মোটা টাকা নিয়ে অস্ত্রোপচার হলেও হয়নি টিউমার অপসারণ!

আবদুল্লাহ আল মিরাজ
আবদুল্লাহ আল মিরাজ আবদুল্লাহ আল মিরাজ , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৬ পিএম, ১৮ আগস্ট ২০২২

রাজধানীর ধানমন্ডির ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এবং সুপার স্পেশালিটি সেন্টারে স্তনের টিউমার অপসারণে অস্ত্রোপচার করেন নারায়ণগঞ্জের নিতু আক্তার (৩৬)। তবে অস্ত্রোপচার হলেও তার টিউমার সেই অবস্থায়ই রয়ে গেছে। টিউমার অপসারণ না করেও অস্ত্রোপচারের নামে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালটির চিকিৎসক আলী নাফিসা রহমানের বিরুদ্ধে। যদিও আলী নাফিসা বলেছেন, অভিযোগের বিষয় তার স্মরণে নেই। রোগীকে নেওয়া হলে তিনি অভিযোগ সম্পর্কে বলতে পারবেন। এছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।

অভিযোগকারী নিতু আক্তার জাগো নিউজকে জানান, দীর্ঘদিন স্তনে ব্যথা নিয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন তিনি। তবে সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনায় বিরক্ত হয়ে আত্মীয়-স্বজনদের পরামর্শে রাজধানীর বিআরবি হাসপাতালে ডা. আলী নাফিসার শরণাপন্ন হন। তখন তাকে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দেওয়া হয়। এসময় তার স্তনে ছোট টিউমার ধরা পড়ে। টিউমারটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন নিতু। এর মধ্যে ডা. আলী নাফিসা ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতালে যোগ দেন। সেখানেই গত ২৬ মে অস্ত্রোপচার হয় তার।

অস্ত্রোপচারকালে এক লাখ ৬২ হাজার টাকা নেওয়া হয় দাবি করে নিতু আক্তার বলেন, টাকার রশিদও চিকিৎসক রেখে দেন।

তিনি বলেন, এত টাকা দিয়ে চিকিৎসা করানোর পরও আমার একই অবস্থা রয়ে যায়। অস্ত্রোপচারের পরও ব্যথা কমেনি। অস্ত্রোপচারের সপ্তাহখানেক পার না হতেই প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। বারবার ওনার (ডা. নাফিসা) কাছে গেলেও কোনো পরীক্ষা না করেই এক ধরনের জেল ব্যবহারের পরামর্শ দেন। উল্টো আমার স্বামী প্রবাসী জেনে ওই চিকিৎসক বলেন, আপনার ভাগ্য ভালো এত কম টাকায় হয়েছে। আরও বেশি টাকা খসানো উচিত ছিল।

ভুক্তভোগী এই নারী বলেন, ভবিষ্যতের কথা ভেবে ব্যাংকে কিছু টাকা জমা রেখেছিলাম। সবকিছু দিয়ে অস্ত্রোপচার করলাম। যতবার গিয়েছি প্রতিবারই দেড় হাজার টাকা ভিজিট দিতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে ভোগান্তির কারণে বেসরকারিতে গেলাম। কিন্তু টাকার ওপর টাকা গেল, সঠিক চিকিৎসাও পেলাম না।

অস্ত্রোপচারের পরও ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে ল্যাবএইড হাসপাতালের নারায়ণগঞ্জ শাখায় আলট্রাসনোগ্রাফি করান নিতু আক্তার। এতে দেখা যায় টিউমার পূর্বাবস্থায় রয়ে গেছে, অপসারণ হয়নি। উল্টো অস্ত্রোপচারের কাটা-ছেঁড়ার ফলে দেখা দিয়েছে ইনফেকশন। এতে ব্যথাও বেড়ে গেছে।

ভুক্তভোগী নিতু আক্তার আরও বলেন, আলট্রাসনোগ্রাফির রিপোর্ট নিয়ে ডা. নাফিসার কাছে গেলে তিনি বলেন, টিউমার অপসারণ হয়নি কে বলেছে আপনাকে? পরে ডা. নাফিসা নতুন করে বায়োপসি করার কথা বলেন। যা করতে আরও সাড়ে ১০ হাজার টাকার প্রয়োজন। অপারেশন হলে নতুন করে কেন আবার বায়োপসি করতে হবে জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেননি ওই চিকিৎসক।

এরপর থেকে ডা. নাফিসার সঙ্গে আর যোগাযোগ করেননি নিতু। গত ১৬ জুলাই সবশেষ ওই চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেন তিনি।

পরে ধানমন্ডিতে অন্য একজন সার্জনের শরণাপন্ন হন নিতু। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করা শর্তে ওই সার্জন জাগো নিউজকে জানান, এই রোগীর সঙ্গে যা করা হয়েছে তা আমাদের (চিকিৎসকদের) জন্য লজ্জার। এই ধরনের অস্ত্রোপচারে সরকারি হাসপাতালগুলোতে নামমাত্র ফি নেওয়া হয়। এছাড়া স্কয়ার হাসপাতালের মতো বেসরকারি করপোরেট হাসপাতালেও ওষুধসহ সব খরচ মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা লাগতে পারে। এত টাকা কীভাবে নেওয়া হলো তা আমার বোধগম্য নয়। এই রোগীর সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ডা. আলী নাফিসা রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন জাগো নিউজের এই প্রতিবেদক। সেসময় তিনি বলেন, বিষয়টি স্মরণে নেই। রোগীকে যদি আমার কাছে আবারও নিয়ে আসা হয় তাহলে আমি দেখে এই অভিযোগের বিষয়ে বলতে পারবো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক অধ্যাপক স্তন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে জানান, রোগীর অস্ত্রোপচারের পর টিউমার থেকে যাওয়াটা দুঃখজনক। অস্ত্রোপচারের আগে সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিয়ে এরপর কাজ করা উচিত। যাতে প্রথমবারেই টিউমার সঠিকভাবে বের করে আনা যায়।

তিনি বলেন, এখনকার চিকিৎসকরা সবকিছু করতে চান। একটা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না হয়ে সবকিছু করতে চাইলে অপরিপক্ক কাজ হয়ে থাকে। তাই চিকিৎসকদের আরও সতর্ক হতে হবে।

নিতু আক্তারের কাছ থেকে অস্ত্রোপচার বাবদ টাকা বেশি নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ডা. মিজানুর রহমান বলেন, টাকার বিষয়টা নিয়ে আমি মন্তব্য করবো না। একেক চিকিৎসক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে টাকা নিয়ে থাকেন। এই রোগীর ক্ষেত্রে কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, কীভাবে হয়েছে তা সঠিকভাবে জানতে হবে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ল্যাবএইড ক্যানসার হাসপাতাল এবং সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা অমিতাভ ভট্টাচার্য জাগো নিউজকে বলেন, বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখবো। এ ধরনের কোনো বিষয় ঘটে থাকলে সেক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নেবো।

এএএম/কেএসআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।