহে অনেক বিশাল একটা অর্জন হতে পারতো।

তাছাড়া মিলবে অর্থ, পুরস্কার। কিন্তু আমি সেটা করিনি। কাজটি করিনি নীতির জায়গা থেকে। যারা প্রস্তাব দিয়েছিলো তাদের বুঝিয়ে বলেছিলাম যে যখন যুদ্ধটা হয় আমি তখন পাকিস্তানের নাগরিক। তো আমার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শহীদ হওয়াদের জন্য আমার গান লেখাটা মানায় না।

যে পরিচয়ে গর্বিত
অনেক আগে একবার আমেরিকায় আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে গেলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। অনুষ্ঠানে যাবার পর দেখলেন সেখানে একমাত্র অতিথি তিনি। তার কথা শুনতে এসেছে প্রায় তিন হাজার প্রবাসী। নিজেকে খুব একটা ভালো বক্তা মনে করেন না এই গীতিকার। তাই একটু বিব্রত হলেন। ভাবছিলেন কি দিয়ে শুরু করবেন। হঠাৎ একজন দাঁড়িয়ে বললেন, ‘টেনশান করবেন না। আমরা খুব জ্ঞানী কথা শুনতে চাই না। আপনি আমাদের প্রিয় গীতিকবি। প্রিয় প্রিয় সব দেশের গান লিখেছেন আপনি। আজ আপনার কাছে বাংলাদেশের কথা শুনতে চাই, আপনার ব্যক্তি জীবন, পরিবার-পরিচয় জানতে চাই।’

নিজের কথা, নিজের দেশের কথা বলতে গিয়ে গাজী মাজহারুল আনোয়ার পেয়ে গেলেন দারুণ কিছু লাইন। তিনি বলতে শুরু করলেন-

‘যদি আমাকে জানতে সাধ হয়
বাংলার মুখ তুমি দেখে নিও
যদি আমাকে বুঝতে মন চায়
এ মাটির শ্যামলিমায় এসো প্রিয়
এখানে বৃষ্টি ঝরে রিমঝিম শ্রাবণের সেতারে
কুমারী নদীর বুক কেঁপে ওঠে প্রণয়ের জোয়ারে
যদি কখনও দেখতে সাধ হয়
আমার মনের চঞ্চলতা
তবে বরষার কোন নদী দেখে নিও’

নিজেই অবাক হলেন হঠাৎ করে এমন কিছু লাইন বলতে বলতে। পরে সেই কবিতাটি তিনি শেষ করেন এবং এটি গান হিসেবে প্রকাশ হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, এটিও একটি শ্রোতানন্দিত গান।

এলএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]