পিআইসিইউ সংকটে জিবিএস আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু-পঙ্গুত্ব বাড়ছে


প্রকাশিত: ০৪:৫৩ পিএম, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫

দেশে শিশুরা গুইলেইন বারি সিন্ড্রোম (Guillain-Barre syndrome) বা জিবিএস নামক এক ধরনের জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে শুধুমাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগেই প্রায় দেড় শতাধিক জিবিএস রোগী ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে সাত শিশু।

সংখ্যাতত্ত্ব বিশ্লেষণে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা স্বল্প সংখ্যক মনে হলেও বিশেষ ধরনের জটিল এ রোগের রোগীদের অধিকাংশই প্রয়োজনীয় সুচিকিৎসার অভাবে কেউ পঙ্গু হয়ে আবার কেউবা বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢামেকের একাধিক শিশু বিশেষজ্ঞ জানান, ভর্তিকৃত রোগীদের সিংহভাগই ফলো-আপ চিকিৎসায় আসেন না। ফলে জিবিএস রোগীদের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই।

কমপাইলোবেকটর জিজোনি নামক এক ধরনের ভাইরাস সংক্রমণে শিশুর শরীরের বিভিন্ন নার্ভ (মাংসপেশী) সিস্টেম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে হঠাৎ করেই শিশুর প্যারালাইসিস হয়। পা থেকে পর্যায়ক্রমে হাত, শ্বাস, গলা ও ব্রেনের নার্ভে সংক্রমণ ঘটে। অনেক সময় এক সঙ্গে চার হাত পা প্যারালাইজড হয়ে যায়। একাধিক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জিবিএস আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যাদের শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা দেখা দেয় তাদের জন্য পেডিয়েট্রিক আইসিইউ (পিআইসিইউ) রেখে চিকিৎসা প্রদান একটি গুরত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ হলেও ঢামেকসহ কোনো সরকারি হাসপাতালে তা নেই।

এ ধরনের জিবিএস রোগীদেও ক্ষেত্রে টানা দুই-তিনমাস পর্যন্ত রোগীকে পিআইসিইউতে ভেন্টিলেটরে রেখে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে ঢামেকসহ সরকারি কোনো হাসপাতালে শিশুরা আইসিইউর ন্যুনতম চিকিৎসাটুকুও পায় না।

শিশু বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রধানত ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবিউলিন (আইভিআইজি) ডোজের মাধ্যমে জিবিএস  রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করা হয়। দেশের বাজারে এই ওষুধটি পাওয়া যায় না। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত এ ওষুধের দাম আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ টাকা।

আইভিআইজি ও পিআইসিইউ উভয় পদ্ধতির চিকিৎসার সঙ্গে আর্থিক সঙ্গতির বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বিধায় অধিকাংশ জিবিএস রোগীর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয়। সৌভাগ্যেক্রমে যারা বেঁচে যায় তারা আজীবন পঙ্গু ও প্যারালাইজড হয়ে বেঁচে থাকেন।

জাগো নিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০১০ সালে ২৭ জন, ২০১১ সালে ২৯ জন, ২০১২ সালে ২৭ জন, ২০১৩ সালে ৩১ জন ও ২০১৪ সালে ২৫ জনসহ মোট ১৩৯ জন জিবিএস রোগী ভর্তি হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ সময়ে মারা গেছে যথাক্রমে ২, ১, ১, ২ ও ১ জনসহ মোট ৭ জন।

সম্প্রতি বিএসএমএমইউতে চার বছরের ছোট শিশু কেসপারের মৃত্যুর পর পিআইসিইউর সংকটের বিষয়টি সামনে উঠে আসে। কেসপার জিবিএস রোগে আক্রান্ত না হলেও শরীর থেকে অবিরাম রক্তক্ষরণজনিত কারণ খুঁজে বের করতে তার অস্ত্রোপচার করেন বিএসএমএমইউ চিকিৎসকরা। অস্ত্রোপচারের পর পরবর্তীতে তাৎক্ষণিকভাবে পিআইসিইউ চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও বিএসএমএমইউতে পিআইসিইউ না থাকায় সেখানে রেখে চিকিৎসা সম্ভব হয়নি।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢামেক ও অন্যান্য সরকারি হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞরা জানান, শুধু জিবিএস রোগই  নয়, অন্যান্য শিশু রোগ যেমন তীব্র নিউমোনিয়া, ম্যানেনজাইটিস (মস্তিষ্কে বহিরাবরনে প্রদাহ), টিউবারকুলার ম্যানেনজাইটিস (মস্তিষ্কের ভিতরে যক্ষ্মার সংক্রমণ) এনকেফালাইটিস (মস্কিষ্কের ভিতরে সংক্রমণ) ও নিপার চিকিৎসায় পিআইসিইউ প্রয়োজন হলেও তা পাচ্ছে না সিংহভাগ শিশু। জিবিএসসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় প্রতিটি সরকারি হাসপাতালেই পেডিয়েট্রিক (একমাস থেকে বার বছর বয়সী শিশুদের জন্য) আইসিইউ স্থাপন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন।

ঢামেক শিশু বিভাগের একজন অধ্যাপকের কাছে জিবিএস রোগীর তথ্য ও পিআইসিইউ সংকট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানান, সব ধরনের জিবিএস রোগীর জন্য পিআইসিইউ প্রয়োজন হয় না। জিবিএসবাহী ভাইরাস সংক্রমণের ফলে শিশু স্বাভাবিকভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করতে না পারলে তাকে আবশ্যিকভাবে পিআইসিইউতে ভেন্টিলেটর মেশিনে রেখে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

সরকারি হাসপাতালে পিআইসিইউ না থাকায় বিকল্প অ্যাম্বুব্যাগের সাহায্যে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দেয়ার চেষ্টা করা হয়। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় বেশি হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের শিশু ধুঁকে ধুঁকে মারা যায় বলে তিনি স্বীকার করেন।

মহাখালী রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান এ প্রসঙ্গে জানান, জিবিএস আক্রান্ত শিশুদের অনেকেই হঠাৎ করে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সংক্রমণের রোগীদের কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের সাহায্যে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখা গেলে জীবন রক্ষা করা সম্ভব  হয়। এ জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে পিআইসিইউ স্থাপন জরুরি প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

# দেশের একটি সরকারি হাসপাতালেও পেডিয়েট্রিক আইসিইউ নেই
# পিআইসিইউ চিকিৎসার নামে শিশুদের গিনিপিগ বানানো হচ্ছে!
# মানহীন আইসিইউ এখন মরণফাঁদ

এমইউ/বিএ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]