অস্ট্রেলিয়া

Team Image

তবুও তারা শ্বাশত ফেবারিট

ক্রিকেটের যা কিছু প্রথম, তার সব কিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে অস্ট্রেলিয়ার নাম। এ যেন এক অমোঘ বিধান। ১৮৭৭ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসের যাত্রা শুরু। সেখানে জড়িয়ে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার নাম। ১৯৭১ সালে বৃষ্টির কল্যাণে ওয়ানডে ক্রিকেটের গোড়া পত্তন। তাতেও জড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার নাম। প্রতিপক্ষ সেই ইংল্যান্ড।

ক্রিকেটের সব প্রথমের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে হেঁটেছে। তবে পরের ধাপে এসে বাদ পড়ে গেলো ইংল্যান্ড। ২০০৪-০৫ মৌসুমে এসে সর্বপ্রথম টি-টোয়েন্টির প্রচলন। এখানেও একটি প্রতিপক্ষ হিসেবে থেকে গেলো অস্ট্রেলিয়া। বাকি প্রতিপক্ষটির নাম ছিল নিউজিল্যান্ড। 

বিশ্বকাপ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দলটির নাম অস্ট্রেলিয়া। সর্বশেষ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন তারা। পাশাপাশি ১৯৯৯ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত টানা তিনবার এবং তার আগে ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপ ট্রফিটিও গিয়েছিল তাদের ঘরে।

এমন বর্ণাঢ্য রেকর্ডের পরও কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের তালিকায় নেই অস্ট্রেলিয়ার নাম। শুধু তাই নয়, সর্বশেষ প্রকাশিত র‌্যাংকিং অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান ৫ম স্থানে। বিশ্বকাপের আগে অসিদের এই অবস্থা! নিশ্চিত এরচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর হতে পারে না।

তবে, র‌্যাংকিং যাই হোক, বিশ্বকাপের আগে কয়েকটি পারফরম্যান্স অস্ট্রেলিয়াকে আবারও পুনরূজ্জীবিত করবে সন্দেহ নেই। বিশেষ করে শেষ দুটি ওয়ানডে সিরিজ। ভারতের মাটিতে এসে বিরাট কোহলিদের ৩-২ ব্যবধানে পরাজিত করে সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে তারা।

এখানেও বিশেষত্ব ছিল। প্রথম দুই ম্যাচে হারের পর যখন নিশ্চিত সিরিজ হেরে যাচ্ছিল তারা, তখনই ঘুরে দাঁড়ায় অ্যারোন ফিঞ্চের বাহিনী। শেষ পর্যন্ত টানা তিন ম্যাচ জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করে তারা। তার আগে ভারতকে তাদেরই মাটিতে টি-টোয়েন্টিতে ২-০ ব্যবধানে হারায় অস্ট্রেলিয়া।

এরপর আরব আমিরাতে পাকিস্তানকে ৫-০ ব্যবধানে পরাজিত করেছে ফিঞ্চ বাহিনী। অথচ, আরব আমিরাত হচ্ছে পাকিস্তানের হোম ভেন্যু। সেখানেই স্বাগতিকদের ধুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গেলো অসিরা। এই দুটি সিরিজ জয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার জন্য আরও বড় সুসংবাদ হচ্ছে, তাদের স্কোয়াডে ফিরেছে সবচেয়ে সেরা দুই তারকা স্টিভেন স্মিথ এবং ডেভিড ওয়ার্নার। বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারির অপরাধে এক বছর নিষিদ্ধ ছিলেন তারা দু’জন।

বিশ্বকাপের ঠিক আগে এ কয়েকটি ঘটনা নিঃসন্দেহে অসিদের অনুপ্রাণিত করবে। তবুও ২০১৯ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিযা মাঠে নামবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে, ফেবারিট হিসেবে নয়!

বিশ্বকাপে মোট ম্যাচ জয়ের দিক থেকেও সবচেয়ে সফল অস্ট্রেলিয়া। ১৯৭৫ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত অসিরা খেলেছে মোট ৮৪টি ম্যাচ। ৬২ টি জয়ের বিপরীতে হেরেছে কেবল ২০টিতে। অন্য দুই ম্যাচের একটি টাই এবং একটিতে ফল হয়নি।

শতকরা হিসাবে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসরে অসিরা ৭৫.৩০ ভাগ ম্যাচ জিতেছে। অন্য কোনো দল তাদের ধারেকাছেও নেই। ঠিক যেভাবে অস্ট্রেলিয়ার পাঁচ বিশ্বকাপ শিরোপার বিপরীতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দু’বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ড আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর ভারতের।

তবে প্রথম দুই বিশ্বকাপ জিতে যেন পথ হারিয়ে ফেলে ক্যারিবিয়ানরা। ভারত ১৯৮৩ সালের পর ২৮ বছর বিরতি দিয়ে ২০১১ সালে হোম ভেন্যুতে দ্বিতীয়বার শিরোপা জয় করে নিয়েছে। এর বাইরে উপমহাদেশের দুই দল পাকিস্তান (১৯৯২) আর শ্রীলংকা (১৯৯৬) একবার করে শিরোপা জিতেছে।

দল হিসেবে বিশ্বকাপের হ্যাটট্রিক শিরোপা ১৯৯৯, ২০০৩ ও ২০০৭ সালের আসরেই জেতা হয়ে হয়ে গেছে অসিদের। ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের অংশীদার ছিলেন বর্তমান অধিনায়ক অ্যারোন ফিঞ্চও। ২০১৫ বিশ্বকাপের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। এছাড়া বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন স্টিভেন স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার, প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, গ্লেন ম্যাক্সওয়েলরা।

অস্ট্রেলিয়ার এবারের দলটা নিয়ে কিছুদিন আগেও দুশ্চিন্তায় ছিল খোদ অসিরা। এক বছর আগে বল টেম্পারিং কাণ্ডে স্মিথ, ওয়ার্নার এবং ক্যামেরন বেনক্রফটকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর তোলপাড় তৈরি হয় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে। তখন থেকেই তলানিতে হাঁটতে শুরু করে ম্যান ইন ইয়োলোরা।

এবার যদিও গ্রুপ পর্ব নেই। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী সবগুলো দলকেই খেলতে হবে সবার বিপক্ষে। অর্থ্যাৎ, প্রতিটি দলকে খেলতে হবে কমপক্ষে ৯টি ম্যাচ। এরপর সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল। হঠাৎই যেভাবে ফর্মে ফিরে এসেছে অস্ট্রেলিয়ানরা, ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে বোঝাই যাচ্ছে, এবার শিরোপার হয়তো অন্যতম দাবিদার তারা।

মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্সের সঙ্গে রয়েছেন তরুণ পেসার জ্যাসন বেহরেনডর্ফ, নাথান কল্টার-নাইল, ঝি রিচার্ডসন। তাদের সঙ্গে রয়েছেন দুই অভিজ্ঞ স্পিনার নাথান লায়ন এবং অ্যাডাম জাম্পা। এর মধ্যে জাম্পা আবার লেগ স্পিনার। অধিনায়ক ফিঞ্চ চাইলে স্পিনার হিসেবে স্মিথ এবং ম্যাক্সওয়েলকেও ব্যবহার করতে পারেন। ম্যাক্সওয়েল তো প্রায়ই ব্রেক থ্রু এনে দেন দলকে। সুতরাং, বোলিং ডিপার্টমেন্টে বলা যায় অস্ট্রেলিয়ানদের কোনো ঘাটতি নেই।

ব্যাটসম্যানদের মধ্যে অধিনায়ক অ্যারোন ফিঞ্চ রয়েছেন দুর্দান্ত ফর্মে। সঙ্গে সর্বশেষ দুই সিরিজে দারুণ ব্যাটিং করেছেন উসমান খাজা, গ্লেন ম্যাক্সওয়েলরা। এক বছরের নিষেধাজ্ঞা শেষে দলে ফিরলেও ডেভিড ওয়ার্নার আর স্টিভেন স্মিথও রয়েছেন দারুণ ফর্মে। বিশেষ করে ওয়ার্নার তো সর্বশেষ আইপিএলে ঈর্ষণীয় ব্যাটিং করে গেছেন। স্মিথও ছিলেন ফর্মে এবং শেষ মুহূর্তে রাজস্থানের নেতৃত্ব দিতে গিয়েও দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন তিনি। সঙ্গে মার্কাস স্টোইনিজ, অ্যালেক্স ক্যারে, শন মার্শ- এরা হচ্ছেন দলের নিউক্লিয়াস।

১৯৯৬ সাল থেকে শুরু করে ২০০৭- টানা চার বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলছে অস্ট্রেলিয়া। ১৯৯৬ সালে উপমহাদেশেই শ্রীলংকার কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়েছিল তাদের। এরপর এই ইংল্যান্ডের মাটিতেই ১৯৯৯-এর ফাইনালে তারা পরাস্ত করেছিল পাকিস্তানকে। ৪ বছর পর ২০০৩-এ হতাশায় ডোবে প্রতিবেশী দেশ ভারত। সবশেষে ২০০৭-এ শ্রীলংকাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয় দ্বিতীয় স্থান নিয়ে।

মজার ব্যাপার হলো, তিনটি ফাইনালই ছিল একপেশে। প্রতিপক্ষকে লড়াইয়ে থাকতেই দেয়নি অস্ট্রেলিয়া। প্রথমবার পাকিস্তানকে ১৩২ রান অলআউট করে; পরের দু’বার ভারত আর শ্রীলংকার বিপক্ষে পাহাড় সমান রান জমা করে। ২০০৩ সালে ৩৫৯ রানের জবাবে সৌরভ গাঙ্গুলির ভারত হেরেছিল ১২৫ রানের বড় ব্যবধানে। ৪ বছর পর অসিদের ২৮১ রানের সঙ্গে লড়ে পেরে ওঠেনি মাহেলা জয়াবর্ধনের শ্রীলংকাও। হার মানে ৫৩ রানে।

১৯৯৬ সালে উপমহাদেশের মাটিতে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে শিরোপা জেতা হয়নি মার্ক টেলরের অস্ট্রেলিয়ার। সেই উপমহাদেশে একযুগ পর কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল অসিদের। কিন্তু ২০১১ সালে উপমহাদেশ থেকে শিরোপা জিততে না পারলে কি হবে, চার বছর পর নিজ দেশের মাটিতে ঠিকই বিশ্বকাপটা পূনরূদ্ধার করে নেয় তারা।

মাইকেল ক্লার্কের নেতৃত্বে গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের সঙ্গে ম্যাচটি মাঠেই গড়ায়নি বৃষ্টির কারণে। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের মাঠে গিয়ে হেরে এসেছিল তারা। এছাড়া আর কোনো ম্যাচেই হারতে হয়নি অস্ট্রেলিয়াকে। ফাইনালে মেলবোর্নে নিউজিল্যান্ডকে ১৮৩ রানে অলআউট করে দিয়ে অস্ট্রেলিয়া ৫মবারেরমত বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নেয়।

১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ড থেকে বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তুলে নিয়েছিল অসিরা। সেবার তারা জন্ম দিয়েছিল দারুণ থ্রিলার। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুই ম্যাচের থ্রিলিং জয়ের পর পাকিস্তানকে করেছিল বিধ্বস্ত। এবার সেই ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ। এবারও কি তবে সেই ইংল্যান্ড থেকে বিশ্বকাপ জয় করে নেবে অস্ট্রেলিয়া?

Captain Image

অ্যারোন ফিঞ্চ

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্বভার থাকতো স্টিভেন স্মিথের কাঁধে; কিন্তু গতবছরের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন তৎকালীন অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ এবং সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার।

এতেই বদলে যায় চিত্রনাট্য। রদবদল আসে অস্ট্রেলিয়া দলে, অধিনায়কত্বের পালাবদল শেষে তা স্থায়ী হয় অ্যারোন ফিঞ্চের কাঁধে। ৩২ বছর বয়সী ডানহাতি মারকুটে ব্যাটসম্যান ফিঞ্চের নেতৃত্বেই শিরোপা ধরে রাখার মিশনে খেলতে নামবে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা।

২০১১ সালে টি-টোয়েন্টি স্পেশালিস্ট হিসেবে জাতীয় দলে প্রবেশ করেন ফিঞ্চ। ক্রিকেটে ক্ষুদ্রতম সংস্করণে বিশেষ পারদর্শিতার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই এই ফরম্যাটের দলে নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেন ফিঞ্চ। বছরদুয়েক পরে সুযোগ পেয়ে যান ওয়ানডে দলেও।

রঙিন পোশাকের ক্রিকেটে নিজের জাত চেনাতে খুব একটা সময় নেননি ফিঞ্চ। যে কারণে ঘরের মাঠে হওয়া ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে ডাক পান নিজ দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার। সে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজের প্রথম ম্যাচেই ১৩৫ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচসেরার পুরষ্কার জেতেন ফিঞ্চ। তবে বাকি ৭ ইনিংসে সবমিলিয়ে ১৪৫ রানের বেশি করতে পারেননি তিনি।

২০১৭ সালের নিউজিল্যান্ড সফরে দুই ম্যাচের জন্য প্রথমবারের মতো ওয়ানডে দলের অধিনায়কত্ব পান ফিঞ্চ। পরে নিয়মিত অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ ফেরায় পুনরায় সাধারণ খেলোয়াড় হিসেবে খেলতে থাকেন তিনি। ২০১৮ সালে স্মিথ-ওয়ার্নারের বল টেম্পারিং ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান টিম পেইনকে দেয়া হয় টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি দলের দায়িত্ব।

কিন্তু পেইনের অধীনে দলের পারফরম্যান্স আশানুরূপ না হওয়ায় গত নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজে ওয়ানডে দলের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পান ফিঞ্চ। যা চলমান রয়েছে এখনো পর্যন্ত। বিশ্বকাপেও তার অধীনেই খেলবে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল।

অধিনায়ক হিসেবে এখনো পর্যন্ত ১৮ ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে ১০টিতে হাসিমুখে মাঠ ছেড়েছেন তিনি। হেরেছেন বাকি ৮ ম্যাচে, জয়ের শতকরা হার ৫৫.৫৫! এই ১৮ ম্যাচে ব্যাট হাতে ফিঞ্চের পরিসংখ্যান ২ সেঞ্চুরি ও ৪ ফিফটিতে ৪৪.১৭ গড়ে ৭৫১ রান। ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ ১৫৩ রানের অপরাজিত ইনিংসটিও তিনি খেলেছেন অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড হাতে নিয়েই।

১৯৮৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়াতে জন্ম নেয়া ফিঞ্চ এখনো পর্যন্ত সবমিলিয়ে ওয়ানডে খেলেছেন ১০৯টি, ১৩ সেঞ্চুরি ও ২১ ফিফটিতে ৩৯.৩৩ গড়ে তার সংগ্রহ ৪০৫২ রান। এতে স্পষ্ট প্রতিয়মান অধিনায়ক হিসেবে তার পারফরম্যান্সের গ্রাফটা উর্ধ্বমুখী। ইংল্যান্ডের মাটিতে বিশ্বকাপেও এটি চলমান থাকবে, এমনটাই আশা করছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া।

Coach Image

জাস্টিন ল্যাঙ্গার

মার্চ ২০১৮, কেপটাউনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তৃতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার ক্যামেরন বেনক্রফট বল টেম্পারিংয়ের সময় আচমকা ধরা পড়েন ক্যামেরার ফ্রেমে! ঘটে যায় ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে অন্যতম ন্যক্কারজনক ঘটনা। এরপর বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারিতে দল থেকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন দলপতি স্টিভেন স্মিথ এবং সহ অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার! বেনক্রফট নিষিদ্ধ হন ৯ মাসের জন্য।

বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারি ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার শুধু ইমেজই নষ্ট করেনি, দলগত পার্ফরম্যান্সে এসেছিল উদ্বেগজনক পরিবর্তন। দলের সেরা দুই খেলোয়াড়ের সাথে দু’জন যোগ্য নেতা হারানো চাট্টিখানি কথা নয়। সে সাথে কাটা গায়ে নুনের ছিটার মতো কোচ ড্যারেন লেহম্যানের পদত্যাগ এক অনিবার্য অশনি সংকেতই ছিল অস্ট্রেলিয়ার জন্য!

সে অশনি সংকেতের ভারে ঠিকই মুহ্যমান হয়েছিল সদ্য দায়িত্ব নেয়া জাস্টিন ল্যাঙ্গার এবং তার শিষ্যরা। পরপর দুই সিরিজ (টেস্ট এবং ওয়ানডে) হারে বেশকিছুদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ানদের বাজে পারফরম্যান্সের ফর্দ আরো লম্বাই হচ্ছিল শুধু! এ যেন এক আহত সিংহ। ছটফট করছে গলার উপর উঠে আসা প্রাণটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য!

কিন্তু সময়ের পিঠে চড়ে, আনকোরা কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্কার এবং মোটামুটি মানের সেই অস্ট্রেলিয়া টিমই এই বিশ্বকাপ ঘরে আনার জন্য অন্যতম ফেবারিট! রটে যাওয়া সেই আনকোরা কোচ জাস্টিনের দেখনো সঠিক পথেই এগুচ্ছে টিম অস্ট্রেলিয়া। সাথে আছে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ওয়ার্নার স্মিথের পূনঃজাগরণ, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নের তকমা এবং চিরাচরিত হার না মানা অস্ট্রেলিয়ান মানসিকতা!

জাস্টিন ল্যাঙ্গার, পুরো নাম জাস্টিন লি ল্যাঙ্গার। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেয়া এই ভদ্রলোক অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে বিবেচিত। সর্বকালের অন্যতম সেরা টেস্ট ওপেনিং জুটিতে ম্যাথু হেইডেনের সাথে নিজের নামটাকে বেশ সুন্দর করে বাঁধিয়ে রেখেছেন বাঁ-হাতি এই ব্যাটসম্যান।

এ ক্ষেত্রে সর্বকালের সেরা হেইন্স ও গ্রিনিজ জুটির পরই হেইডেন এবং ল্যাঙ্গারের রান সর্বোচ্চ। যদিও তার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিলো একজন মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে; ১৯৯৩ সালে রিচার্ডসন, এমব্রোস, ওয়ালশদের সেই ভয়ঙ্কর ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিপক্ষে, অভিষেক টেস্টের মাধ্যমে।

২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধ্যায়কে বিদায় জানানোর পূর্বে এই ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে সাদা পোষাকে ১০৫ ম্যাচে, ৪৫.৩ গড়ে করেছেন সর্বমোট ৭৬৯৬ রান।

অবসর পরবর্তী কোচিং জীবনেও এখন পর্যন্ত তিনি যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়া দলের প্রধান কোচ টিম নেলসনের অধীনে সহকারী কোচ হওয়ার দায়িত্ব পেয়েছিলেন ল্যাঙ্গার।

নভেম্বর, ২০১২ সালে তিনি নিজের জন্মস্থানের প্রতিনিধিত্বকারী ‘ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল’ এবং ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ক্লাব ‘পার্থ স্কোর্চার্সের’ কোচ হওয়ার সুযোগ পান। তার নেতৃত্বে ‘পার্থ স্কোর্চার্স’ তিনবার লিগ চ্যাম্পিয়ন এবং দু’বার রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে এবং বিগব্যাশ লিগ ইতিহাসে সবচেয়ে সফলতম দল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলো তারা।

২০১৬ সালে ল্যাঙ্গার সাময়িকভাবে অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলের কোচ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে পুরোদস্তুর জাতীয় দলের কোচ হতে বেশি সময় নেননি। তবে স্মিথ-ওয়ার্নারদের বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারির সময় দলের প্রধান কোচ ছিলেন ড্যারেন লেহম্যান। টেম্পারিং ইস্যুতে তার কোনো ভূমিকা না থাকলেও নিজ সম্মানার্থে সরে দাঁড়িয়েছিলেন এ পদ থেকে।

এরপর একই বছর ‘মে’ মাসে অসি জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে চার বছরের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয় জাস্টিন ল্যাঙ্গারকে। দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম দুই সিরিজ (ভারত, পাকিস্তানের বিপক্ষে) হারের পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন জাস্টিন; কিন্তু তার ‘অপেক্ষা করুন’ কথাটির ফলাফল আজ ঠিকই টের পাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বকাপের কয়েক মাস আগ থেকে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখানো অস্ট্রেলিয়া যেনো এটাই জানা দিচ্ছে, জাস্টিনের যোগ্য হাতেই আছে ৫ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।

শেষ দুই সিরিজে ভারতের মাঠে জয় এবং দুবাইতে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ যেনো সেই ‘অপেক্ষা করুন’ আশ্বাসেরই প্রতিফলন! বাড়তি পাওনা হিসেবে ল্যাঙ্গার পাচ্ছেন স্মিথ-ওয়ার্নারকে। দারুণ ফর্মে আছেন দলের বাদবাকী সবাই। ম্যাক্সওয়েল, খাজা, ফিঞ্চদের সাথে ওয়ার্নার, স্মিথ, স্টার্ক, প্যাটিনসনরা যে বিশ্বকাপের অন্যতম দাবীদার তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। জাস্টিন ল্যাঙ্গার কি পারবেন অস্ট্রেলিয়ার বল টেম্পারিংয়ের অভিশাপ কাটিয়ে দলকে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জেতাতে?

অস্ট্রেলিয়া স্কোয়াড

অ্যারন ফিঞ্চ (অধিনায়ক), ডেভিড ওয়ার্নার, স্টিভেন স্মিথ, উসমান খাজা, শন মার্শ, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, মার্কস স্টইনিস, অ্যালেক্স ক্যারে (উইকেটরক্ষক), প্যাট কামিনস, মিচেল স্টার্ক, ঝাই রিচার্ডসন, নাথান কাউল্টার নিল, জেসন বেহেন্ডর্ফ, অ্যাডাম জাম্পা এবং নাথান লিয়ন।

অস্ট্রেলিয়া

  • বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ : ১১ বার
  • চ্যাম্পিয়ন : পাঁচবার (১৯৮৭, ১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৭, ২০১৫)
  • রানার্সআপ : ১৯৭৫, ১৯৯৬
  • সেমিফাইনাল : নেই
  • কোয়ার্টার ফাইনাল : ২০১১
  • সুপার সিক্স : নেই
  • প্রথম পর্ব : ১৯৭৯, ১৯৮৩, ১৯৯২ 

সংক্ষেপে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ

সময়কাল

ম্যাচ

জয়

হার

টাই

ফল হয়নি

সর্বোচ্চ রান

সর্বনিম্নরান

১৯৭৫-২০১৫

৮৪

৬২

২০

৪১৭

১২৯

বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার সেরা ১০টি ইনিংস

রান

উইকেট

ফল

প্রতিপক্ষ

মাঠ

সাল

৪১৭

জয়

আফগানিস্তান

পার্থ

২০১৫

৩৭৭

জয়

দক্ষিণ আফ্রিকা

বেসেট্টে

২০০৭

৩৭৬

জয়

শ্রীলঙ্কা

সিডনি

২০১৫

৩৫৯

জয়

ভারত

জোহানেসবার্গ

২০০৩

৩৫৮

জয়

নেদারল্যান্ডস

বেসেট্টে

২০০৭

৩৪৮

জয়

নিউজিল্যান্ড

সেন্ট জর্জ

২০০৭

৩৪২

জয়

ইংল্যান্ড

মেলবোর্ন

২০১৫

৩৩৪

জয়

স্কটল্যান্ড

বেসেট্টে

২০০৭

৩২৮

জয়

শ্রীলঙ্কা

দ্য ওভাল

১৯৭৫

৩২৮

জয়

ভারত

সিডনি

২০১৫

বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার সেরা ১০ ব্যাটসম্যান

খেলোয়াড়

ম্যাচ

রান

সর্বোচ্চ

গড়

১০০

৫০

রিকি পন্টিং

৪৬

১৭৪৩

১৪০*

৪৫.৮৬

গিলক্রিস্ট

৩১

১০৮৫

১৪৯

৩৬.১৬

মার্ক ওয়াহ

২২

১০০৪

১৩০

৫২.৮৪

ম্যথু হেইডেন

২২

৯৮৭

১৫৮

৫১.৯৪

স্টিভ ওয়াহ

৩৩

৯৭৮

১২০*

৪৮.৯

মাইকেল ক্লার্ক

২৫

৮৮৮

৯৩*

৬৩.৪২

ডেভিড বুন

১৬

৮১৫

১০০

৫৪.৩৩

শেন ওয়াটসন

২২

৬৪৩

৯৪

৫৩.৫৮

ডিন জোন্স

১৬

৫৯০

৯০

৪২.১৪

জিওফ মার্শ

১৩

৫৭৯

১২৬*

৪৮.২৫

বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার সেরা ১০ বোলার

খেলোয়াড়

ম্যাচ

ওভার

মেডেন

রান

উইকেট

সেরা

গড়

ম্যাকগ্রা

৩৯

৩২৫.৫

৪২

১২৯২

৭১

৭/১৫

১৮.১৯

ব্রেট লি

১৭

১৩৭.৩

১৫

৬২৯

৩৫

৫/৪২

১৭.৯৭

ব্র্যাড হগ

২১

১৫৮.৩

১০

৬৫৪

৩৪

৪/২৭

১৯.২৩

শন টেইট

১৮

১৩৬.৩

৭৩১

৩৪

৪/৩৯

২১.৫০

শেন ওয়ার্ন

১৭

১৬২.৫

১৬

৬২৪

৩২

৪/২৯

১৯.৫০

ক্রেইগ ম্যাকডার্মট

১৭

১৪৯.০

৫৯৯

২৭

৫/৪৪

২২.১৮

স্টিভ ওয়াহ

৩৩

১৭৩.১

৮১৪

২৭

৩/৩৬

৩০.১৪

ডেমিয়েন ফ্লেমিং

১৬

১৩৩.২

১২

৫৮৩

২৬

৫/৩৬

২২.৪২

মিচেল জনসন

১৫

১২১.০

৫৫৭

২৫

৪/১৯

২২.২৮

মিচেল স্টার্ক

৬৩.৫

২২৪

২২

৬/২৮

১০.১৮

 

সময়সূচি

০১ জুন, ২০১৯, ০৬:৩০ পিএম

ব্রিস্টল কাউন্টি গ্রাউন্ড

আফগানিস্তান আফগানিস্তান ২০৭/০

অস্ট্রেলিয়া অস্ট্রেলিয়া ২০৯/৩

ম্যাচ রিপোর্ট

অস্ট্রেলিয়া ৭ উইকেটে জয়ী

০৬ জুন, ২০১৯, ০৩:৩০ পিএম

ট্রেন্টব্রিজ

অস্ট্রেলিয়া অস্ট্রেলিয়া ২৮৮/১০ (৪৯.০)

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৭৩/৯ (৫০.০)

ম্যাচ রিপোর্ট

অস্ট্রেলিয়া ১৫ রানে জয়ী

০৯ জুন, ২০১৯, ০৩:৩০ পিএম

দ্য ওভাল

ভারত ভারত ৩৫২/৫ (৫০ ওভার)

অস্ট্রেলিয়া অস্ট্রেলিয়া ৩১৬/১০ (৫০ ওভার)

ম্যাচ রিপোর্ট

ভারত ৩৬ রানে জয়ী

১২ জুন, ২০১৯, ০৩:৩০ পিএম

কাউন্টি গ্রাউন্ড টন্টন

অস্ট্রেলিয়া অস্ট্রেলিয়া ৩০৭/১০

পাকিস্তান পাকিস্তান ২৬৬/১০

অস্ট্রেলিয়া ৪১ রানে জয়ী

১৫ জুন, ২০১৯, ০৩:৩০ পিএম

দ্য ওভাল

অস্ট্রেলিয়া অস্ট্রেলিয়া ৩৩৪/৭ (৫০.০)

শ্রীলংকা শ্রীলংকা ২৪৭/১০ (৪৫.৫)

ম্যাচ রিপোর্ট

অস্ট্রেলিয়া ৮৭ রানে জয়ী

২০ জুন, ২০১৯, ০৩:৩০ পিএম

ট্রেন্টব্রিজ

অস্ট্রেলিয়া অস্ট্রেলিয়া

বাংলাদেশ বাংলাদেশ

২৫ জুন, ২০১৯, ০৩:৩০ পিএম

লর্ডস

ইংল্যান্ড ইংল্যান্ড

অস্ট্রেলিয়া অস্ট্রেলিয়া

২৯ জুন, ২০১৯, ০৬:৩০ পিএম

লর্ডস

নিউজিল্যান্ড নিউজিল্যান্ড

অস্ট্রেলিয়া অস্ট্রেলিয়া

০৬ জুলাই, ২০১৯, ০৬:৩০ পিএম

ওল্ড ট্র্যাফোর্ড

দক্ষিণ আফ্রিকা দক্ষিণ আফ্রিকা

অস্ট্রেলিয়া অস্ট্রেলিয়া

আরও

ভারত-পাকিস্তান সমর্থকদের সেই উত্তেজনাও ছিল না

ভারত-পাকিস্তান সমর্থকদের সেই উত্তেজনাও ছিল না

জিততে হলে ৩২২ রান করতে হবে বাংলাদেশকে

জিততে হলে ৩২২ রান করতে হবে বাংলাদেশকে

মোস্তাফিজের জোড়া আঘাত

মোস্তাফিজের জোড়া আঘাত

সাকিবের দ্বিতীয় শিকার পুরান

সাকিবের দ্বিতীয় শিকার পুরান