তারুণ্যের কাঁধে স্বপ্নহীনতার বোঝা

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:০৮ পিএম, ০৩ অক্টোবর ২০২০

খান মুহাম্মদ রুমেল

এই শহরে একদিন বৃষ্টি নামলে বই-খাতার ব্যাগ কাঁধে যে কিশোর ভিজতে নামতো; সে এখন কী করে? হয়তো সে এখন বড় কোনো আমলা। হয়তো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড়কর্তা। হয়তো কোথাও কেরানি হয়ে কলম পিষে। কিন্তু আজকের কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী ঝুম বৃষ্টিতে কী করে? তারাও কি বৃষ্টিস্নানে নামে? না কি বুকপকেটের দামি মোবাইল ফোন পিছুটেনে ধরে! মোবাইল রক্ষায় বৃষ্টিতে ভিজতে মানা। না কি সব টান উপেক্ষা করে সে-ও নেমে পড়ে। কিন্তু একযুগের বেশি পুরোনো কিশোরের চোখে তা ধরা পড়ে না! নস্টালজিক সময় সব ধরতে পারে কি?

এই শহরের আড্ডার জায়গাগুলোতে এখন অট্টালিকা। এই শহরের বইয়ের দোকানগুলোর এখন দখল নিয়েছে রং-বেরঙের বিলাস সামগ্রী। এই শহরে এখন ফুটপাতের চায়ের দোকানে আড্ডা হয় না। তার বদলে তাপানুকূল ঘরের গরম কফির মগেই প্রশান্তির পরশ খোঁজে কেন তারুণ্য? সিনেমা হলগুলো দুয়েক সপ্তাহ বাদে বাকিটা সময় পড়ে থাকে খাঁ-খাঁ মরুদ্যান। এই শহরের রাজপথে এখন হুডখোলা রিকশায় বসে রাজা উজির মারার স্বপ্ন দেখে কি? ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়ে উথালি পাথালি ঘুরে বেড়ায় কি আজকের তারুণ্য?

পাড়ায় পাড়ায় কিছু বড় ভাই ছিলেন, নজরুল-রবীন্দ্র জয়ন্তি, চৈত্রসংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন, বসন্ত অথবা একুশে ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর কিংবা যেকোনো বাহানায় বছরের পুরোটা সময় মাতিয়ে রাখতেন পুরো পাড়া। তারা আজ কোথায়? তারা কি সব মুখ গুজে চাকরির পাঠ মুখস্ত করেন? না কি আমরা সবাই মিলে আজকের তারুণ্যের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছি সফল ক্যারিয়ারের স্বপ্ন নামের বোঝা? আমরা কি তাদের বলতে ব্যর্থ হয়েছি- জাগতিক উন্নতির পেছনে ছোটো কিন্তু স্বপ্নটা হারিয়ে ফেলো না।

আমরা বানিয়েছি একটি বিসিএসমুখী প্রজন্ম। আমরা বানিয়েছি একটি ক্যারিয়ারমুখী প্রজন্ম। আমাদের সৃষ্টিশীলতাও এখন পুঁজিবাদমুখী। পুঁজিবাদ নির্ভর। আমরা পুঁজিকেই বানিয়েছি একমাত্র মোক্ষ। নিছক সৃষ্টির আনন্দে সৃষ্টিশীলতার চর্চা কোথায় হারালাম? কেন হারালাম? কোথায় সেই বোহেমিয়ান মানুষেরা। কোথায় ভবঘুরে সেই যুবকেরা। যারা কোনো বৈষয়িক অর্জন নয় শুধু সৃষ্টির আনন্দে সৃষ্টি করে যেতেন! তারুণ্যের কাঁধে স্বপ্নহীনতার বোঝা আমরাই চাপিয়েছি।

আমরা বলেছি- ডাক্তার হও, প্রকৌশলী হও, আমলা হও। আমরা বলিনি কবি হও। আমরা বলিনি শিল্পী হও। আমরা বলিনি ঘুরে বেড়াও উদ্দেশ্যহীন। তারপর ভাসতে ভাসতে, ঘুরতে যেখানে নোঙর করবে তোমার জীবনের খেয়া- সেটাই তোমার ঠিকানা। আমরা বলতে ব্যর্থ হয়েছি- মানুষ হও। আমরা বলতে ব্যর্থ হয়েছি আমলা দৌড়ে শামিল হতে গিয়ে, ডাক্তার হওয়ার দৌড়ে শামিল হতে গিয়ে, প্রকৌশলী হওয়ার দৌড়ে শামিল হতে গিয়ে কিংবা সাংবাদিক অথবা শিক্ষক হওয়ার দৌড়ে শামিল হতে গিয়ে মানুষ হতে ভুলো না।

ফলে আমরা সবকিছুর দৌড়ে এগিয়ে গিয়েছি। কেবল পিছিয়ে পড়েছি মানুষ হওয়ার দৌড়ে! এই একটি জায়গায় ক্রমশ পেছাতে পেছাতে আমরা দিনে দিনে হয়ে পড়ছি– না মানুষ। আমরা হয়ে পড়ছি শূন্য মানুষ। তবে সময় এখনো ফুরায়নি। আমরা এখন থেকেই শুরু করতে পারি জোর কদম দৌড়। মানুষ হওয়ার দৌড়। না হলে সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন গহ্বর। তখন তল খুঁজে পাবো তো?

লেখক: কবি ও সাংবাদিক।

এসইউ/এএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]