করোনাকালে তরুণদের ঈদুল আজহার ভাবনা

সাজেদুর আবেদীন শান্ত
সাজেদুর আবেদীন শান্ত সাজেদুর আবেদীন শান্ত , ফিচার লেখক
প্রকাশিত: ১০:২৭ এএম, ২১ জুলাই ২০২১

ঈদুল আজহা মুসলিম জাহানের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। আত্মত্যাগের মহিমায় পরিশুদ্ধ হওয়ার উৎসবে আনন্দের বার্তা নিয়ে আমাদের মধ্যে সমাগত হয় পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদ সব শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে গড়ে তোলে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধন। বিশ্বেজুড়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানবজাতি। এরই মাঝে চলে গেছে তিনটি ঈদ। আবার এলো ঈদুল আজহা। এবারের ঈদও হচ্ছে মহামারি করোনাভাইরাসের মধ্যেই।

আমাদের পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজনসহ আশেপাশের অনেকেই আক্রান্ত করোনাভাইরাসে। ইতোমধ্যে অনেকেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আপনজনকে হারিয়েছি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থেকে মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। এমনই সময় ঈদ এসেছে আনন্দের বার্তা নিয়ে। তাই জনসমাগম এড়িয়ে সচেতনতার সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে হবে সবাইকে। তাই করোনাকালীন ঈদের ভাবনা নিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলেছে জাগো নিউজ।

সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী জুবাইয়া ঝুমা বলেন, ‘এই মহামারীতে তরুণ সমাজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ঈদ তো সেটাই; যেখানে কর্মসংস্থান আর সম্পদের সুষম বণ্টন বিদ্যমান। তাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক ত্যাগের মহিমা। ঈদুল আজহার মাধ্যমে চুরমার হোক উঁচু-নিচুর দেয়াল। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ুক ত্যাগের বার্তা। নিপাত যাক করোনা মহামারি। ভীতিমুক্ত হোক মানব জাতি। তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গড়ে উঠুক এক নতুন পৃথিবী।’

ঢাকা স্টেট কলেজের শিক্ষার্থী জাফর আহমেদ শিমুল বলেন, ‘ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে নতুন উপলব্ধি। বাঙালি মুসলিম হিসেবে আমরা খুবই উৎসব ও আনন্দ প্রবণ; আর সে আনন্দ যদি হয় ঈদুল আজহার পবিত্র ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর, তাহলে তো কথাই নেই। গত দেড়-দু’বছর করোনা জর্জরিত ঈদ অন্যান্য বছরের তুলনায় একটু অন্যরকম ও বিস্বাদময়। চারিদিকে মৃত্যুর মিছিল। এমন পরিবেশে ঈদ খুবই কঠিন ব্যাপার। সামাজিকতাও অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। অল্প সামর্থের ভেতরই সবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার চেষ্টা থাকবে। অসহায় মানুষের জন্য এলাকায় একটি টিম বা ইউনিট হয়ে ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করব। এমনকি ঈদের দিনেও গ্রামের অসহায় মানুষগুলোর সঙ্গে ঈদ উদযাপন করব। নিজের ভালোবাসাকে সার্বজনীন ভালোবাসায় রূপান্তর করে জাতি-ধর্ম, বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করব।’

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার লিজা বলেন, ‘বাংলাদেশের বেশিরভাগ নারীর ঈদুল আজহা কাটে ভীষণ ব্যস্ততায়। কুরবানির ঈদ মানেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ততা। ঈদের সকালের মধ্যে মাংস কেটে ভাগ করে আত্মীয় ও গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা। তারপর শুরু হয় রান্না-বান্নার আয়োজন। দুপুরের পর থেকে আত্মীয়, স্বজন, প্রতিবেশীর বাড়িতে যাতায়াত নিয়মিত ঈদের রুটিন। দীর্ঘদিনের সেই ছকে এবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনাভাইরাস। এবার কারও সাথে দেখা হচ্ছে না, কারও বাসায়ও যাব না। এরকম ঈদ হতে পারে আগে ভাবিনি।’

জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের শিক্ষার্থী আতিফ আসাদ বলেন, ‘মুসলিম জাতির জীবনে ঈদ হলো সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন। এই দিনে ধনী-গরিব সবাই মিলে ঈদ উদযাপন করে। আমরা প্রায় দেড় বছর যাবৎ করোনাকালীন সংকটের মধ্যদিয়ে কাটাচ্ছি। তাই হয়তো অনেকেরই প্রত্যাশা অনুযায়ী ঈদ পালন কষ্টকর হবে। তারপরও নিজে সর্বোচ্চ সাবধানতা, সতর্কতা ও সামাজিক দূরত্ব মেনে ঈদ উদযাপন করব। সবাই যেন আনন্দে ঈদ উপহার করতে পারে, তার জন্য আমার পাশের গরিব-অসহায়দের ঈদসামগ্রী উপহার দিয়ে আনন্দ উদযাপন করতে সহযোগিতা করছি।’

সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী মামুন সোহাগ বলেন, ‘মহামারি করোনা যেন থামছেই না। বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। কুরবানি ও জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনায় এনে ১৫ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্তসাপেক্ষে দেশব্যাপী গণপরিবহন, ট্রেন, লঞ্চ, শপিং মল খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে সারাদেশেই মানুষের চলাচল বেড়েছে। বিশেষ করে শহর থেকে অসংখ্য মানুষ গ্রামে গেছে। তবে এবার সব কিছু মাথায় রেখে বাড়ি যাইনি। কষ্ট হলেও ঢাকায় আছি। গ্রামের বাড়িতে অসুস্থ মা আছেন, বার্ধক্যে থাকা দাদি আছেন, ছোট ছোট বাচ্চারা তো আছেই। সবার কথা চিন্তা করে একটা ঈদ না হয় ঢাকায়ই করি। এতো দূর থেকে যাব, করোনা আমার থেকেও ছড়াতে পারে। যারা গ্রামে গেছেন সুস্থ-সুন্দর থাকার চেষ্টা করবেন। কারণ ঈদ বারবার আসবে।’

হাবিবুল্লাহ বাহার ইউনিভার্সিটি কলেজের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘প্রায় আড়াই বছর ধরে ঘরবন্দি জীবন। করোনার এই মহামারিতে সব আনন্দই প্রায় নিরানন্দ হয়ে গেছে। অনুষ্ঠান বা কোন পার্বণ সব কিছুর সেই আগের আমেজ হারিয়েছে অনেক আগেই। তাই ঈদে আমারও ব্যতিক্রম নয়। ঘরে বসেই ঈদ বাকি দিনের মতোই কাটবে। নেই ঈদের পূর্ববর্তী কোন আনন্দ বা হৈচৈ। যেখানে কুরবানির পশু অবধি কেনা হচ্ছে অনলাইনে; সেখানে ঈদের আনন্দ বাইরে গিয়ে ভাগাভাগি করা কঠিন। তাই বাকিদের মতো আমার ঈদ নিয়েও বাড়াবাড়ি কোন আয়োজন নেই। ঘরে থেকে যতটুকু প্রিয়জনদের সাথে আনন্দ ভাগ করা যায়, ততটুকুতেই খুশি থাকব।’

ঈদ সাম্য, মৈত্রী ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে মানুষকে। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ব ও আত্মত্যাগের চেতনায় উদ্ভাসিত পবিত্র ঈদুল আজহা। আমাদের মধ্যে গড়ে উঠুক বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসসহ সব সংকট জয়ের সুসংহত বন্ধন। ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক দায়বদ্ধতা, দায়িত্বশীল আচরণ, করোনা নিয়ন্ত্রণে শারীরিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মধ্যদিয়েই শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হোক পবিত্র ঈদুল আজহা।

এসইউ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]