উপকূলীয় অক্সফোর্ড খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:০৩ পিএম, ১৬ মে ২০১৯

আত্মমর্যাদাশীল ও আত্মনির্ভরশীল উন্নত জাতি গঠনের লক্ষ্যে ২০০১ সালের ১৫ জুলাই গঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন। যার ওপর ভিত্তি করে দেশের ২৭তম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি)। ২০০৬ সালের ২২ জুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘উপকূলীয় অক্সফোর্ড’ খ্যাত এ বিশ্ববিদ্যালয়। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আব্দুর রহিম—

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি অনুষদ, ২টি ইনস্টিটিউট, ২৮টি বিভাগের অধীনে ৭ হাজার শিক্ষার্থী। প্রায় ৩ শতাধিক শিক্ষক এবং ৪ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমন্বয়ে নোবিপ্রবি পরিবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের চালু রয়েছে ৩টি হল- ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম হল, হযরত বিবি খাদিজা হল, সাবেক স্পীকার আব্দুল মালেক উকিল হল। এছাড়া ২টি হল চালু হওয়ার পথে। হল দুটি হলো- ৫৫০ শিক্ষার্থীর আবাসন ব্যবস্থার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও ৬৫০ নারী শিক্ষার্থীর আবাসনের জন্য বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুনন্নেছা মুজিব হল।

১০ তলা বিশিষ্ট ২টি একাডেমিক ভবন, ৪ তলা বিশিষ্ট আধুনিক লাইব্রেরি ভবন, অতিথিদের জন্য ৩ তলা বিশিষ্ট ভিআইপি গেস্ট হাউস রয়েছে। এছাড়া ৫ তলা বিশিষ্ট অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস ভবন, ৫ তলা বিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবন, বৈদ্যুতিক লাইনসহ ১ হাজার কেবিএ বৈদ্যুতিক সাব স্টেশন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও রিভার্স অসমোসিস প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ৩শ’ লাইন বিশিষ্ট বিটিসিএলের টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও ৫শ’ লাইন ক্ষমতা বিশিষ্ট পিএবিএক্স এক্সচেঞ্জ স্থাপন করা হয়েছে।

nstu

শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সাতটি বাস, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ৩টি সিভিলিয়ান বাস ও ৪টি মাইক্রোবাস রয়েছে। নোবিপ্রবি পরিবারের সব শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অত্যাধুনিক সুবিধা সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে পুকুরের সৌন্দর্য বর্ধনে চারপাশে বৃক্ষরোপণ, দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ এবং চারপাশ বর্ণিল আলোয় সজ্জিত করা হয়েছে। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মোবাইল অ্যাপস অ্যান্ড গেইম ডেভেলপমেন্ট ল্যাব এবং একটি নেটওয়ার্কিং ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে।

বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পসমূহের মধ্যে ১০ তলা বিশিষ্ট বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ তৃতীয় একাডেমিক ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। ১০ তলা বিশিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তা টাওয়ার, হাউস টিউটর, স্টাফ কোয়ার্টার ও প্রভোস্ট টাওয়ার নির্মাণাধীন। তিন তলা মেডিকেল সেন্টার ও তিন তলা ভিত্তিতে একতলা কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণাধীন। এছাড়া হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য দুই কোটি টাকা ব্যয়ে উপাসনালয় নির্মাণের কাজ চলছে। বিএনসিসি ও রোভার স্কাউট ভবন সম্প্রতি উদ্বোধন করা হয়েছে এবং এর কাজ চলমান। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাঝে ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষা সহায়ক বৃত্তি’ চালু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের মাঝে ৩০ লাখ টাকার ‘বঙ্গবন্ধু সহায়তা ফান্ড’ ঘোষণা করা হয়েছে।

ভবিষ্যত প্রকল্পসমূহের মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অদূরে অবস্থিত উপকূলের ৭৭৮ একর জমির উপর ‘দেশরত্ন শেখ হাসিনা সমুদ্র বিজ্ঞান ও সমুদ্র সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট। যেখানে ডেলটা ফরমেশন, সমুদ্র বিজ্ঞান, ইকো ট্যুরিজম, ম্যানগ্রোভ বনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা সম্ভব হবে। এছাড়া আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স, স্পেস রিসার্চ, মেটারিয়াল সায়েন্স, রোবটিক্স, ন্যানো টেকনোলজি বিষয়ে বিশ্বমানের গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি হবে। আইসিটি মন্ত্রাণালয়ের অর্থায়নে নিকট ভবিষ্যতে বিজনেস ইনকিউবেটর সমৃদ্ধ পূর্ণাঙ্গ হাইটেক পার্ক করা হবে।

nstu

বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠন। নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি, বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, নোবিপ্রবি ডিবেটিং সোসাইটি, মডেল ইউনাইটেড নেশন্স, বিজনেস ক্লাব, ইকো ক্লাব, সিএসটিই ক্লাব, লুমিনারি, সমকাল সুহৃদ সমাবেশ, কালের কণ্ঠ শুভসংঘ, শব্দকুটির, অভিযাত্রিক ব্লাড ব্যাংক, এনএসটিইউ ব্লাড ডোনার সোসাইটি, নোবিপ্রবি থিয়েটার ইত্যাদি।

এ পর্যন্ত দু’টি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম সমাবর্তনে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য ১ম, ২য়, ৩য় ও ৪র্থ ব্যাচের ১১ শিক্ষার্থীকে চ্যান্সেলর ও ভাইস-চ্যান্সেলর স্বর্ণপদক দেওয়া হয়। দু’টি অনুষদের চারটি বিভাগের ৫৯৭ জনকে স্নাতক ১১৫ জনকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়া হয়। ২য় সমাবর্তনে শিক্ষার্থীদের ১০টি স্বর্ণপদক দেওয়া হয়। এরমধ্যে স্নাতক পর্যায়ের ৬ জনকে চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল ও স্নাতকোত্তর ৪ জনকে ভাইস চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল দেওয়া হয়। সমাবর্তনে ২২৬৩ জন গ্রাজুয়েটকে স্নাতক ডিগ্রি ও ৪৪৫ জনকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়া হয়। ২১৮ জনকে পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা ডিগ্রি দেওয়া হয়।

শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়। রয়েছে অবিস্মরণীয় সাফল্য। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব ফিশারিজে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পোস্টার প্রেজেন্টেশনে ২১ জনের মধ্যে সেরা ১০ জন প্রতিযোগী নির্বাচিত হন। যাদের মধ্যে নোবিপ্রবির ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের ৩ জন। এরমধ্যে ৮ম ব্যাচের তৌশিক লাহিড়ী ও নাজমুন নাহার, ৯ম ব্যাচের মো. মহসিন যথাক্রমে ৩য়, ৭ম ও ৫ম স্থান অধিকার করেন। নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাৎসরিক ১২ হাজার ইউএস ডলার দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরে চীন ও ভারতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ‘শিক্ষার্থীদের নোবেল’ নামে খ্যাত হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতায় সফলতা লাভ করেন।

nstu

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সুনাম রয়েছে। ফিমস বিভাগের অধ্যাপক ড. বেলাল হোসেন দু’টি নতুন অমেরুদণ্ডী প্রাণী আবিষ্কার করেন। অমেরুদণ্ডী প্রাণীগুলোর নামকরণ করা হয় যথাক্রমে- ‘নিউমেনিয়া নোবিপ্রবিয়া’ ও ‘অ্যাররেনারুস স্মিটি’। এরমধ্যে ‘নিউমেনিয়া নোবিপ্রবিয়া’ নামটি নোবিপ্রবির নামে নামকরণ করা হয়। ‘অ্যাররেনারুস স্মিটি’ নামক অমেরুদণ্ডী প্রাণীর নামকরণ করা হয় নেদারল্যান্ডের বিখ্যাত একারোলজিস্ট হ্যারি স্মিথের নামে। বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. সুবোধ কুমার সরকার জাপানের হিরোশাকি ইউনিভারসিটি অব হেলথ সায়েন্সের সাবেক বিখ্যাত প্রফেসর ড. জিন ইচি সাসাকির সহযোগিতায় বাংলাদেশে প্রথম তিন ধরনের কালো রসুন উদ্ভাবন করেন। যার নাম- নোবিপ্রবি-বিজি-১ (ডিএল-বিজি), নোবিপ্রবি-বিজি-২ (ডিএস-বিজি) ও নোবিপ্রবি-বিজি-৩ (সিএল-বিজি)।

বিশ্ববিদ্যালয়টি সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবে এমন আশা শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার। তারা চান-প্রান্তিক জনপদের আলোর দিশারী হয়ে উঠুক নোবিপ্রবি।

এসইউ/এমকেএইচ

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও - jagofeature@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন :