শিমু হত্যা: অভিযোগে দুই নাম থাকলেও এজাহারে ‘আসামি অজ্ঞাত’ কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৪৯ পিএম, ২১ জানুয়ারি ২০২২
হত্যা মামলায় গ্রেফতার নোবেল ও ফরহাদ, ইনসেটে চিত্রনায়িকা শিমু

চিত্রনায়িকা রাইমা ইসলাম শিমু হত্যাকাণ্ডে তার ভাইয়ের দায়ের করা মামলার অভিযোগে দুজনের নাম উল্লেখ থাকলেও এজাহারে তা নেই। সেখানে আসামি হিসেবে কেবল ‘অজ্ঞাত’ ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বাদী হারুন অর রশীদ। তিনি বলেছেন, আমি মামলায় দুজনের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করি, কিন্তু এফআইআর বা এজাহারে তাদের নাম না থাকায় বিস্মিত হয়েছি। যদিও এক্ষেত্রে পুলিশের ভাষ্য, অভিযোগে নাম থাকলেও সুনির্দিষ্টভাবে আসামিদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ না থাকলে এফআইআরে নাম আসবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হত্যা মামলা দায়েরের আগেই শিমুর স্বামী সাখাওয়াত আলী নোবেল ও তার বাল্যবন্ধু গাড়িচালক এস এম ওয়াই আব্দুল্লাহ ফরহাদকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের পুলিশি তদন্তে প্রাপ্ত আসামি বলা হয়েছে। এজাহারে তাদের সরাসরি আসামি করা হয়নি। আদালতে পুলিশের করা রিমান্ড আবেদনেও দুজনকে তদন্তে প্রাপ্ত আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আদালত তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন

গত সোমবার (১৭ জানুয়ারি) সকালে ঢাকার কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়নের আলীপুর ব্রিজের কাছে শিমুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর আটক করা হয় শিমুর স্বামী নোবেল ও ফরহাদকে। দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া যায় শিমু হত্যার তথ্য।

পুলিশ জানায়, শিমুকে হত্যার পর নোবেল তার বাল্যবন্ধু গাড়িচালক ফরহাদের সহযোগিতায় মরদেহটি চটের বস্তায় ভরেন। এরপর মরদেহ আলীপুর ব্রিজের ৩০০ গজ দূরে সড়কের পাশে ঝোঁপের ভেতর ফেলে আসেন। আটক হওয়ার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার দায় স্বীকার করেন নোবেল। হত্যার কারণ হিসেবে তিনি পারিবারিক কলহের কথা জানান।

পরে মঙ্গলবার (১৮ জানুয়ারি) বিকেল ৩টায় কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন শিমুর ভাই হারুন অর রশীদ। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমার ছোটবোন রাহিমা আক্তার শিমু ওরফে রাইমা ইসলাম শিমু একজন চিত্রনায়িকা। খন্দকার সাখাওয়াত আলীম নোবেল তার স্বামী। তারা একসঙ্গে কলাবাগানের গ্রিন রোডের বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন। গত ১৬ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৭টার দিকে অভিনেতা জহিরুল ইসলাম ওরফে আদর ফোন করে আমার ছোটবোন ফাতিমাকে জানান, শিমুকে সকাল থেকে মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন আমার ছোটবোন শিমুর বড় মেয়ে অজিহা আলীম রিদকে (১৭) ফোন দেয়। তার মায়ের খবর জানতে চায়। রিদ মোবাইল ফোনে ফাতিমাকে জানায়, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে তার মা বাসায় নেই। কোথায় আছে সেও জানে না। এরপর ফাতিমা তার মোবাইল ফোন থেকে শিমুর স্বামী নোবেলকে ফোন দেয়। তখন নোবেল তাকে জানান, শিমু কোথায় আছে তা তিনি জানেন না। আমার বোনকে রাতে খোঁজাখুঁজি অব্যাহতি রাখি।’

তিনি মামলায় অভিযোগ করেন, ‘১৭ জানুয়ারি রাত আনুমানিক ৯টার দিকে পুলিশের মাধ্যমে সংবাদ পাই, কেরানীগঞ্জে এক নারীর মরদেহ পাওয়া গেছে। মরদেহটি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। পরিবারসহ মর্গে গিয়ে আমরা আমার বোন শিমুর মরদেহটি শনাক্ত করি। আমার বোন মিডিয়ায় কাজ করে বলে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য কলহ ছিল।’

নায়িকা শিমুর ভাই আরও অভিযোগ করেন, ‘বোন নিখোঁজ হওয়ার পর তার বাসায় গিয়ে নোবেলের সঙ্গে তার বাল্যবন্ধু ফরহাদকে দেখতে পাই। তারা তখন শিমুর নিখোঁজের বিষয়টি নিয়ে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেছে। মোবাইলেও তারা এলোমেলো কথা বলেছে। তাই আমাদের ধারণা আমার বোনের স্বামী নোবেল ও তার বন্ধু এস এম ওয়াই আব্দুল্লাহ ফরহাদসহ অজ্ঞাত আরও ব্যক্তিরা শিমুকে ১৬ জানুয়ারি সকাল ৭টা থেকে ১৭ জানুয়ারি সকাল ১০টার মধ্যে খুন করে মরদেহ গুম করতে কেরানীগঞ্জে নিয়ে যায়।’

এদিকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নোবেল দাবি করেন, শিমুকে হত্যা করা তার পরিকল্পনা ছিল না। দুইজনের ঝগড়ার এক পর্যায়ে তিনি তাকে চড় দেন। এতে শিমুও তার ওপর চড়াও হন। ক্ষিপ্ত হয়ে গলা টিপে ধরলে স্ত্রী নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এরপর বন্ধু ফরহাদের পরিকল্পনায় মরদেহ গুমের সিদ্ধান্ত নেন তারা। কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছে- সেই প্রশ্নে নোবেল ফের বলেছেন, তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি চলছিল। এ নিয়ে দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহ চলছিল।

jagonews24চিত্রনায়িকা রাইমা ইসলাম শিমু

শুক্রবার (২১ জানুয়ারি) সকালে ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন নোবেল ও ফরহাদ। পরে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবু সালাম মিয়া বলেন, নোবেল অকপটেই স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। নোবেল দাবি করেছেন, কিছু বিষয় নিয়ে তিনি স্ত্রীকে সন্দেহ করতেন। স্ত্রীও তাকে সন্দেহ করতেন। গাড়ির যন্ত্রাংশের পুরোনো ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিছু একটা করার চাপ ছিল তার ওপর। এসব নিয়েই মূলত কলহ চলছিল।

তদন্ত সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, নোবেল আর ফরহাদ মিলে শিমুর মরদেহ বাসা থেকে বের করার আগে নিরাপত্তাকর্মীকে নাশতা আনতে পাঠিয়েছিলেন। এর আগে তারা বাড়ির সিসি ক্যামেরা অকেজো করতে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল সুইচও বন্ধ করে দেন তারা। পরে বস্তায় ভরে শিমুর মরদেহ গাড়িতে তোলা হয়।

কিন্তু এজাহার থেকে জানা যায়, পেনাল কোডের ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তোলা হলেও সব আসামি ‘অজ্ঞাত’ বলা হয়েছে। মামলা নম্বর-৩৭।

এজাহারে আসামি অজ্ঞাত বলে উল্লেখের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কেরানীগঞ্জ মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) চুন্নু মিয়া জাগো নিউজকে বলে, অভিযোগকারীর অভিযোগে নামের পরে যদি অজ্ঞাতনামা লেখা থাকে তাহলে এফআইআরেও অজ্ঞাত কথাটি আসবে। অভিযোগে এক বা একাধিক নামের পরেও যদি অজ্ঞাত লেখা থাকে তাহলে এফআইআরেও অজ্ঞাত থাকবে।

এ প্রসঙ্গে মামলার বাদী শিমুর ভাই হারুন অর রশীদ জাগো নিউজকে বলেন, আমি গত মঙ্গলবার কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেছি। মামলার অভিযোগে আমি আমার বোনের স্বামী নোবেল ও তার বন্ধু এস এম ওয়াই আব্দুল্লাহ ফরহাদের নাম আসামি হিসেবে উল্লেখ করি। এছাড়া আরও অজ্ঞাত আসামি বলা হয়। কিন্তু মামলার এফআইআরে আসামির নাম না থাকায় আমি বিস্মিত হয়েছি। এফআইআরটি হাতে পেয়েছি। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য কেরানীগঞ্জ থানায় যাচ্ছি।

জানতে চাইলে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ হোসেন সরদার জাগো নিউজকে বলেন, অভিযোগে নাম থাকলেও সুনির্দিষ্টভাবে আসামিদের তথ্য-প্রমাণ না থাকলে এফআইআরে নাম আসবে না। যদি সুনির্দিষ্টভাবে হত্যার তথ্যাদি নামসহ থাকতো তাহলে অবশ্যই সুনির্দিষ্টভাবে আসামিদের নাম আসতো।

টিটি/এমআরআর/এইচএ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]