ভাষার প্রতি ভালোবাসা

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:১১ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

দু’দিন পরই মহান অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেকগুলো দেশ। তাই ভাষা দিবসকে সামনে রেখেই কিছু কষ্টের বিষয় জানিয়েছেন তরুণ রাসেল-

মোবাইল অপশনে গিয়ে রেডিও চালু করতেই মনটা বিষিয়ে উঠলো। দেশের একটি অন্যতম জনপ্রিয় এফএম থেকে বাংলা ভাষাকে যেভাবে যাচ্ছেতাইভাবে উপস্থাপন করতে শুনলাম। মন চাইছিল না আর রেডিও শুনতে। মনের মধ্যে ক্ষোভ ফুঁসে ওঠে। অবাক লাগে এসব গণমাধ্যম কিভাবে নিজের ভাষা-সংস্কৃতিকে এভাবে প্রকাশ্যে জবাই দেয়। নিজ ভাষাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা কোন ধরনের শৈল্পিক কাজ, জবাব আছে কি আপনাদের কাছে?

ভণ্ডামির এখানেই শেষ নয়, মহান ভাষার মাসে এদের আবার ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর দেশপ্রেম উপচে পড়ে। এ উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তারা। আর অন্যদিকে সারা বছর নিজ ভাষার গলায় করাত চালায়। বারো জাতের সংমিশ্রণে বাংলার নিজস্ব সত্তা কালে কালেই পরচর্চার জাতাকলে পিষ্ট হচ্ছে। তবে আমি বলছি না, অন্য ভাষায় কথা বলা যাবে না, অন্য ভাষা শেখা যাবে না, জানা যাবে না। আমার মতে, এগুলো কেবল ব্যক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কিন্তু তার মানে এই নয় যে, নিজের ভাষা সংস্কৃতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে এগুলো করতে হবে। তাহলে আর বিশেষ দিবসে, যারা এ দেশ, মাটি, ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় রক্ত দিয়েছেন তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে লাভ কী!

আজকাল আমাদের দেশের যে তরুণশ্রেণি টিভি ও বেতারের দর্শক-শ্রোতা আছেন; তারা প্রায় বেশির ভাগই বিদেশি সংস্কৃতির জালে আটকে পড়েছেন। তাদের সব কাজ-কর্ম, ধ্যান-জ্ঞানে এখন ভিনদেশি ভাষা-সংস্কৃতির ছোঁয়া। বাংলা গানের সোনালি ইতিহাস মুছে দিতে সেখানে জবরদখলে আছে হিপহপ ধাচের গান। আধুনিক বাদ্য-বাজনার ক্রমাগত গর্জনে মাঝে মধ্যে সহশিল্পীর উচ্চারিত ‘ইয়ো-ইয়ো ক্র্যা ক্র্যা’ ছাড়া গানের কোনো কথাই বোঝা যায় না। রাস্তায় চলতে ফিরতে কানে ভেসে আসে না কোনো শ্রুতিমধুর বাংলা গান। শহরের রাস্তায় তরুণ-তরুণীরা নিজেকে তারে জড়িয়ে মানে কানে হেডফোন লাগিয়ে অচেনা ভাষায় কী সব বিড়বিড় করতে করতে হেটে চলে।

ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া সন্তানকে নিয়ে তাদের বাবা-মা গল্প করেন, ‘আমার বাচ্চারা না ইংরেজি ছাড়া কথাই বলে না। এমনকি আমাদের কথা বোঝাতে হলে আমাদেরও সবসময় ওদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে হয়।’ বাহ, বৃটিশরা কী ভালো বীজই না রোপণ করে গেছে এ দেশে? আসলে ওদেরই বা দোষ দিয়ে লাভ কি? আমাদের কাছে তো পরের বউকেই বেশি সুন্দরী মনে হয়! বিশ্বের ইতিহাসে বাঙালিরাই একমাত্র জাতি যারা মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে।

সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্ত ঝরানো একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের বিভিন্ন রাজ্যের রাষ্ট্রভাষা আজ বাংলা অথচ আমরা কি লজ্জা-ই না পাই বাংলায় কথা বলতে। সবার মাঝে সভা-সেমিনারে কেউ বাংলায় বক্তব্য দিলেই আমরা মনে করি, কী অশিক্ষিতই না লোকটা। সবাই যেখানে ইংরেজিতে বক্তব্য দিচ্ছে; সেখানে তিনি বাংলায় কথা বলছেন। তাদের কাছে আমার বিনীত জিজ্ঞাসা, আপনারা কতটুকু শুদ্ধভাবে প্রমিত বাংলায় কথা বলেন। কত সুন্দর সাবলীল ও নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করেন আপনার মাতৃভাষাকে?

একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হতে চান? ভাষা শহীদদের রক্তের সঠিক মূল্য দিতে চান তো একজন বাঙালি হিসেবে আপনি আপনার কাজের মাধ্যমে বাংলাকে ছড়িয়ে দিন বিশ্বব্যাপী। আমরা কি পারি না বাংলা ভাষায় সবকিছু উপস্থাপন করতে, বাংলা ভাষার ব্যবহার সর্বক্ষেত্রে ঘটাতে? অন্তত নিজের দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ থেকে হলেও আসুন, প্রকৃতই আমরা যদি বাংলাদেশে জন্মে থাকি তাহলে নিজের মেধা ও মননে আঁকি প্রিয় বাংলার মানচিত্র।

আসুন বছরজুড়ে সবাই সমস্বরে দীপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করি সৈয়দ শামসুল হকের লেখা প্রিয় কবিতার লাইন- ‘আমি জন্মেছি বাংলায়/আমি বাংলায় কথা বলি’ অথবা গেয়ে উঠি সেই প্রিয় গান- ‘আমি বাংলায় গান গাই/আমি বাংলার গান গাই’। সেই সঙ্গে চরম ধিক্কার জানাই তাদের, যারা এ দেশে জন্মগ্রহণ করেও বাণিজ্যিক মুনাফা আদায় কিংবা নিজ স্বার্থ হাসিল করতে নিজ ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ভুলে নিজেকে বিকিয়ে দিচ্ছেন অন্যের কাছে। আসুন আমাদের মনের ভেতরে বাসা বাঁধা অপসংস্কৃতির চেতনা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে একজন বাঙালি হিসেবে পরিচিত করি।

লেখক: বাচিকশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী।

এসইউ/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :