‘ডায়াবেটিস রোধ করা গেলে এ টাকায় চারটি পদ্মা সেতু তৈরি সম্ভব’

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২৫ পিএম, ১১ আগস্ট ২০২২
বিএসএমএমইউয়ে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ নিয়ে আয়োজিত আলোচনা সভা

দেশের ১ কোটি ৩১ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এসব রোগীর পেছনে প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় তা দিয়ে প্রতি বছর চারটি পদ্মা সেতু বানানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ।

বৃহস্পতিবার (১১ আগস্ট) বিএসএমএমইউয়ের এ ব্লক মিলনায়তনে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ নিয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, দেশে প্রি-ডায়াবেটিস কন্ডিশনে ভুগছেন ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ। তাছাড়া, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রতিটি পরিবার এ রোগের পেছনে প্রতি বছর ৮৬২ ডলার খরচ করে। অর্থাৎ প্রতি বছর ১ কোটি ৩১ লাখ ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ১ লাখ কোটিরও বেশি টাকা খরচ হয়। এ টাকা দিয়ে বছরে চারটি পদ্মা সেতু বানানো সম্ভব।

প্রধান অতিথি বলেন, বিএসএমএমইউতে যদি স্টুল এলকালাইন ফসফেট টেস্টের মাধ্যমে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা সম্ভব হয়, তাহলে দেশে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএসএমএমইউয়ের এন্ড্রোক্রাইনোলজি বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ডা. মধু এস মালো।

তিনি বলেন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ইঁদুরের ওপর কাজ করেছিলাম। যে ইঁদুরগুলো নিয়ে কাজ করছিলাম, সেগুলোতে একটি এনজাইম কম ছিল। এর নাম ইন্টেসটিনাল এলকালাইল ফসফেটস। ইন্টেসটিনাল এলকালাইল ফসফেটসের কাজ হচ্ছে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াল টক্সিনকে ধ্বংস করা।

‘এসব টক্সিন যদি রক্তে যায় তবে শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে। প্রদাহ যদি প্যানক্রিয়াসের বিটাসেলে আক্রান্ত হয় তবে এটি টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস। আর প্রদাহ যদি ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তবে তা টাইপ টু ডায়াবেটিস।’

তিনি আরও বলেন, আমি যে ইঁদুরগুলোর কথা বলছিলাম তাদের ইন্টেসটিনাল এলকালাইল ফসফেটস ছিল না। তখন আমি চিন্তা করি, এসব ইঁদুর টক্সিন ধ্বংস করতে পারবে না। এদের ডায়াবেটিস হওয়া উচিত।

‘পরে আমি ইঁদুরগুলোকে পরীক্ষা করে দেখতে পেলাম, আসলেই এদের ডায়াবেটিস আছে। এদের কোলেস্টেরল লেভেল হাই, টাইগ্রিস লেভেল হাই, এসডিএল লো আবার এলডিএল লেভেল হাই। এদের লিভারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

অধ্যাপক ডা. মধু এস মালো আরও বলেন, হার্ভার্ড থেকে দেশে ফিরে আমি মানুষের ওপর গবেষণা চালাতে থাকি। মানুষের ওপর গবেষণা শুরু করার আগে আমার মনে হলো, ডায়াবেটিস আক্রান্ত ইঁদুরে যদি ইন্টেসটিনাল এলকালাইল ফসফেটস এনজামইম কম থাকে, তাহলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষেরও এ এনজাইম কম থাকবে।

‘মানুষের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে এর সত্যতা পেলাম। যারা ডায়াবেটিস আক্রান্ত তাদের ওই এনজাইম আসলেই প্রায় ৫০ শতাংশ কম। এ তথ্য পাওয়ার পর আমার থিওরি হলো, এ আইপি এনজাইম ডেফিসিয়েন্সি সম্ভবত ডায়াবেটিস তৈরি করছে। এটিই ডায়াবেটিস রোগের কারণ।’

তিনি বলেন, এরপর তখন আমি আইপি এনজাইম বেশি ও কম দুটি গ্রুপ নিয়ে কাজ শুরু করি। এসব ব্যক্তিকে আমি পাঁচ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করি। পর্যবেক্ষণে দেখলাম, যাদের আইপি এনজাইম কম তাদের ১৪ গুণ বেশি ডায়াবেটিস হচ্ছে।

অধ্যাপক ডা. মধু এস মালো বলেন, এ আবিষ্কারের ভিত্তিতে আমি একটি পরীক্ষণ প্রক্রিয়া গড়ে তুলি। যার নাম স্টুল এলকালাইন ফসফেট এনজাইম টেস্ট। এ এনজাইমটা মূলত স্টুলেই পাওয়া যায়। যাদের স্টুলে এলকালাইন ফসফেট কম, তাদের ডায়াবেটিস বেশি।

তিনি আরও বলেন, ৩০-৬০ বছর বয়সী মানুষদের ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং করতে হবে। তাদের মধ্যে আইপি এনজাইম কম থাকলে স্বাস্থ্যশিক্ষা দিতে হবে। আমি মনে করি, এর মাধ্যমে বিশ্ব থেকে ডায়াবেটিস দূর করা সম্ভব হবে।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ডায়াবেটিস একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্বজুড়ে ৪৬ কোটির বেশি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। আরও প্রায় ৪৬ কোটি মানুষ প্রি-ডায়াবেটিস কন্ডিশনে ভুগছেন। বিশ্বে ২০০ মিলিয়ন লোক অর্থাৎ ২০ কোটি মানুষ এখনো এ রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা থেকে বাইরে রয়ে গেছেন।

বিএসএমএমইউয়ের এন্ড্রোক্রাইনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এমএ হাসনাতের সভাপতিত্বে এ সময় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বিএসএমএমইউর উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. একেএম মোশাররফ হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সালেকুল ইসলাম।

সভা সঞ্চালনা করেন এন্ড্রোক্রাইনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তাহনিয়া হক।

এএএম/এসএএইচ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।