যে কারণে বিখ্যাত সেকেন্দ্রা

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬:৪৬ পিএম, ১৮ জানুয়ারি ২০২০

ভারতের সুপরিচিত স্থান আগ্রা। সেখানে রয়েছে সম্রাট শাহজাহানের ‘তাজমহল’। আর তাজমহলের পাশেই রয়েছে একটি অঞ্চল। নাম সেকেন্দ্রা। তবে অঞ্চলটি কেন বিখ্যাত? জেনে নিতে ঘাঁটতে হয় ইতিহাস। ইতিহাস ঘেঁটে এবং হেঁটে হেঁটে ঘুরে এসে বিস্তারিত জানাচ্ছেন শিউলি সেন—

সেকেন্দ্রা বিখ্যাত আকবরের সমাধির কারণে। যদিও সেকেন্দ্রা নামটির ইতিহাস আরও প্রাচীন। ১৪৯২ সালে সিকান্দার লোদী আসেন আগ্ৰায়। গড়েন দুর্গ এবং তাকে ঘিরে যে শহর গড়ে উঠেছিল, তা ছিল সেকেন্দ্রাবাদ। আগ্রা ফোর্ট থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে এ সেকেন্দ্রা অঞ্চলটি আকবর পছন্দ করেছিলেন নিজের সমাধির জন্য। তখন জায়গাটি ছিল জনমানবহীন একটি জঙ্গল। পাখিদের কলকাকলিতে ছিল মুখর। বেশ নিরিবিলি হওয়ায় জায়গাটি হয়তো সম্রাটের খুব পছন্দ হয়েছিল।

বর্তমানে আগ্রায় তাজমহলের দিকে যাওয়ার প্রধান পথের পাশেই এর অবস্থান। এক সময়ের নির্জন জায়গাটি এখন কোলাহলপূর্ণ। তবে তাজমহল ও আগ্রা ফোর্টের তুলনায় এখানে ভিড় কম। ৫০ টাকা করে টিকিটমূল্য। টিকিট কাউন্টার থেকে মূল গেটে যেতে একটুখানি পায়ে চলা পথ। দুপাশে সারি সারি বাগান। পাখির কাকলি ও হরিনের দৌড়াদৌড়িতে এক মনোরম পরিবেশ। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে মূল গেট। গেটটি তাজমহলের গেটের মতো সুবিশাল। লাল বেলে পাথরে নির্মিত। অসাধারণ কারুকার্য গেটজুড়ে। চারপাশে চারটি উঁচু মিনার।

jagonews24

আকবর জীবিত থাকতেই গড়তে শুরু করেছিলেন নিজের সমাধির ইমারতটি। যে কারণে ইমারতের মূল প্ল্যানিং আকবর বাদশার। যদিও তিনি এর কাজ শুরু করেছিলেন মাত্র, কিন্তু শেষ করে যেতে পারেননি।

এখানে টিকিট দেখিয়ে ভেতরে ঢুকতে হবে। চারদিকে চারটি গেট। প্রতিটি গেটেই রয়েছে অসাধারণ সুন্দর নকশা, যা লাল-নীল বা সোনালি রঙের পাথর দিয়ে তৈরি। গেট থেকে মর্মর পাথরে নির্মিত বড় একটি রাস্তা চলে গেছে সমাধিস্থল বরাবর। দুপাশে বিশাল খালি প্রান্তর। এখানে কিছু হরিণকে বেড়াতে দেখা যায়। ভাগ্য ভালো হলে এক-দুটি ময়ূরেরও দর্শন পাওয়া যায়। সামনে একটি স্বচ্ছ পানির ফোয়ারা।

আকবরের হাতে তৈরি হওয়ার কারণে এর প্রবেশ তোরণে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। লাল গৈরিক চার বেলে পাথরের তৈরি প্রবেশ তোরণের একটি হিন্দু, একটি মুসলিম, একটি খ্রিষ্টীয় আর চতুর্থটি আকবরের বিশ্বজনীন শৈলীতে তৈরি। প্রবেশ তোরণের ক্যালিওগ্ৰাফিতে মোট ছত্রিশটি বাণী। তার প্রথম তেইশটি ঘোষণা করছে আকবরের জাগতিক পরিচয়, জীবনকথা। বাকি তেরোটি বাণী হযরত মোহাম্মদের (স.) ধর্মনিদেশ, বিশ্ব প্রেম-মৈত্রীর কথা, মুক্তির কথা ও ভাবের কথা।

jagonews24

বাগান পেরিয়ে ফতেহপুর সিক্রির পাঁচ মহলের আদলে ২২.৫ মিটার উচ্চ চারতলা সৌধ তৈরি হয়েছে সমাধির উপর। প্রথম তিনটি তলা লাল বেলে পাথরের, আর সর্বোচ্চ তলাটি শ্বেত মর্মরের। চারপাশে ৯৩ ধাপের চার মিনারেট। ভূগর্ভে মূল সমাধি। দক্ষিণ দিক থেকে পথ নেমেছে স্বর্ণখচিত ফ্রেস্কো চিত্রে সুশোভিত ধনুকাকৃতি খিলানের ভূগর্ভস্থ সমাধিকক্ষে। উপরে প্রতিরূপ হয়েছে ৩০ ফুট উঁচু বেদিতে। মূল কবর একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষের ভেতর। সেখানে যাওয়ার পথটিও কেমন অন্ধকার আর ভুতুড়ে। ভয়ে গা ছমছম করে ওঠে। ভেতরে আলো-আঁধারির খেলা। কবরটি মর্মর পাথরে আবৃত। মাধির ঠিক ওপর বরাবর মিটিমিটি জ্বলে পুরোনো আমলের একটি ঝাড়বাতি। সে আলোয় কবরের গায়ে কুরআনের কয়েকটি আয়াত দেখা যায়। ঝাড়বাতি ছাড়া ভেতরে অন্য আলো জ্বালানো বা মোবাইলে ছবি তোলা নিষেধ।

আকবর যখন এ ইমারতের নির্মাণ শুরে করেছিলেন; তখন তার ইচ্ছা ছিল সেকেন্দ্রার সমাধিভবনই হবে মুঘল সাম্রাজ্যের পারিবারিক সমাধি ক্ষেত্র। সে হিসেবে একতলার ঘরগুলো কবর দেওয়ার উপযুক্ত করে তৈরি করেন। এখানে আকবর ছাড়াও আরাম বানু বেগম (আকবরের ছোট মেয়ে), দানিয়াল মীর্জা (আকবরের ছেলে), জেব-উন-নিসা (আওরঙ্গজেবের বড় মেয়ে), ফ্লোরা অ্যানি স্টিল (ব্রিটিশ লেখিকা), খানুম সুলতান বেগম (আকবরের বড় মেয়ে) সমাহিত আছেন। আছে মুমতাজের সদ্যজাত দুই সন্তানের কবর। এ দুই শিশুর কবরের সেনোটাফে দুধ ঢালার জন্য গর্ত করা আছে।

একতলার কক্ষগুলো প্রত্যেকটি ভবিষ্যতে মুঘল বংশের অন্যান্য সদস্যের কবর দেওয়ার জন্য পরিকল্পিত হওয়ার কারণে প্রত্যেকটি কক্ষের ছাদ গম্বুজাকৃতি (কনকেভ মিরর)। যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আওয়াজ করলে প্রতিধ্বনি হয়। স্তম্ভগুলো এমনভাবে তৈরি, একটি স্তম্ভের গায়ে ফিসফিস করে কথা বললেও তা বিপরীত দিকের স্তম্ভে কান পাতলে স্পষ্ট শোনা যায়।

jagonews24

মনে করা হয়, নিচের তলা আকবরের তৈরি হলেও উপরের তলাগুলো জাহাঙ্গীরের তৈরি। তাই কিছু কিছু জায়গায় আর্কিটেকচারাল পার্থক্য দেখা যায়।

আকবর এর নির্মাণ কাজ শুরু করেন ১৫৯৮ সালে। ১৬০৪ সালে তার মৃত্যুর সময় এর নির্মাণ মনে হয় একতলা পর্যন্ত হয়েছিল। একতলার কেন্দ্রস্থলে তিনি গড়েছিলেন জমিন সই সুবৃহৎ ইবানটি। ইবানের মাথায় একটিমাত্র চবুতরা- সেটি গোলাকৃতি নয়, আয়তক্ষেত্র এবং তিন তিন খিলান সম্বলিত। আর তার একেক পাশে পাঁচটি করে খিলান। আকবর নির্মিত এ প্রথমতলের উচ্চতা ৯.১৪ মিটার। দেখে তাই একেক সময়ে মনে হবে, আকবর বৃহত্তর কিছু গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর কারণে তা সম্পূর্ণ হয়নি।

তবে এর বাগিচার ভূমি নকশা ও দক্ষিণ তোরণ তিনিই নির্মাণ করান। এছাড়া অপর তিনটি তোরণ প্রতিম ইমারতও সম্ভবত তার আমলেই তৈরি। জাহাঙ্গীর ১৬১২ সাল পর্যন্ত বাকি তিনটি তলা শেষ করেন। হিন্দু-মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল এ সৌধ নির্মাণে।

লেখক: ভ্রমণ উপদেষ্টা, দিল্লি।

এসইউ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]