ভালোবাসা দিবস হোক অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে সেতুবন্ধন

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:২৮ পিএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ বা ভালোবাসা দিবস। পৃথিবীর হাতেগোনা কয়েকটি দেশ বাদে জাঁকজমকভাবে পালন করা হচ্ছে দিনটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি পালন করা হচ্ছে নতুন নতুন ভিন্নধর্মী চোখধাঁধানো অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত কেউ পিছিয়ে নেই। দিবসটি নিয়ে লিখেছেন রাজীব কুমার দাশ-

আমাদের দেশেও দিনটিকে ঘিরে অনুষ্ঠানের কমতি নেই। এরই মধ্যে হোটেল, রেস্তোরাঁ, মাঠ, পার্ক, কটেজ, ডিজে, ব্যান্ড পার্টি, কমিউনিটি সেন্টার, কনভেনশন হল, ফুলের দোকান, চাইনিজ রেস্তোরাঁর চাহিদা গগনচুম্বী। ভোর থেকে সবাই বর্ণিল সাজে হাতে হাত রেখে ‘কোথাও আজ হারিয়ে যেতে নেই মানা’ চিন্তনে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে বিভোর অনুরাগের পথচলা। যেভাবেই হোক ভালোবাসতেই হবে, ফটোসেশন করতেই হবে।

একটু পেছনে ফেরা যাক- ২৬৯ খ্রিষ্টাব্দে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনস নামের একজন খৃষ্টান পাদ্রি ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচারের অভিযোগে তখনকার রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাকে বন্দি করেন। কারণ তখন রোমান সম্রাজ্যে খৃষ্টধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল।

বন্দি অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর অন্ধ মেয়েকে সুস্থ করে তোলেন। এতে রাজা আরও ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেদিন ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। এরপর ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে পোপ সেন্ট জেলাসিউ ও প্রথম জুলিয়াস ভ্যালেইটাইনস স্মরণে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘ভ্যালেন্টাইন দিবস’ ঘোষণা করেন।

> আরও পড়ুন- মনের অন্ধকার দূর করে বই

সময়ের স্রোতধারায় চড়াই উতরাই পেরিয়ে ত্যাগ ও সুন্দরের মহিমা, ভালোবাসার পূর্ণতা এখন বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে রোমান্টিক ঘরানায়। যে ত্যাগ, অসত্য, কুৎসিত, হিংসা, কদাকার চরিত্র, ভণ্ডামি, মূর্খতা, মিথ্যার বিরুদ্ধে এক সাহসী মহীয়সী নারীর আত্মত্যাগের জয়, সুন্দরের জয়কে কালের বিবর্তন হাওয়া ত্যাগের মুকুট আস্তে আস্তে উড়িয়ে নিয়ে গেল?

এখন শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বময় ভালোবাসা দিবস মানে রোমাঞ্চ, উদ্দাম নৃত্য, যৌনতা, বেলেল্লাপনা, গোলাপের বন্দনার ফ্যাশন, নতুন নতুন বাহারি পোশাক, আলো-আঁধার পরিবেশ, চোখবন্ধ সংস্কৃতি, বারোটা বাজানো খাবার, হরেকরকম গিফট, গলা ভিজিয়ে ভয়ংকর শব্দদূষণ, আরও কতো কী?

আসলে প্রত্যেক দিবসের একটি অন্তর্নিহিত তাৎপর্য থাকে। সে তাৎপর্যের মহিমায় জাগ্রত হয় মানুষের মনুষ্যত্ব ও বিবেক। সে বিবেকের তাড়নায় মানুষ নিজেকে সংশোধন করে, নতুন প্রেরণায় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে সত্য ও সাম্যের বীজ বপন করে।

আমাদের জীবন ক্ষণস্থায়ী। এ ক্ষণস্থায়ী জীবনে লোভ, লালসা, চরম ভোগবাদী চিন্তা, নিন্দা, পরচর্চা, ঈর্ষা, চরম হিংসা, ব্যভিচার, ধর্ষণ, প্রতারণা পরস্পরের অমঙ্গল কামনা নিত্য সহচর। প্রতিনিয়ত পরিবার, আপনজন, রক্তের সম্পর্ক, আত্মজা, প্রতিবেশী, সমাজ, এমন কোনো স্থান নেই যেখানে মানুষের চরম আত্মকেন্দ্রিকতা কাজ করে না।

> আরও পড়ুন- বাদাম বিক্রির টাকায় ভাইকে পড়াচ্ছেন মোজাহার

মানব জীবনে সহজ নির্লোভ সারল্যে প্রাধান্য পায় সাম্য। সে সাম্যের চিন্তনের অবগুণ্ঠনে জেগে ওঠে বিবেক। বিবেক জাগ্রত হলেই পালিয়ে যায় আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা। যে অবিচার, অসত্য, অসুন্দর, ঈর্ষার বিরুদ্ধে। ভালোবাসা ও সাম্যের জয়গানে ভালোবাসা দিবসের প্রতিপাদ্য শুরু হয়েছিল ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে।

আজ এক মহীয়সীর নিজের জীবনের বিনিময়ে, অসত্য অসুন্দরের বিরুদ্ধে মহাত্মার চেতনাকে ঘিরে যুগ যুগান্তর পেরিয়ে সে মহাত্মা ধারার পরিবর্তে হারিয়ে গেছে ভালোবাসা দিবসের প্রতিপাদ্য। আজ বিশ্বে এ দিবসকে ঘিরে জুটি বিয়ে, প্রপোজ, ক্লাব, হোটেল, মোটেল, কটেজ, উদ্দাম যৌনতা, একেবারেই একান্তে হারিয়ে যাওয়া, বার, বীচ, ছাদ, পার্ক, সিনেমা, বিনোদন, বন-জঙ্গল, সাগর, পর্বতকে ভালোবাসা দিবসের উপজীব্য করে চরম সুখভোগে ত্যাগের মহিমাকে চপেটাঘাতের ক্রন্দনে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছেন।

আজ ভ্যালেন্টাইন দিবসের মহিমায় যদি আমরা ধারণ করি, সে ১৪ ফেব্রুয়ারি হারিয়ে যাওয়া সত্য, অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রামী লড়াকু ভ্যালেনটাইনসের উদ্দেশ্য ও মহিমা! তবেই সাম্যকেন্দ্রিক সার্বজনীন ভালোবাসায় সিক্ত হবে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ।

যে ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে অসত্য, অসুন্দর, অবিচার, কপটতা, হিংসা হারিয়ে যাবে আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ থেকে চিরতরে। এটাই হোক আজ বিশ্বব্যাপী পরস্পরের ভালোবাসা দিবসের আলাপন, অনুরাগের সেতুবন্ধন।

লেখক: পুলিশ পরিদর্শক, বাংলাদেশ পুলিশ।

এসইউ/জেআইএম